ফনেটিক ইউনিজয়
আহেদ তামিমি
ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মের প্রতিরোধের প্রতীক
তরিকুর রহমান সজীব
২০১২ সালে ইসরায়েলি সেনাসদস্যের মুখে আহেদ তামিমি মুষ্টিবদ্ধ হাত
----

কারও কাছে সে ‘আনা ফ্র্যাংক’ অথবা ‘জোয়ান অব অর্ক’; নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধ আর মুক্তির আকাক্সক্ষার প্রতীক, ফিলিস্তিনের বিদ্রোহের সমার্থক। কারও কাছে সে ‘শার্লি টেম্পার’; ইসরায়েলি দখলদারিত্বের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো উদ্ধত এক কিশোরী। ফিলিস্তিনিরা তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার অনলাইনে, রাজপথে। আর ইসরায়েল ও তার মিত্ররা তাকে বন্দি রাখতে চায় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তবে গোটা বিশ্বের কাছেই এটি স্পষ্ট, ফিলিস্তিন আর ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লড়াই, সংগ্রাম আর বিভেদটাই স্পষ্ট করে তুলেছে ওই কিশোরী। ইসরায়েলি সৈন্যকে থাপ্পড় দেওয়া আহেদ তামিমিকে যখন গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলি সৈন্যরা, তখন তার মুক্তির দাবিতে আওয়াজ ওঠে লন্ডনে, কায়রোতে, নিউইয়র্কেও। আহেদ তামিমি তাই হয়ে ওঠে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কাছে মাথা না নোয়ানো ফিলিস্তিনের নতুন বিদ্রোহী প্রজন্মের প্রতীক।
কোঁকড়ানো সোনালি চুল আর সাদাটে চেহারার আহেদ তামিমির ইসরায়েলি সেনাদের ওপর তথাকথিত উদ্ধত আচরণ মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষ করে তামিমির জন্ম যে গ্রামে, সেখানে বরং এটাই স্বাভাবিক।
তামিমির গ্রামের নাম নবি সালেহ। এটি ফিলিস্তিনের রামাল্লা থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। ফিলিস্তিনের আরও অনেক গ্রামের মতো এই গ্রামেরও বেশির ভাগ জমিই চলে গেছে ইসরায়েলি দখলদারিত্বে। নিজ গ্রামে থেকেও তাই নবি সালেহ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষকেই রাস্তাঘাটে প্রতিদিনই ইসরায়েলি সৈন্যের তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। নিয়মিত বিভিন্ন বাড়িতে ইসরায়েলি সৈন্যের তল্লাশি ছাড়াও হুটহাট একে-ওকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এই গ্রামে নিয়মিত। ছোটবেলা থেকেই এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হতে হয়েছে তামিমিকে। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর নিয়মিত বিক্ষোভও সে দেখে আসছে ওই বয়স থেকেই। ইসরায়েলবিরোধী তার এই অবস্থান তাই নতুন কোনো ঘটনা নয়।
আহেদ তামিমির পরিবারও ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘদিন ধরে। তার মা নারিমান তামিমিকে এর আগে একাধিকবার আটক হতে হয়েছে ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে। তামিমির বাবা বাসেম তামিমিও ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়। বিভিন্ন সময়ে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে আহেদ তামিমির সর্বশেষ ভিডিও।
অনলাইনে ভাইরাল হয়ে পড়া এই ভিডিওতে দেখা যায়, নিজের চেয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ এক ইসরায়েলি সৈন্যকে চড় মারছে ও লাথি দিচ্ছে আহেদ তামিমি। আহেদের এক বোনকে আটকাতে গেলে এভাবেই ওই সৈন্যের ওপর চড়াও হয় সে। ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়লে ইসরায়েলিদের টনক নড়ে। রাতের আঁধারে আটক করা হয় আহেদকে, সঙ্গে তার মাকেও।
