ফনেটিক ইউনিজয়
যে কারণে ইয়েমেন থেকে পিছু হটছে সৌদি আরব
মিছবাহ পাটওয়ারী
বর্তমান রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান
----

সৌদি জোটের প্রায় আড়াই বছরের সামরিক আগ্রাসনে এখন যেন অনেকটাই নিঃস্ব ইয়েমেন। প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক হতাহত মানুষের রক্তে হোলিখেলার বাইরে এ যুদ্ধে সৌদি আরবের বড় কোনো অর্জন নেই। শিগগিরই তারা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে, এমন কোনো আভাসও মিলছে না। একদিকে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি খরচ, অন্যদিকে পরাজয়ের শঙ্কার ফলে এখন ইয়েমেন থেকে সরে আসতে চাইছে সৌদি রাজতন্ত্র। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে ‘সম্মানজনক’ প্রস্থানে প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের শত্রু তেহরানের মধ্যস্থতায়ও রাজি রিয়াদ।

পিছু হটার নেপথ্যে সৌদি যুবরাজ
চলতি বছরের জুনে প্রাসাদ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আসে সৌদি আরবের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। পূর্বসূরি মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে যুবরাজের (পরবর্তী রাজা) দায়িত্ব নেন বর্তমান রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পছন্দের এই নতুন যুবরাজকেই এখন দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের তিনি জানিয়েছেন, ইয়েমেনের রণাঙ্গন ছাড়তে চায় রিয়াদ। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে ইরানের মধ্যস্থতাতেও মানা নেই তাদের। গ্লোবাল লিকস নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর ফাঁস করা ই-মেইলে উঠে এসেছে ইয়েমেন নিয়ে তার এমন অবস্থানের কথা।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল উতেইবা এ ব্যাপারে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ই-মেইল আদান-প্রদান করেছিলেন। মূলত তাঁর ই-মেইল ফাঁস হওয়ার মাধ্যমেই উঠে আসে ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরবের নতুন পরিকল্পনার তথ্য। ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি যুবরাজের অবস্থান সম্পর্কে আমিরাতের রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

অর্থনীতি
চলমান যুদ্ধে সৌদি আরবের এ পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি ডলার অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করে রিয়াদ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে চাপে রাখা এ চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলেও এসব অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাব্য রণক্ষেত্র ইয়েমেন।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতি নিয়ে বেশ চাপে আছে রিয়াদ। ফলে ইয়েমেনে অনির্দিষ্টকালব্যাপী যুদ্ধে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচের উচ্চাশাও এখন দুরাশা। আবার পছন্দের শাসককে ক্ষমতায় বসিয়ে যুদ্ধের এ বিশাল খরচ উঠিয়ে আনা যাবে, তেমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সাবাহ জানগানেহ বলেন, সৌদি সরকার নিজের অর্থনৈতিক দুরবস্থা সামাল দিতে ব্যাপক মাত্রায় ব্যয়বহুল ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে প্রস্থানের উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজছে। কারণ এটা সৌদি বাজেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেলের পড়তি দামের মতো বিষয়গুলো।
এদিকে অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটাতে লোহিত সাগরের অন্তত ৫০টি দ্বীপ নিয়ে একটি বিশেষ পর্যটনকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন সৌদি যুবরাজ। সেখানে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য থাকবে বিশেষ সুবিধা। এরই মধ্যে সালমান ঘোষণা দিয়েছেন, এই পর্যটনকেন্দ্রে নারীদের বিকিনি পরার সুযোগ দেওয়াসহ সিনেমা, বিনোদন, পানশালা, থিয়েটারের মতো বিনোদনের আয়োজন থাকবে।

আন্তর্জাতিক চাপ
ইয়েমেনে সামরিক আগ্রাসনে বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে সৌদি আরব। কারণ সৌদি জোটের বিমান হামলা থেকে বাদ যায়নি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে জানাজার নামাজও। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এক জানাজায় হামলা চালিয়ে ১৪০ জনেরও বেশি বেসামরিক ইয়েমেনিকে হত্যা করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। দুনিয়াজুড়ে সমালোচনার মুখে রিয়াদের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে ৩৫ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর এবং ইয়েমেন আগ্রাসনকে সমর্থন দিলেও তাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন দিতে দেখা যায়নি।
গত বছর সৌদি আরবের কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি স্থগিতের আহ্বান জানান যুক্তরাজ্যের বিরোধীদলীয় লেবার নেতা জেরেমি করবিন। তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনে সৌদি হামলার সঙ্গে যুক্তরাজ্য নেই। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।’ সৌদি আগ্রাসনে ইয়েমেনে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।
 
কৌশলগত ব্যর্থতা

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তবে তারা এখান থেকে পুরোপুরি চলে যাবে না বলেও মতামত বিশ্লেষকদের।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডাম ব্যারন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা অনেকাংশেই প্রতিবেশী ইয়েমেনের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে সেটা রিয়াদের জন্য সুখকর হবে না। তারা পুরোপুরি ইয়েমেন ত্যাগ করবে না। তবে হয়তো যুদ্ধের বাইরে থাকতে চাইবে।
অ্যাডাম ব্যারন বলেন, রিয়াদের জন্য এখন একটি চুক্তি দরকার, যেখানে ইয়েমেনে সৌদি স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা থাকবে। ভারী অস্ত্রশস্ত্র হস্তান্তর ও সীমান্ত হামলা বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইরানের প্রভাব এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা, দ্য ইন্টারসেপ্ট, মিডল ইস্ট আই

Disconnect