ফনেটিক ইউনিজয়
মিসরের মসজিদে হামলা : আসল দায়ী কে?
আহমেদ শরীফ
মিসরের সিনাই উপদ্বীপে আল-রাউদা ‘সুফি’ মসজিদে হামলার দৃশ্য
----

মিসরের সিনাই উপদ্বীপে গত ২৪ নভেম্বর মসজিদে হামলা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। ঘটনার সরকারি বিবৃতি নিয়েই বরং বেশি জল্পনা-কল্পনা চলছে। সিনাই উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থিত আল-রাউদা ‘সুফি’ মসজিদে হামলা হয় শুক্রবারের জুমার নামাজের সময়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, হামলাকারীরা ছিল ৪০ জনের মতো, যারা চার-পাঁচটা পিকআপ গাড়িতে চড়ে ঘটনাস্থলে আসে। তাদের কর্মকাণ্ড বলে দেয় সর্বোচ্চ সংখ্যক হতাহত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে হামলাকারীরা মসজিদের প্রধান ফটক ও জানালার বাইরে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। ইমাম খুতবা শুরু করতে যাচ্ছিলেন মাত্র। তারা তখন বোমা বিস্ফোরণ শুরু করে এবং ভেতরে শত শত মানুষের ওপর বুলেটের ঝড় বইয়ে দেয়। তারা মসজিদের আশপাশে পার্কিং করা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে সেখানে বাইরে থেকে কারও প্রবেশ দুরূহ করে তোলে। এমনকি সাহায্য করতে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ওপরেও তারা গুলি ছোড়ে। শুধু এখানেই শেষ নয়। হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি সফল হয়েছে কি না, সেটা নিশ্চিত হতে হামলাকারীরা একে একে হতাহত মানুষগুলোর শরীরে খোঁচা দিয়ে দেখতে থাকে। কাউকে জীবিত পাওয়া গেলে তাকে আবারও গুলি করা হয়।  
মিসরের সরকারি বিবৃতির বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, ওই হামলায় ৩০৫ জন প্রাণ হারায়, যার মাঝে ২৭ জন ছিল শিশু। এ ছাড়া ১২৮ জন আহত হয়, যার মধ্যে অনেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন।
এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে বিশেষ কোনো প্রমাণ না থাকার পরও মিসর সরকারের প্রধান আইনজীবী নাবিল সাদেক বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে কমপক্ষে একজন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পতাকা বহন করছিল। পতাকার বর্ণনা দিতে গিয়েই তিনি যত জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেন। তিনি বলেন, পতাকাতে মুসলিমদের বিশ্বাসের কালিমা তৈয়বা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ) লেখা ছিল। অথচ এটা জানা যে আইএসের পতাকার মাঝে রয়েছে কালোর মধ্যে সাদা দিয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর সিলমোহর। এই হামলাকে সিনাই উপদ্বীপে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে আলাদা করে দেখতে গেলে অনেক কিছুরই হিসাব মিলবে না। সিনাই উপদ্বীপ ও আশপাশে সিসি সরকারের বিরুদ্ধে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহ এখন পর্যন্ত যেদিকে চলছিল, তা থেকে এই মসজিদে হামলা পুরোপুরি আলাদা। সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কোনোটাই এখন পর্যন্ত মসজিদে হামলা করেনি। তারাই যদি এই হামলা করে থাকে, তবে সেটা হবে তাদের কৌশলে বিরাট এক পরিবর্তন।
এখন পর্যন্ত সিনাইয়ের সশস্ত্র বিদ্রোহীরা সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মীর ্রওপর হামলা করেছে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা করেনি। কৌশলগত বিষয়ে বিশ্লেষণ নিয়ে প্রকাশ করা ‘দ্য জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’-এর ‘টেররিজম মনিটরে’ এক লেখায় সিনাইয়ের ‘হাজম মুভমেন্ট’ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে ‘হাজম’ সম্পর্কে বলা হয়, শহরে অপারেট করা এই  গেরিলারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ এমনভাবে ব্যবহার করছে, যেন বেসামরিক নাগরিকেরা হতাহতের শিকার না হয়। কারণ সেই বেসামরিক জনগণের মাঝ থেকেই তারা রিক্রুট করছে। ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ তাদের ওয়েবসাইটে সিনাইয়ের সশস্ত্র সংগঠন জুনদ আল-ইসলাম এবং তার চেয়ে আরও বড় সংগঠন হাজমের বরাত দিয়ে বলে, তারা উভয়েই আল-রাউদা হামলার দায় থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। এই গ্রুপগুলো সিনাইয়ের জনগণকে সিসি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে চেষ্টা করছে। কাজেই এই একই অঞ্চলের মসজিদে হামলা করে কয়েক শ মানুষ হত্যা এই সংগঠনগুলোর লক্ষ্যের সঙ্গে যায় না।
মিসরের সরকার বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সশস্ত্র বিপ্লব ডেকে আনার জন্য উর্বর অবস্থার জন্ম দিয়েছে। আর এরই মধ্যে মানুষের সামনে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ভাবমূর্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এমনকি যেকোনো সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ হতাহত হলে মিসরের অনেক মানুষই এখন উল্লাস করে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে। দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল গত অক্টোবরে মিসরের রাজধানী কায়রোর দক্ষিণ-পশ্চিমে গির্জার কাছাকাছি পুলিশের ওপর হামলা। সেই হামলায় ধোঁকা দিয়ে এক স্থানে এনে অ্যামবুশ করে ৫৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এই হামলাটির বিশেষত্ব ছিল, এটি সিনাই উপদ্বীপে ছিল না; বরং রাজধানী কায়রোর বেশ কাছাকাছি ছিল, যা চলমান সহিংসতার মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই হামলার দায় আসলে কার, অবশ্য সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এই হামলার ফলাফল হিসেবে সিসি সরকারও সুবিধা নিতে চাইবে এবং নেবেও। এই হামলা কি সুফিদের ওপর আইএসের হামলা ছিল? নাকি ব্যাপক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মিসর সরকারই এই ঘটনা ঘটিয়েছে? সাধারণ মিসরীয়দের কাছে এই আলোচনার মূল্য কমই। কারণ তাদের চিন্তার মাঝে রয়েছে কী করে গোটা চল্লিশেক জঙ্গি চার-পাঁচটা পিকআপ গাড়িতে চড়ে কালো পতাকা উড়িয়ে কঠিনভাবে সামরিকীকৃত একটি এলাকার মাঝে দিয়ে চলে গেল, আর কেউ তাদের একবারের জন্যও চ্যালেঞ্জ করল না? মিসরীয়দের কাছে আইসিস আর সিসির সরকার একই জিনিস। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এর এক রিপোর্টে কায়রোর রাস্তার এক দোকানির বক্তব্যই ব্যাখ্যা করে দিচ্ছে ব্যাপারখানা। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না কে আসলে এগুলো করছে। কিন্তু আমার মনে হয় আইএস হচ্ছে পুলিশের মাঝেই কিছু মানুষ। এ ছাড়া কার পক্ষে এটা করা সম্ভব?’

Disconnect