ফনেটিক ইউনিজয়
আফ্রিকায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ঘনীভূত হচ্ছে
আহমেদ শরীফ
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ানকে সোমালিাদের অভ্যর্থনা
----

গত ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, তারা পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় বিমান হামলা চালিয়ে কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে হত্যা করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘আল-জাজিরা’ জানায়, হামলার লক্ষ্য ছিল সোমালিয়ায় নতুন করে গড়ে ওঠা জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। মার্কিন সূত্রমতে, এটাই সোমালিয়ায় আইএসের ওপরে প্রথম মার্কিন বিমান হামলা। এর আগে তাদের সব হামলারই লক্ষ্য ছিল আল-শাবাব নামের জঙ্গিগোষ্ঠী। আফ্রিকা কমান্ডের মার্কিন প্রধান সোমালিয়া সফর করার দুদিন পরই গত ১৪ অক্টোবর সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে এক ভয়াবহ ট্রাক-বোমা হামলায় ৩৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এর দুই সপ্তাহ পর মোগাদিসুর একটি হোটেলে জঙ্গি হামলায় ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। উভয় ঘটনাতেই জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাবকে দায়ী করা হয়েছে। আশপাশের দেশগুলো থেকে সোমালিয়ায় ড্রোন ও বিমান হামলা চালালেও দেশটির অভ্যন্তরে মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ড বেশ চুপিসারেই চলছিল এতকাল। গত মে মাসে আল-শাবাবের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের একজন সেনা মৃত্যুবরণ করলে সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক কার্যকলাপ নতুন করে সামনে চলে আসে। আর গার্ডিয়ান-এর এক রিপোর্টে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সোমালিয়ায় সহিংসতা বৃদ্ধিকে পুঁজি করে সেখানে মার্কিন সামরিক কার্যকলাপ বাড়তে পারে।
আল-শাবাব চিন্তাগত দিক থেকে আইএস হতে আলাদা। আল-শাবাবের কর্মকা- মোটামুটি  সোমালিয়াকে ঘিরেই। তারা ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় হামলা করেছিল, কারণ উভয় দেশই  সোমালিয়ায় আল-শাবাবকে ধ্বংস করতে সেনা পাঠিয়েছে। তবে তারা ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে কখনোই হামলা করার পরিকল্পনা করেনি। এ ক্ষেত্রে আইএসের সঙ্গে আল-শাবাবের পার্থক্য রয়েছে। আর সোমালিয়ায় আইএসের সন্দেহভাজন আস্তানায় মার্কিন হামলা সে দেশে মার্কিন আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার কথাই বলছে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক দিক থেকে সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি কোন দিক নির্দেশ করছে, এ ক্ষেত্রে সোমালিয়া ও আশপাশের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাতে হবে।
পূর্ব আফ্রিকায় চীন বেশ ক-বছর ধরেই ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশ ইথিওপিয়ার সঙ্গে জিবুতির রেলসংযোগ চীনারা করে দিয়েছে। ইথিওপিয়ায় আরও অনেক অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ছাড়াও পূর্ব ইথিওপিয়ায় চীনারা তেল-গ্যাসের কূপ খুঁড়েছে। স্থলবেষ্টিত বলে ইথিওপিয়া বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য পার্শ্ববর্তী ছোট্ট দেশ জিবুতির ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই জিবুতিতেই মার্কিন ও ফরাসিদের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বহু বছর ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে জাপান ও চীনও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। সৌদি আরবও করতে যাচ্ছে। জিবুতির প্রতিবেশী দেশ এরিত্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে; সেখান থেকে তারা ইয়েমেনের যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছে। ভারত মহাসাগর এবং লোহিত সাগরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এই দেশগুলো কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া ও ইউরোপের মাঝে সমুদ্র যোগাযোগের মূল পথ এটি। এখানে সোমালিয়ার গুরুত্ব বেশি।
সোমালিয়ায় নতুন শক্তি হচ্ছে তুরস্ক। গত সেপ্টেম্বরে তুরস্ক সোমালিয়ায় তার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি উদ্বোধন করে। সেটি ব্যবহার করে সোমালিয়ার সেনাদের তুরস্ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর সমুদ্রবন্দরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেয়েছে তুর্কি এক কোম্পানি। দেশটিতে ব্যাপকভাবে বেসামরিক বিনিয়োগও করেছে তুরস্ক। ‘মিডল-ইস্ট আই’ বলছে, তুরস্কের বেশি কূটনৈতিক মিশন রয়েছে আফ্রিকায়। তুরস্কের এয়ারলাইনস আফ্রিকায় অন্য যেকোনো এয়ারলাইনসের চেয়ে বেশি গন্তব্যে যায়।
জেনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ফেডেরিকো ডনেলি ইস্তাম্বুলের ‘আনাদোলু এজেন্সি’তে আফ্রিকায় তুরস্কের আগ্রহ বাড়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সাল থেকে তুরস্ক আফ্রিকায় কূটনৈতিক কার্যকলাপ বাড়াতে থাকলেও ২০১১ সালের  পর থেকে মানবিক সহায়তা দিতে তুরস্ক তার কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারিত করে। একই সঙ্গে সোমালিয়ায় রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে সেখানকার রাজনীতির অংশ হয় তুরস্ক। স্বনামধন্য লেখক ফরিদ জাকারিয়ার কথাগুলোকে স্মরণ করে ফেডেরিকো বলেন, আফ্রিকায় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব মনে করিয়ে দেয় বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। ক্ষমতা এখন শুধু সুপারপাওয়ারের হাতেই রয়েছে এমন বলা যাচ্ছে না। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন শক্তির আবির্ভাবেই নয়া বিশ্বব্যবস্থার লক্ষণ নিহিত।
কদিন আগেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নিজেরে (কেউ কেউ নাইজারও বলেন) যুদ্ধরত অবস্থায় মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের চার সদস্য নিহত হওয়ার পর সেখানে মার্কিনরা কী করছে, তা নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনার পাশাপাশি আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক কর্মকা-ের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক নিক টার্স বিশ্বব্যাপী মার্কিন ঘাঁটি নিয়ে লিখেছেন দ্য ইন্টারসেপ্ট-এ। তিনি বলেন নিজেরে মার্কিনরা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আগাদেজ নামের মরুভূমির সেই স্থানটির সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ রক্ষা করাটা কঠিন। টার্স এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন।
টার্সের প্রশ্নের উত্তর আফ্রিকায় ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝেই নিহিত। আগাদেজ উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার যোগাযোগের কৌশলগত স্থলপথের ওপরে অবস্থিত। এখান থেকে আশপাশের লিবিয়া, আলজেরিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া ও শাদের ওপর দিয়ে ড্রোন ওড়াতে পারবে মার্কিনরা। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় মার্কিনরা পিছিয়ে পড়তে চাইছে না বলেই আগাদেজে তারা অত বড় সামরিক ঘাঁটি করছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলে দিচ্ছে, এখন আফ্রিকায় শুধু মার্কিন কর্মকাণ্ড দেখলেই হবে না, বাকিদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

Disconnect