আহেদ তামিমিকে নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলি মন্ত্রীরাও। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান ইসরায়েলি সৈন্যের শান্ত থাকার প্রশংসা করলেও আহেদ তামিমির মতো ঘটনা না ঘটানোর জন্য সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে যারা দিনের বেলায় সৈন্যদের ওপর চড়াও হবে, রাতেই তাদের আটক করা হবে। আর কেবল এই কিশোরী ও তার পরিবারই নয়, বরং ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
আহেদ তামিমিকে আজীবন কারাগারে আটকে রাখা উচিত মন্তব্য করে ইসরায়েলি শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, এই ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে এবং এর থেকে সবাই শিক্ষা নেবে। যারা সৈন্যদের ওপর হামলা করে, তাদের বিচার হবেই।’ সেনা সদস্যের ওপর হামলাকারীদের সাত বছরের সাজার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
তবে নবি সালেহ গ্রাম বা আহেদ তামিমির ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের বাইরেও ইসরায়েলি সৈন্যদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরদের সংঘাত-সংঘর্ষ পুরোনো। একটি বেসরকারি অধিকার গ্রুপের তথ্যে দেখা যায়, কেবল ২০১৬ সালেই ৩৭৫ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছর। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ, তারা ইসরায়েলি সৈন্যের দিকে পাথর ছুড়ে মেরেছে। এ পরিস্থিতিতে আহেদ তামিমিকেও ছেড়ে দেওয়া হবে, এমন মনে করার কারণ নেই। অনুমিতভাবেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। যদিও ১২টি অভিযোগের পাঁচটি অভিযোগ গ্রহণ করেছেন আদালত। এগুলো হলো ইসরায়েলি সেনাদের হুমকি, সেনা সদস্যকে আক্রমণ, সেনাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, প্ররোচিত করা ও সম্পত্তি নষ্ট করা। তার মায়ের বিরুদ্ধে এসব কাজে সহায়তা করা ছাড়াও ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আহেদের বাবা বাসেম তামিমি এই পরিস্থিতিতে বুঝতে পারছেন মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটবে। মেয়েকে ‘নতুন প্রজন্মের ফিলিস্তিনি’ ও ‘নতুন মুক্তিযোদ্ধা’ অভিহিত করে বাসেম বলেন, ‘সে আমাদের নতুন প্রজন্ম। তার মতো অনেককেই আগামী দিনে আমরা দেখতে পাব, যারা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমাদের নেতৃত্ব দেবে। তারাই হবে আমাদের আগামী দিনের সেনানী।’
বাসেম তামিমি বলেন, ‘আমার মেয়েকে জন্মের পর থেকেই এমন একটি পরিবেশে থাকতে হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি কারাগারের ছায়া ছিল। এটা যেন ছিল ইসরায়েলি কারাগারেরই একটি অংশ! তার গ্রেপ্তার হওয়াটা তো ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র! তার জীবন এখন এক অনিবার্য ট্র্যাজেডির মুখে।’
আরও বছর পাঁচেক আগে থেকেই আহেদ তামিমি অনলাইনে পরিচিত তার সাহসের কারণে। ২০১২ সালে, যখন আহেদের বয়স মাত্র ১১ বছর, তখনই এক ইসরায়েলি সেনাসদস্যের মুখে তার মুষ্টিবদ্ধ হাতের একটি ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এ জন্য আহেদকে পুরস্কৃতও করেছিলেন। তিন বছর পর, আরেক সৈন্যের হাত কামড়ে দেওয়ার ছবির মাধ্যমেও আহেদের রুদ্রমূর্তি দেখতে পায় বিশ্ব। কিন্তু সেই আহেদ যখন এবারে ইসরায়েলি সৈন্যের পিঠে লাথি দিয়েছে, তা হজম করতে পারেনি ইসরায়েল। এটাকে তারা ইসরায়েলি দখলদারিত্ব আর অনাচারের পিঠে লাঠি হিসেবেই নিয়েছে। আর সে কারণেই গোটা ফিলিস্তিনের সাহসী, বিদ্রোহী নতুন প্রজন্মের সমর্থক হয়ে ওঠা আহেদ তামিমি এখন অবশ্যম্ভাবী এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।

Disconnect