ফনেটিক ইউনিজয়
পরিবেশগত বর্ণবাদের শিকার আফ্রিকান-আমেরিকানরা
তরিকুর রহমান সজীব

টেক্সাসের বিউমন্ট শহরের একটি শহরতলি শার্লটন-পোলার্ড। এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই আফ্রিকান-আমেরিকান। তাদেরই একজন জোসেফ গেইনস, পেশায় মালি। জুনের এক ছুটির দিনে সন্ধ্যায় বাড়ির আঙিনায় বসে গল্প করছিলেন কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে। হঠাৎ বিকট এক শব্দ কেড়ে নেয় তাঁদের মনোযোগ, তাকিয়ে দেখেন অদূরেই আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠেছে সন্ধ্যার আকাশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই অসহ্য দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল গোটা এলাকায়। সঙ্গে সঙ্গেই খোশগল্প ছেড়ে নাক-মুখ চেপে ধরে বিদায় নিলেন জোসেফের প্রতিবেশীরা।
ওই সন্ধ্যার আগুন জোসেফ বা তাঁর প্রতিবেশীদের জন্য চমকিত হওয়ার কোনো বিষয় নয়। কেননা, তাঁদের এমন আগুন আর এর পরের অসহনীয় দুর্গন্ধের শিকার হতে হয় প্রায়ই। জোসেফের বাড়ির দেড় ব্লক পরেই অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম তেল কোম্পানি এক্সন মোবিলের একটি রিফাইনারি প্ল্যান্ট। ওই প্ল্যান্টের সুবাদে এমন ঘটনার মুখোমুখি জোসেফদের নিয়মিতই হতে হয়। জোসেফ জানান, এভাবে আগুন লাগার পর তাঁদের মধ্যে হঠাৎ মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, অনেকে দুই-তিন দিন পর্যন্ত ঘুমাতেও পারেন না। তবে এমন ঘটনার পর কেউ আর তেমন অভিযোগ করেন না। কারণ, জোসেফের মতে, ‘অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই।’ এক্সন মোবিলের এই রিফাইনারি প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে ১৭ বছর ধরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি তাঁরা।

দূষণেও আছে বর্ণবাদ
মাত্রাতিরিক্ত সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল শোধন করা হয় ওই কারখানায়। আর শোধনের এই প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে তৈরি হয় সালফার ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস। এসব গ্যাস স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের রোগসহ মানবদেহের মারাত্মক সব সমস্যার জন্য দায়ী। জানা যায়, এক্সন মোবিলের ওই প্ল্যান্ট থেকে কমপক্ষে ১৩৫ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। এর মধ্যে বেশকিছু পদার্থ রয়েছে, যেগুলো ক্যানসারের কারণ। ফলে এই কারখানাটি কোনোভাবেই মার্কিন ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্টের’ সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শুধু তা-ই নয়, শার্লটন-পোলার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্যানসার ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার গোটা যুক্তরাষ্ট্রের গড় হারের তুলনায় অনেক।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ওই রিফাইনারি ইউনিট থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ শ্রবণযন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর। এখানে শিশুদের জন্মগত ত্রুটি ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। দেখা গেছে, এখানকার শিশুদের স্মরণশক্তিও স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় কম।
মার্কিন সরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার গড় প্রবণতা প্রতি ১০ লাখ মানুষে শূন্য থেকে একজন। অথচ শার্লটন-পোলার্ডে আক্রান্তের হার প্রতি ১০ লাখে ৫৪ জন এই হিসাবটুকুও করা হয়েছে এক্সন মোবিলের দেওয়া রাসায়নিক নিঃসরণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। এই পরিস্থিতিতে যাদের শার্লটন-পোলার্ড ছেড়ে অন্য কোথাও বসবাসের সামর্থ্য রয়েছে, তারা এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু অন্যদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এক্সন মোবিলের দূষণের ক্ষত।

