ফনেটিক ইউনিজয়
গুজরাট বিধানসভা নির্বাচন
বদলের হাওয়া কি প্রকৃত বদল আনবে?
শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা
গুজরাট নির্বাচন ঘিরে চাপের মুখে বিজেপি
----

বহুদিন ধরে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলোর দুর্গ গুজরাট। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তথা হিন্দুত্বের প্রধানতম মুখ নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ উঠে এসেছেন গুজরাট থেকেই। এই রাজ্য সাক্ষী আশির দশক থেকে কংগ্রেসের পতন শুরু হওয়ার, পাশাপাশি বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের শক্তিবৃদ্ধির। গুজরাটে হিন্দুত্ব ব্রিগেড সাম্প্রদায়িক বিভাজন আনতে ছোট, মাঝারি বা ২০০২ সালের মতো ভয়ংকর দাঙ্গারও আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে দুই-তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা হিন্দুত্ব বাহিনীর আসন কিছুটা হলেও টালমাটাল। হার্দিক প্যাটেল, জিগনেশ মেভানী বা অল্পেশ ঠাকুর প্রমুখ  নতুন নেতৃত্বের উত্থান ও বিজেপি-বিরোধী অবস্থান, কংগ্রেসের পুনরুত্থান এসব কিছুর জন্যই ভারতে নির্বাচনের সময় সবার নজর থাকবে গুজরাটের দিকে।
২০১৫ সাল থেকে চলা পাতিদার সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হার্দিক প্যাটেল। পাতিদার সম্প্রদায় সংবিধানে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য সংরক্ষণব্যবস্থায় আসার যোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কারণ আগে থেকেই তারা গুজরাটের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সম্প্রদায়। পাশাপাশি পাতিদারদের আন্দোলনের বিষয় অর্থাৎ বেকারত্ব, বা উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ ইত্যাদি সাধারণ সমস্যা সংরক্ষণের পরিমাপক হতে পারে না। এ ছাড়া পাতিদারদের সংরক্ষণের দাবির মধ্যে সংরক্ষণ নীতিকেই তরলীকৃত করার ঝোঁক বর্তমান। তা সত্ত্বেও আসন্ন নির্বাচনে পাতিদারদের দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে তাদের নির্বাচনী শক্তির জন্য। গুজরাটে বিজেপির মূল ভোটার ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী পাতিদাররাই, গ্রামের দিকেও জমির মালিকানা মূলত ব্রাহ্মণ, বেনিয়া ও পাতিদার সম্প্রদায়ের হাতেই। ১৯৮১ ও ১৯৮৫ সালের পাতিদার আন্দোলনের দাবি ছিল সংরক্ষণব্যবস্থার অবসান, যা বিজেপির নাক গলানোয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির জন্য তাই পাতিদারদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এখন পাতিদারদের আন্দোলন আর সংরক্ষণব্যবস্থার অবসান নয়, বরং নিজেদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা আদায় করে নেওয়া। আর বিজেপি তাতে ব্যর্থ হওয়ায় আন্দোলনটি এখন বিজেপির বিরুদ্ধে ঘুরে গেছে। আর বিজেপির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো হার্দিকের নেতৃত্বাধীন পাতিদার আনামত আন্দোলন সমিতি। বিজেপির মাথাব্যথা বাড়িয়ে হার্দিক কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
এদিকে পাতিদার আন্দোলন থেকেই উত্থান ওবিসি সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতা অল্পেশ ঠাকুরের। গুজরাটে ওবিসি ভোটারের অংশ বৃহত্তম হওয়ায় অল্পেশের গুরুত্বও বেড়েছে। গত ২৩ অক্টোবর অল্পেশ কংগ্রেসে যোগ দেন। দলিত আন্দোলনের নেতা জিগনেশ মেভানিও বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটদানের আবেদন জানান। এই তিন নেতা বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলনের অভিমুখ ঘোরাতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের অবস্থান কংগ্রেসের পক্ষে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে বিজেপি।
গুজরাটে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে প্রভাবশালী। তাঁদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ পাতিদাররা। কিন্তু মোদির গুজরাট মডেলে বড় শিল্পের প্রাধান্য এই অংশের আশায় অনেকটাই জল ঢেলেছে। জানা যায়, ছোট ব্যবসারও প্রায় ২৫ শতাংশ গুজরাট মডেলের ধাক্কায় বন্ধ হয়েছে। সর্বোপরি গুজরাট মডেলে শিক্ষা , স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক পরিকাঠামোর চূড়ান্ত অভাব স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে বিজেপির অবস্থানকে দুর্বল করেছে। এই পরিস্থিতিতে ২২ বছর পর ফের সেখানে কংগ্রেসের প্রাধান্য লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০১৫ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে আশাতীত ভালো ফল কংগ্রেসকে আবার ভরসা জোগাবে।
এ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য হলো, সংরক্ষণের নামে ভোটব্যাংক রাজনীতি। ভারতের সংবিধানে সংরক্ষণব্যবস্থাকে নিরাপত্তামূলক বলা হয়। কারণ যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত অনগ্রসর শ্রেণির মানুষকে বঞ্চনা থেকে বের করে অগ্রসরদের সারিতে বসানোর উপায় হিসেবে এই ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। কার্যক্ষেত্রে বর্তমানে ভারতে সংরক্ষণব্যবস্থা পরিগণিত হচ্ছে সুবিধা বাড়ানোর উপায় হিসেবে। ফলে প্রভাবশালী অংশও নিজেদের জন্য সংরক্ষণ দাবি করতে উদ্যত হচ্ছে। এ দাবি যৌক্তিক কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আন্দোলনকারীদের সামাজিক অর্থনৈতিক শক্তি বা নির্বাচনী শক্তি। সংরক্ষণের দাবিতে জাঠ আন্দোলন বা পাতিদার আন্দোলন এই গতির উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ।
বিভিন্ন সংসদীয় রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক রাজনীতি এই গতিকে পুষ্ট করে চলেছে। এদিকে বিজেপিকে বেকায়দায় ফেলার আশায় হার্দিকের সঙ্গে বোঝাপড়া কংগ্রেসকে হয়তো রাজনৈতিক সুবিধা দেবে কিন্তু সংবিধানের দৃষ্টিতে এই গতি আশঙ্কাজনক। পাশাপাশি, উল্লেখযোগ্য মোদির গুজরাট মডেলের ধীর পতন। এই মডেলের নতুন দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় শেষ, উল্টো বড় শিল্পের ওপর বেশি জোর দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক পরিকাঠামো ধ্বংস করে ফেলায় জনতার ক্ষোভ বেড়েছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর গুজরাট নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম দিক এই মৌলিক পরিকাঠামোর প্রশ্ন, যা জনতার ক্ষোভের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে।
কেন্দ্রীয় সরকারে থাকার পরও কংগ্রেস যে বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়নি, গুজরাট নির্বাচনে জিতলে সেই প্রতিশ্রুতি কতদূর পূরণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। পাশাপাশি তারা বড় শিল্পপতিদের পৃষ্ঠপোষকতা বা উপদেশ শিরোধার্য করে গুজরাটে ছোট বা মাঝারি ব্যবসায় জোর কতদূর দেবে, সে নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। সর্বোপরি, গুজরাট তথা ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি, সংঘ পরিবারের কঠিন হিন্দুত্ব বা কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ব এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রাধান্য দেশটির গণতন্ত্রের পক্ষে আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে।

Disconnect