ফনেটিক ইউনিজয়
ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা
বিপাকে মুসলিমপ্রধান দেশের নেতৃত্ব
আহমেদ শরীফ
কুয়ালালামপুরে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে বিক্ষোভ
----

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে জেরুজালেম বিষয়ে আগের মার্কিন সরকারগুলোর নীতিকে পুরোপুরিই উপেক্ষা করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ভাষণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন, জেরুজালেম বর্তমানে ইসরায়েল সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা হলো বাস্তবতা; কাজেই জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রয়টার্স বলছে, ওয়াশিংটনের বেশকিছু কট্টরপন্থী রিপাবলিকান এবং ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা ট্রাম্পের এই ঘোষণায় খুশি হয়েছেন। অন্যদিকে এর কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনার ব্যাপারে ট্রাম্প যে আশা দেখাচ্ছিলেন, তা বাস্তবায়িত হবে না, এবং সেখানে স্থিতিশীলতাও ব্যাহত হবে। রয়টার্স আরও বলছে, ট্রাম্প সরকারের মাঝেই  জেরুজালেমের ঘোষণার ব্যাপারে যথেষ্ট দ্বিমত ছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করতে ট্রাম্পকে পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রসচিব রেক্স টিলারসন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস এই ঘোষণার বিপক্ষে ছিলেন। এর কারণ হিসেবে ‘শিকাগো ট্রিবিউন’ বলছে, তারা চিন্তিত ছিল যে এই ঘোষণার কারণে পুরো মুসলিম বিশ্বের মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পরিষ্কার, ট্রাম্প এই হুমকিগুলোকে ছোট করেই দেখেছেন। যদিও দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা বলছে, মার্কিনরা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোয় নিরাপত্তাব্যবস্থা  জোরদার করেছে। কিন্তু ট্রাম্প এই ঝুঁকিগুলো অতিক্রম করার ব্যাপারে অতটা নিশ্চিত কী করে হলেন? সারা মুসলিম বিশ্ব থেকেই তো ট্রাম্পের এই ঘোষণার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হচ্ছে। এর উত্তর পাওয়া যাবে ইসরায়েল তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে কী বার্তা পাচ্ছে, তা থেকে।
মাত্র ২১ হাজার বর্গকিলোমিটারের ইসরায়েল ভৌগোলিক দিক থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র, যার কোনো কৌশলগত গভীরতা নেই। দেশটি উত্তরের দিকে পূর্ব-পশ্চিমে মাত্র ৪০ মাইল চওড়া; সবচেয়ে বেশি চওড়া মাঝখানে, যা মাত্র ৭০ মাইল। দেশটির এক পাশ  থেকে অন্য পাশে একটা শত্রু সামরিক ফাইটার বিমানের উড়ে যেতে লাগবে মাত্র ৪ মিনিট! জনসংখ্যাও মাত্র ৮০ লাখের থেকে একটু বেশি, যেখানে প্রতিবেশী দেশ সিরিয়ার জনসংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ এবং মিসরের জনসংখ্যা ৮ কোটি। এ অবস্থায় ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য থাকবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বড় কোনো সামরিক সংঘাতে না যাওয়া। যদিও ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৮২ সালে ইসরায়েল আশপাশের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে। এরপর ছোট্ট একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যুদ্ধোন্মাদনা ইসরায়েলের জন্য বিরাট ঝুঁকি, যা থেকে দেশটি বিরত থাকতে চাইবে। বরং ইসরায়েল মনোনিবেশ করবে আশপাশের দেশগুলোর নেতৃত্বের বাক্যগুলোতে। ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম দেশগুলো কে কী বলছে, সেটা ইসরায়েলের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ হবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও।
জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা গোটা মুসলিম বিশ্ব এবং আরবে ক্রোধের সূচনা করবে। অন্যদিকে, মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শুকরি বলেছেন, জেরুজালেমের আইনগত অবস্থান নিয়ে সাবধানে এগোনো উচিত। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি কাজে লাগাবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, জেরুজালেম মুসলিমদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’, যার জন্য তুরস্ক শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার কারণে শেষ পর্যন্ত তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করতে পারে। ইরান সরকার বলছে, এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক সনদের লঙ্ঘন। সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থার মাধ্যমে বলা হয়, সৌদি সরকার আরও আগে থেকেই খারাপ প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করেই এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকা-ের বিরোধিতা করে এসেছে।
তবে উল্লেখযোগ্য হলো, কোনো দেশই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড়সড় কোনো ঘোষণা দেয়নি; ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে তো নয়ই। তাদের মূল চিন্তা ছিল মুসলিম জনগণ এই ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নাও নিতে পারে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জেরুজালেমের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সেই মুসলিম দেশগুলোর নেতৃত্বে জনগণের চাপ আসতে থাকবে, যা সেই সরকারের পক্ষে নেওয়া কঠিন হবে। মিসরের সিসি সরকার সিনাই উপদ্বীপে সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। সিরিয়া গৃহযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর সৌদি আরব অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্বে নড়বড়ে অবস্থানে। জর্ডানের একার সামরিক কোনো সক্ষমতা নেই। তুরস্কও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড়জোর কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে বলে এরদোয়ান বলেছেন। অর্থাৎ ইসরায়েলের প্রতিবেশীরা নিশ্চিতভাবেই সংঘর্ষে যেতে চাইছে না। ইসরায়েল ও ট্রাম্পের হিসাব ভুল করেননি যে প্রতিবেশীরা ইসরায়েলের কৌশলগত গভীরতা বা স্ট্র্যাটেজিক ডেপথকে চ্যালেঞ্জ করবে না। তবে বিশ্বের মুসলিম জনগণকে ট্রাম্প কী করে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
ট্রাম্পের আগের সরকারগুলো জেরুজালেমের ব্যাপারে নিরপেক্ষ নীতিতে থেকেছেন, যার ব্যাপক সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, তিনি আগের ব্যর্থ নীতি থেকে বেরিয়ে আসবেন। আগের কোনো সরকার বিশ্বের মুসলিম জনগণকে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে একত্র করতে চাননি। কিন্তু ট্রাম্প কি এখন সেই পথেই হাঁটছেন? ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কথায় মুসলিম নেতৃত্বের এই ভীতির কথাই ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা কট্টরপন্থীরা ব্যবহার করে আরবের সমস্যাকে ধর্মীয় সমস্যায় রূপ দেবে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বলছে, ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কুয়ালালামপুরে শুক্রবারে জুমার নামাজের পর মার্কিন দূতাবাসের বাইরে প্রায় হাজারখানেক মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, যার নেতৃত্ব দেন মালয়েশিয়া সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রী খাইরি জামালুদ্দিন। বিক্ষোভের নেতৃত্বে মন্ত্রীর অবস্থান মাহমুদ আব্বাসের ভীতিরই প্রতিফলন নয় কি?

Disconnect