সমাধানের নামে বঞ্চনার ১৭ বছর
১৯৯৯ সালে এক্সন আর মোবিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দুই বৃহত্তম তেল কোম্পানি একীভূত হয়ে পরিণত হয় এক্সন মোবিলে। ওই বছরই শার্লটন-পোলার্ডের রিফাইনারি ইউনিটের কার্যক্রম বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছর ২০০০ সালের ১৩ এপ্রিল শার্লটন-পোলার্ডের অধিবাসীরা ইপিএ বরাবর আবেদন করেন, এই রিফাইনারি ইউনিটের কার্যক্রম যেন না বাড়ানো হয়। এমন অভিযোগের তদন্ত করে ২০০ দিনের মধ্যে ফলাফল জানানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু শার্লটন-পোলার্ডের আফ্রিকান-আমেরিকানদের ওই আবেদনের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও তাতে কর্ণপাত করেনি ইপিএ। অভিযোগের তিন বছর পর তদন্তের আশ্বাস দিলেও প্ল্যান্ট সম্প্রসারণের অনুমোদন বাতিলের বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপই নেয়নি ইপিএ।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে রয় ম্যালভেক্স নামের স্থানীয় এক ব্যাপটিস্ট যাজক শার্লটন-পোলার্ডের বাসিন্দাদের ওই রিফাইনারি প্ল্যান্টের দূষণ নিয়ে সংগঠিত করতে থাকেন। সে সময় টেক্সাসে মোবিলের রিফাইনারি প্ল্যান্টগুলোয় অন্য যেকোনো মার্কিন অঙ্গরাজ্যের রিফাইনারি প্ল্যান্টের তুলনায় দূষণের হার ছিল বেশি। আর বিউমন্টের ওই রিফাইনারি প্ল্যান্টে টেক্সাসের তুলনায় দূষণ হতো আরও বেশি। এরপরও ১৯৯৯ সালে প্ল্যান্ট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোবিল নিজেই স্বীকার করে, এর ফলে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাস ও পদার্থের নিঃসরণ বাড়বে। এর বদলে তারা নিকটস্থ একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টের দূষণ কমাবে বলে জানায়।
রয় ম্যালভেক্সসহ স্থানীয়রা এই প্ল্যান্ট সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্বে থাকা টেক্সাস এজেন্সির কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু টেক্সাস এজেন্সি তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং জানায়, দুই প্ল্যান্ট মিলিয়ে দূষণ সমান থাকবে বলে এর জন্য বাড়তি অনুমোদনের দরকার নেই। কিন্তু ম্যালভেক্স স্থানীয়দের মধ্যে দূষণের ভয়ংকর প্রভাব লক্ষ করেন। তাই সিদ্ধান্ত নেন ইপিএ বরাবর অভিযোগ করার। অভিযোগে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি আরও উল্লেখ করেন, ওই প্ল্যান্টের আশপাশের বাসিন্দাদের ৯৫ শতাংশই আফ্রিকান-আমেরিকান। ফলে নাগরিক অধিকার আইনেরও লঙ্ঘন এই রিফাইনারি প্ল্যান্ট।
অভিযোগের তিন বছর পর ২০০৩ সালে ইপিএ জানায়, তারা ঘটনাটি তদন্ত করবে। ম্যালভেক্স ওই সময়ের প্রতিক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আমলে নিয়ে ইপিএ তদন্ত করবে, এটা গোটা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ছিল একটি বড় জয়। তারা ধরেই নিয়েছিল, কিছু একটা নিশ্চয় হবে।’ কিন্তু এরপর থেকে প্ল্যান্টের বাড়তি দূষণ ছাড়া আর কিছুই মেলেনি বাসিন্দাদের।
সর্বশেষ, অভিযোগের ১৭ বছর পর গত মে মাসে এসে একটি চিঠি ইস্যু করেছে ইপিএ। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্ল্যান্টটির দূষণের বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। দূষণের মাত্রা যেন কম থাকে, এ জন্য প্ল্যান্ট থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একটি এয়ার মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। আর কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত কমিউনিটি বৈঠক করা হবে বলে জানায় ইপিএ। ১৭ বছর ধরে নিজেদের আবেদনের তদন্তের আশায় থাকা শার্লটন-পোলার্ডের কাছে এই ‘সমাধান’ ছিল এত বছর ধরে অগ্রাহ্য হওয়ার চেয়েও বড় অপমানের।

