ফনেটিক ইউনিজয়
আইএসের পতন
কী ঘটতে যাচ্ছে সিরিয়ায়?
মিছবাহ পাটওয়ারী
ধ্বংসস্তূপে সিরীয় যোদ্ধারা
----

সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দিন ঘনিয়ে আসছে। জঙ্গিদের কথিত রাজধানী রাক্কার পতনের পর তাদের দখলে থাকা শেষ বড় শহর দেইর-আল-জুরেরও পতন হয়েছে। ইরাকে আইএস সাম্রাজ্যের পতনের পর সেখান থেকে সিরিয়ার আলবু কামাল শহরে পালিয়ে এসেছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইএস সদস্য। সম্প্রতি সেখানেও তাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। সব মিলিয়ে দেশটির খুব সামান্য এলাকাই এখন জঙ্গিদের দখলে আছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আইএস-পরবর্তী সিরিয়ার ভবিষ্যৎ কেমন হতে যাচ্ছে?
২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান ও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় এ লড়াইয়ে দৃশ্যত বিজয়ী বাশার আল-আসাদ। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সেখানে অন্যদের কাজ করতে হবে। আর রাক্কা কিংবা অন্যান্য শহরের নিয়ন্ত্রণ হারালেও জঙ্গিবাদী দর্শন নিয়ে আইএস-ও হয়তো টিকে থাকবে। তবে নিজস্ব ভূখণ্ডের অধিকারী হওয়ার মতো শক্তি তাদের আর নেই।
আন্তর্জাতিক কুশীলবদের তৎপরতায় দেশটি কার্যত তিন অংশে ভাগ হয়ে যাবে। রাশিয়া ও ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করবে বাশার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী। একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেবে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের জোট সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস। এ জোটের নেতৃত্বে রয়েছে কুর্দি বিদ্রোহীরা। বাকি অংশটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে তুরস্ক ও জর্ডান সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে। অর্থাৎ আইএস-পরবর্তী সিরিয়ার মূল খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে চারটি দেশ। দেশগুলো হচ্ছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ইরান।
বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাসকে ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জোশুয়া ল্যান্ডিস বলেন, ‘সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সিরিয়ার যুদ্ধে আসাদ জয়ী হয়েছেন। যেসব বিদ্রোহী গ্রুপ এখনো টিকে আছে, সেগুলো সিরিয়ার একেবারে প্রান্তে হটে গেছে। লড়াইয়ে পরাজিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এখন আর তাদের পাশে নেই।’
সিরিয়া যুদ্ধের আরেক পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো চার্লস লিস্টার। তাঁর ভাষায়, ২০১১ সালের পর আসাদ এখন ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তবে তিনি যুদ্ধে জিতেছেন, এটা মনে করাটা ঠিক হবে না। প্রকৃতপক্ষে তিনি পরাজয় এড়াতে পেরেছেন। তাঁর সরকার সিরিয়ার প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড পুনর্দখলের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সেটা যদি সম্ভবও হয়, তাতেও কয়েক বছর লেগে যাবে।

আন্তর্জাতিক কুশীলবদের ভূমিকা :
রাশিয়া

সিরিয়া যুদ্ধে বেশি লাভবান হয়েছে রাশিয়া। বস্তুত মস্কোই আসাদকে টিকিয়ে রেখেছে। রুশ বিমান হামলার সুবিধা নিয়ে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে সিরিয়ার অধিকাংশ স্থানের দখল নিতে সক্ষম হয়েছেন আসাদ।
সিরিয়ায় পরাশক্তির খেলায় সবচেয়ে ভালো তাসগুলো এখন মস্কোর হাতে। এরই মধ্যে এ অঞ্চলে রুশ প্রভাবকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। চলতি নভেম্বরেই সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বেসামরিক জোনে ৫০০ জন করে সামরিক পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান। এ ছাড়া কুর্দি বিদ্রোহীদের নিয়ে তুরস্কের আপত্তির মুখে ১৮ নভেম্বর রাশিয়ার উপকূলীয় শহর সোচিতে সিরিয়াবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন স্থগিত করেছে মস্কো। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, সিরিয়ার কুর্দিপন্থী গোষ্ঠী পিওয়াইডিকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র
সিরিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ল্যান্ডিস মনে করেন, তাঁরা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি রয়েছে, তা-ও স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। কারণ, তারা একদিকে আসাদের পদত্যাগ ও নতুন নির্বাচন দাবি করছে। আবার আসাদের বিরোধীদের সব ধরনের সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে আসাদ বলেছেন, ‘ট্রাম্প যদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তাহলে তিনি আমাদের স্বাভাবিক মিত্রে পরিণত হবেন।’ এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, একই সময়ে আসাদ ও দায়েশের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা পাগলামি এবং বোকামি। এমন বাস্তবতায় ‘রুশবান্ধব’ ট্রাম্পের সিরিয়ায় আসাদের বিরোধীদের মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

তুরস্ক
প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় তুরস্কের কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ সিরিয়া। এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কুর্দি বিদ্রোহীদের অংশগ্রহণ। এই কুর্দিদের নিয়ে আঙ্কারার দীর্ঘ অস্বস্তি রয়েছে। কারণ তারা তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করছে। এই কুর্দি প্রশ্নের বাইরেও প্রতিবেশী দেশের গৃহযুদ্ধ তুরস্ককেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এরই মধ্যে সিরিয়া সংঘাতের ভয়াবহতায় কয়েক লাখ মানুষ তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। তাই কুর্দিদের বিচ্ছিন্নতার চেষ্টা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারাও হয়তো এখন সিরিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে মনোযোগী হবে।

ইরান
সিরিয়ায় ইরানের লক্ষ্য অন্তত স্পষ্ট। তারা দেশটিতে যেকোনো মূল্যে আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে চায়। সিরিয়া ও ইরাকের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরাক থেকে সিরিয়া হয়ে লেবানন পর্যন্ত ইরানের প্রভাববলয় নিশ্চিত করা।
ল্যান্ডিসের মতে, এর মাধ্যমে ইরান ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তারা আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে না।
আসাদের জয়ে তেহরানের উচ্ছ্বাসের বিষয়টি এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখায় পশ্চিম এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব বেড়েছে। তবে সিরিয়া ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সহযোগিতার ফলাফল প্রমাণ করে, যেকোনো পরিস্থিতিতে তেহরান ও মস্কো নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম।

Disconnect