ফনেটিক ইউনিজয়
নির্বাচন ২০১৭ : উন্নয়নের খোঁজে নেপাল
শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা
আঠারো বছর পর সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন নেপালি জনগণ
----

১৯৯৯ সালের পর প্রথমবারের জন্য নেপালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংসদীয় নির্বাচন। ২০১৫ সালে প্রণীত নেপালের নতুন সংবিধান এই পাহাড়ি রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ঘোষণা করে কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থার প্রচলন করেছে। নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ দুই কক্ষের, যার ক্ষমতা সমান। পাশাপাশি নেপালি জনগণ প্রভিন্সিয়াল আইনসভাগুলোর সদস্যদেরও নির্বাচন করতে চলেছেন। নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় শেষ। ফলাফল চলতি মাসের মাঝামাঝি প্রকাশিত হওয়ার কথা। এরপর দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার শেষে নেপালে কতটা স্থায়িত্ব আসে এবং মানুষের আশা পূর্ণ হবে, এখন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১৯৯৯ সালে রাজপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিয়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূত্রপাত, তা পূর্ণতা পাওয়ার সুযোগ ছিল মাওবাদী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। ক্ষমতা দখলের খুব কাছাকাছি গিয়েও নেপালি মাওবাদী পার্টির ২০০৬ সালের শান্তিচুক্তিতে সেই পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হয়। মাওবাদী পার্টির মধ্যেও এগোনোর পথ নিয়ে বিতর্ক চলেছে বহুদিন। চুক্তির পর ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দুবার সংবিধানসভা গঠিত হয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান এবং চলতি নির্বাচনের ফলাফল সংবিধানের সামর্থ্য পরীক্ষা করবে। এই মুহূর্তে লড়াই কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট এবং সিপিএন-মাওয়িস্ট সেন্টারের বাম জোট বনাম মধ্যপন্থী নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক জোটের মধ্যে। ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক পর্ষদগুলোর নির্বাচনে এগিয়ে এই বাম জোটই। এই নির্বাচনে পাহাড়ি রাষ্ট্রটিতে আপাত স্থায়িত্ব আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ এর আগে কোনো সরকারই এক বছরের বেশি ক্ষমতায় টেকেনি। তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা নির্বাচনের পরও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান অধরা থেকে যেতে পারে।
অবশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা কোন পক্ষ দখল করল, জনসাধারণের কাছে তার থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে উন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের প্রশ্ন। তাই রাজনৈতিক দলগুলোও প্রচারে উন্নয়নের দিকে জোর দিচ্ছে। অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নয়নই নির্বাচনী প্রচারে দুই পক্ষের এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে অনুন্নত থেকে  নেপালকে উন্নয়নশীল করে তোলার কথা দুই পক্ষের প্রচারে শোনা গেছে। নেপালি কংগ্রেসের দাবি, ক্ষমতায় এলে পরবর্তী পাঁচ বছরে অর্ধ মিলিয়ন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে, সিপিএন-ইউএমএল ও সিপিএন-এমসির যৌথ নির্বাচনী ইশতেহারে যথার্থ শাসন, উন্নয়ন ও স্থায়িত্বের অঙ্গীকার দেখা গেছে। এই জোটের আরও লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয়কে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং প্রচুর কাজের সংস্থান করা।
প্রসঙ্গত, কাজের সংস্থান বর্তমান নেপালের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ প্রায় কুড়ি বছর ধরে চলা অস্থিরতায় দেশের কর্মসংস্থানপ্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ। বহু মানুষ কাজের খোঁজে নেপাল থেকে অন্যান্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাস্তাঘাট, পানীয় জল, খাদ্যসুরক্ষা ইত্যাদিও মানুষের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দাবি এই মুহূর্তে।
তবে নেপালের সাধারণ নির্বাচনের দিকে উৎকণ্ঠিত চোখ থাকবে পার্শ্ববর্তী দুই শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও চীনের। পার্বত্য রাষ্ট্রে ক্ষমতা বাড়ানোর লড়াইয়ে সেখানে একটি স্থায়ী সরকার প্রয়োজন দু পক্ষের। স্থায়িত্বের অভাব নিয়ে অতীতে দিল্লি ও বেইজিং থেকে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচনের দুই মূল অংশীদার বাম জোট ও গণতান্ত্রিক জোটের জয়লাভে চীন বা ভারতের সেখানে ক্ষমতা বাড়াতে সুবিধা হওয়ার কথা। বাম জোট ক্ষমতায় জিতলে নিকট ভবিষ্যতে নেপালি সরকার চীনের দিকে বেশি ঝুঁকবে। ইউএমএল  নেতা কেপি ওলি নির্বাচনের আগে বহুবারই ভারতের নাক গলানো নিয়ে বিরোধিতা করেছেন। ২০১৫ সালে ভারতের অর্থনৈতিক ব্লকেড নিয়েও সরব এই নেতার নেপালি জাতীয়তাবাদী অবস্থানে একদিকে মদেশি ও অন্যান্য অংশের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন, অন্যদিকে নেপালি জনগণের মধ্যে তাঁর এই অবস্থান জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকাকালীন ওলি একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, যার ফলে তাদের অর্থনীতিতে ভারতের একাধিপত্য অনেকটাই খর্ব হওয়ার কথা ছিল। ক্ষমতায় ফিরলে ওলি পূর্বের চীনপন্থী নীতি অনুসরণ করবেন বলে বেইজিং মনে করছে, যা তাদের স্বার্থের অনুকূল হবে। অন্যদিকে ওলি প্রধানমন্ত্রী হলে নেপালে ভারতের প্রাধান্য অনেকটাই কমে যাবে বলে নয়াদিল্লির আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে ওলি কতদূর একপাক্ষিক হয়ে চলবেন, সেটা সময় বলবে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ওলি প্রধানমন্ত্রী হলে চীনের দিকে ঝুঁকলেও বাস্তবে তা চীন ও ভারতের মাঝামাঝি একটি অবস্থান হবে। জোটের অন্য শক্তিশালী শরিক সিপিএন-এমসি নেতা পুষ্পকুমার দহল বা ‘প্রচণ্ড’কে যদিও ভারতের বিরোধী বা পক্ষে অবস্থান নিতে শোনা যায়নি, তা সত্ত্বেও বাম জোট জয়লাভ করলে কাঠমান্ডু যে চীনের দিকে ঝুঁকবে তা পরিষ্কার। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক ব্লক জয়যুক্ত হলে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাই দায়িত্বে থাকবেন। সে ক্ষেত্রে নেপালে নয়াদিল্লির প্রভাবের বিরাট কিছু ক্ষতি হবে না। তবে যে পক্ষই জয়লাভ করুক, কেউই সরাসরি চীন বা ভারতবিরোধী অবস্থান নেবে না, বরং এই দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাঝামাঝি অবস্থান নেবে, কোনো একদিকে কিছুটা পাল্লা ভারী করে। আপাতত প্রাদেশিক আইনসভাগুলোয় বাম জোট ভালো ফল করতে পারে, এই আশা করা গেলেও, কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে ফলাফল কোনো পক্ষের প্রতি সদয় হবে, সেই দিকে তাকিয়ে সমগ্র নেপাল।

Disconnect