এক্সন মোবিল ও ক্ষমতার রাজনীতি
বর্তমান বিশ্বে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়নেরই এক নমুনা শার্লটন-পোলার্ডের এই ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিই শুধু নয়, দেশটির সবচেয়ে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এই এক্সন মোবিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন এই কোম্পানিরই তৎকালীন সিইও রেক্স টিলারসন।
পরিবেশ প্রসঙ্গে ট্রাম্প সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির আভাস মিলেছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই। তাঁর মন্ত্রিসভায় টিলারসনের অন্তর্ভুক্তির পর পরিবেশবিষয়ক নতুন নীতিগুলো তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে লাভবান করে। ২০১৫ সালে শিশুদের অ্যাজমা ও অকালমৃত্যু প্রতিরোধে ওবামা সরকারের নেওয়া ‘ক্লিন পাওয়ার প্ল্যান’ নির্বাহী আদেশে বাতিল করেন ট্রাম্প। পরিবেশগত আরও বেশকিছু নীতিমালা কার্যকরের সময়ও পিছিয়ে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ওবামার বাতিল করা বিতর্কিত কিস্টোন পাইপলাইন প্রকল্পকেও অনুমোদন দেন ট্রাম্প। অন্যান্য নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্পও শার্লটন-পোলার্ডের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর। কেননা, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে আনা তেলের বড় একটি অংশই বাড়তি হিসেবে যাবে সেখানকার রিফাইনারি প্ল্যান্টে।
ইপিএর কাছে শার্লটন-পোলার্ডের বাসিন্দাদের অভিযোগ তুলে ধরতে সহায়তা করেছিলেন অ্যাটর্নি কেলি হারাগান। তিনি বলেন, কিস্টোন পাইপলাইন কেবল বিউমন্টের বাতাসকে আরও দূষিতই করবে। আগুন লাগা, পাইপ ফেটে তেল পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে বেশি পরিমাণের তেল শোধনের ফলে বেশি বেশি দূষণ। এসব প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে আইনি প্রয়োগও তেমন দেখা যাবে না বলে মনে করেন তিনি। এনভায়রনমেন্টাল ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে কেলি হারাগানের আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটেছে। ওই প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসেই দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তির পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে আর এ সুযোগে বিউমন্টের রিফাইনারি প্ল্যান্টের সক্ষমতাকে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনায় নেমেছে এক্সন মোবিল।

ক্ষমতার বৃত্তে বন্দি
১৭ বছর আগে উৎসাহ নিয়ে ম্যালভেক্সসহ শার্লটন-পোলার্ডের বাসিন্দারা ইপিএ বরাবর যে অভিযোগ করেছিলেন, সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা এখন মিইয়ে গেছে। এক্সন মোবিলের বিরুদ্ধে কমিউনিটি বৈঠকগুলোতেও এখন অনেকেই হাজির হন না। ম্যালভেক্স বলছেন, এত বড় ও প্রভাবশালী একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, এই বোধ থেকেই তাঁরা হাজির হচ্ছেন না আর। তা ছাড়া এই এলাকার অন্য বাসিন্দারা নিত্যদিনের জীবিকার লড়াইয়ের কাছেই হেরে যান প্রতিনিয়ত। ম্যালভেক্স বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ করে এলেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে তাদের দোষ দেওয়া যায় না।’
এক্সন মোবিলের এই প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সরব ছিলেন স্থানীয় ইভান ফ্রেডরিক। তার বক্তব্যটিই প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়ের করপোরেট ক্ষমতায়নের রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে যত প্রতিবাদই করুন না কেন, সবই সময়ের অপচয়মাত্র। তাদের হাতে অর্থ আছে, এর আরেক নাম ক্ষমতা। এই ক্ষমতার বলেই দিন শেষে তারা নিজেদের চাওয়াটাকেই পূরণ করবে। এখানে আমাদের ক্ষতি তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়।’
দ্য ইন্টারসেপ্ট অবলম্বনে

Disconnect