ফনেটিক ইউনিজয়
সিরিয়া-ইরাকে মার্কিন বিমানহামলা ও মার্কিন মিডিয়ার কপটতা
নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন মাসের এক প্রতিবেদনে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর সিরিয়া এবং ইরাকে বোমাবর্ষণের কারণে বেসামরিক নাগরিক নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বেসামরিক নাগরিক হত্যার সংখ্যা গত চার মাসে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যেখানে চার মাস আগে বলা হয়েছিল, বিমান হামলায় মোট ১৯৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সেখানে জুন মাসে বলা হচ্ছে মোট ৪৮৪ জন নিহত হয়েছেন। এই চার মাস ধরে হোয়াইট হাইসের দায়িত্ব নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই নিউ ইয়র্ক টাইমস ট্রাম্পকেই এ হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী করেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ মার্কিন মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর বহুবছর ধরে চলমান সেই বেসামরিক হত্যাকাণ্ডকে সামনে তুলে ধরে ট্রাম্পকে এজন্য এককভাবে দায়ী করছে বলে উঠেছে অভিযোগ।
বেসামরিক নাগরিক হত্যা বৃদ্ধির পেছনে সিরিয়া এবং ইরাকের শহুরে এলাকায় যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার কথা বলছেন অনেকে। তবু নিউ ইয়র্ক টাইমস সামরিক বাহিনীকে দেওয়া ট্রাম্পের নিন্দেশকেই বেসামরিক হত্যার মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বারাক ওবামার শেষ চার মাসের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রথম চার মাসের তুলনা দেখিয়ে বলেছে, ট্রাম্পের চার মাসে ২০ শতাংশ বেশি বোমা ফেলা হয়েছে, যা কিনা বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
একটি উদাহরণ দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে বলা হয়, গত মার্চে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দুজন স্নাইপারকে ৫০০ পাউন্ড বোমা দিয়ে টার্গেট করতে গিয়ে একটি পুরো বিল্ডিং ধসিয়ে ফেলা হয়। এ হামলার ১০৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। এক্ষেত্রে আইএস জেনেবুঝেই শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানব বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর মার্কিন বাহিনী বেসামরিক মানুষের তোয়াক্কা না করেই বোমা ফেলেছে। দুজনকে মারতে ৫০০ পাউন্ড ওজনের বোমা ব্যবহার অনেকের মনেই প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
তবে চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রতি নিন্দেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগে তাদেরকে যেভাবে যুদ্ধ চালাতে বলা হতো, এখনো সেই সিদ্ধান্তেই যুদ্ধ চলছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন জানায়, এখন থেকে প্রতিবেদনে মার্কিনিরা এককভাবে দেশটির বিমান বাহিনীর মিশনের কথা আলাদা করে বলবে না, বরং তারা বলবে ‘কোয়ালিশন’-এর বোমা হামলার কথা। তবে সিরিয়াতে বিমান হামলার ৯৫ শতাংশ এবং ইরাকে ৬৮ শতাংশ হামলাই চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এভাবে নিজেদের দোষ মিত্র দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে মার্কিনিরাই যে এখানে বিমান হামলার মূল যোগানদাতা, তা লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স’-এর ফেলো মিকা জেঙ্কো এব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসেরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘মার্কিন জনগণের প্রতিনিধিরাই ইরাক এবং সিরিয়াতে বেসামরিক নাগরিকের হত্যাযজ্ঞ কমাতে তেমন কিছু করার প্রয়োজন মনে করছেন না।’
তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন নিয়েও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন  সেন্ট্রাল কমান্ড প্রথম থেকেই বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার কথা অস্বীকার করে আসছে। ২০১৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আট হাজার ৩০০ বিমান হামলার মধ্যে মাত্র দু’টি হামলায় মার্কিনিরা বেসামরিক হত্যার করা স্বীকার করে। যা প্রায় সকল মার্কিন সাংবাদিকের কাছেই অবাস্তব ঠেকেছে। অথচ চলতি বছরে সেন্ট্রাল কমান্ডের যে প্রতিবেদন নিয়ে পত্রিকাটি সমালোচনায় মুখর, তা কিন্তু ওই ২০১৫ সাল পর্যন্ত সংখ্যাকে সত্য ধরে নিয়েই এগিয়েছে।
‘এয়ারওয়ারস ডট ওআরজি’ নামের একটি ওয়েবসাইট মার্কিনিদের আইএস-বিরোধী বিমান হামলার পরিসংখ্যান নিয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা চালাচ্ছে। সেখানে ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে এই যুদ্ধের শুরু ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট ২৩ হাজার ২৪০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৮৯ বার ইরাকে, আর ১০ হাজার ১৫১ বার সিরিয়াতে। এ পর্যন্ত এক হাজার ৬৪ দিন হামলা চালানো হয়, ছোঁড়া হয় ৮৪ হাজার ২৯৬টি বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র। এর ফলে প্রাণ হারায় অন্তত চার হাজার ৩৫৪ জন বেসামরিক নাগরিক। এই সংখ্যা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রতিবেদনে বলা সংখ্যার আট গুণের চেয়েও বেশি।
এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মার্কিন সামরিক বাহিনীর রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে সমালোচনার ঝড় তোলাটা কতোটা যুক্তিযুক্ত? সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রতিবেদনকে নির্ভর করে প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে ধংসযজ্ঞের বেশিরভাগ ভয়াবহতাই কি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে না? আর এভাবে ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর হওয়াটা মার্কিন মিডিয়ার রাজনৈতিক কপটতার পর্যায়ে পড়ে। এভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কালো দিকটিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের এক ব্যক্তির ছায়ায় লুকিয়ে ফেলার চেষ্টাটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বললে হয়তো ভুল হবে না।

Disconnect