ফনেটিক ইউনিজয়
ওমান : নতুন ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র?
আহমেদ শরীফ
গত সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সাবমেরিন ‘শিশুমার’ দুকম বন্দরে আসে
----

গত ৪ জানুয়ারি ওমান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার ফলে সৌদি আরব ওমানের দুকম শহরে একটি মৎস্য বন্দর তৈরি করতে ২১০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেবে। এই চুক্তি এমন সময়ে এল, যখন সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে ওমান নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে এবং সৌদি আরব-কাতারের মধ্যকার দ্বন্দ্বে কাতারের পক্ষ নিয়েছে। ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ‘রয়টার্স’ বলছে, ওমানের জন্য সৌদিদের সহায়তা মোটেই নিয়মিত ঘটনা নয়। ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নিজেদের পক্ষে না থাকার পরেও সৌদি সরকার সেখানে কেন বড় বিনিয়োগ করতে সম্মত হলো, তা নিঃসন্দেহে কৌতুহলোদ্দীপক। এর উত্তর পেতে হলে ওমান সরকারের সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক নীতিগুলোর দিকে তাকাতে হবে।
তেলের বাজারে দরপতনের পর থেকে ওমান সরকার চাইছে দেশের অর্থনীতিতে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। এই লক্ষ্যে ওমান সে দেশে ব্যাপকভাবে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের জনসংখ্যা মাত্র ৪৪ লাখ হওয়ায় এই নির্মাণকাজ বাইরের শ্রম ছাড়া সম্ভব নয়। গালফ নিউজ বলছে, দেশের মোট অধিবাসীর অর্ধেকই বিদেশি নির্মাণশ্রমিক। ২০১৬ সালের শেষের হিসাবে ওমানে প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি, প্রায় ৭ লাখ ভারতীয় এবং দুই লক্ষাধিক পাকিস্তানি রয়েছে। শিল্প স্থাপনের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো দক্ষিণের শহর দুকম, যেখানে বড় ধরনের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এখানে বিশ্বের বহু স্থান থেকে বিনিয়োগ আসছে। চীনারা ব্যাপক বিনিয়োগ করছে ওমানে। ‘রয়টার্স’ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস ব্যবহার করে চীনারা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকায় তাদের রপ্তানি বাজার চাঙা করতে চাইছে। দুকমের সমুদ্রবন্দরের কাজ পেয়েছে বেলজিয়ামের কোম্পানি কনসোর্শিয়াম এন্টওয়ার্প পোর্ট। বিনিয়োগ ইরান থেকেও আসছে। ২০১৭ সালের শুরুতে ‘ওমান ট্রিবিউন’ বলে, ইরান দুকমে গাড়ি তৈরির কারখানা করতে ইচ্ছুক। মে মাসে ঘোষণা আসে ইরানের আল-আনোয়ার সিমেন্ট কোম্পানি দুকমে কারখানা করতে চায়। দুকমের বিমানবন্দরের কাজ করছে ভারতীয় কোম্পানি লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, যাদের ওমানের অন্যান্য স্থানেও বিরাট ব্যবসা রয়েছে। ভারতের আদানি গ্রপও গত সেপ্টেম্বরে দুকমে বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা সই করেছে।
ইরান তার বিশাল গ্যাস রিজার্ভ থেকে ওমানে গ্যাস রপ্তানি করতে চাইছে। ২০১৩ সালে উভয়ের মাঝে এই পাইপলাইনের চুক্তি হলেও আন্তর্জাতিক চাপে এর বাস্তবায়ন হয়েছে বেশ ধীরগতিতে। তবে এখন ওমানের শিল্পোন্নয়নে ইরান গ্যাস সহায়তা দিয়ে গ্যাসের বাজারে একটি স্থান করে নিতে চাইছে। ওমান লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) প্রসেসিংয়ের একটি প্ল্যান্টও করতে চাইছে, যেখানে গ্যাস দিতে ইচ্ছুক ইরান। এর মাধ্যমে এলএনজির বাজারেও প্রবেশ করতে চাইছে ইরান। বর্তমানে এলএনজি বাজারে মূল সরবরাহকারী হলো কাতার।
ওমানে ইরানের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতেই সৌদিরা সেখানে বিনিয়োগ করছে, তা বলাটা অযৌক্তিক নয়। অন্তত সৌদি আরবে নিজেদেরই বাজেট ঘাটতি চলছে, তখন বন্ধুবর দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ আলোচনার দাবিদার। সৌদি সমর্থক জোটের দেশ কুয়েত ওমানে বিনিয়োগ করছে অপরিশোধিত তেলের রিফাইনারি করতে। তবে ওমানের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রকল্প ইরান-ওমান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন, যা ইরান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইনের বিকল্প হিসেবে চাইছে ভারত। গত সেপ্টেম্বরের শেষে নিউইয়র্কে ওমানের দূতাবাসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাউই বিন আবদুল্লাহ, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারে বৈঠক করেন। ভারতের অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বার্স অব কমার্স অব ইন্ডিয়া এক রিপোর্টে বলে, সমুদ্রের নিচ দিয়ে যাওয়া এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরানের গ্যাস ব্যবহার করে ভারতে কম খরচে বিদ্যুৎ, সার এবং লৌহশিল্প গড়ে তোলা যাবে। এই পাইপলাইন ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে শুরু করে ওমান হয়ে গুজরাটের পোরবন্দর পর্যন্ত যাবে। ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের এই পাইপলাইন পাকিস্তানের সমুদ্রসীমাকে পুরোপুরি বাইপাস করবে।
‘গালফ স্টেট এনালিটিক্স’-এর জর্জিও কাফিয়েরো ‘আল মনিটর’কে বলেন, পশ্চিমাদের যথেষ্ট কাছের হওয়ায় ওমান সর্বদাই চেয়েছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের প্রধান ম্যারিটাইম শক্তিধর দেশের সঙ্গে থাকতে। এই হিসাবে তারা একসময় নির্ভর করেছে যুক্তরাজ্যের ওপর, এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকতে চায়। তবে কাফিয়েরোর মন্তব্য থেকে যুক্তরাজ্যকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। ২০১৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ফ্যালন ওমানে আসেন দুকমে ব্রিটিশ রয়েল নেভির জন্য নৌঘাঁটি তৈরির চুক্তি করতে। দুকম, তথা ওমান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, তার প্রমাণ এখানেই। কেউই ওমানকে অন্যের হাতে ছাড়তে চাইছে না।
২০১৬-এর জুনে ভারতীয় পত্রিকা দ্য ইকোনমিক টাইমস-এ বলা হয়, চাবাহার বন্দরে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার পর ভারত দুকম বন্দরে অবস্থান নিয়ে পুরো আরব উপদ্বীপে নিজের কৌশলগত অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে ভারতীয় নৌবাহিনীর ভূমিকা বৃদ্ধি করতে চাইছে। ওমানের বন্দর ব্যবহার করতে ভারতীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিও রয়েছে। চাবাহার এবং দুকম বন্দর ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানকে ঘিরে ফেলতে চাইছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘শিশুমার’ এবং গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘মুম্বাই’ দুকম বন্দরে আসে। একই সময়ে ভারত, ইরান ও ওমানের মন্ত্রীরা নিউইয়র্কে বৈঠক করছিলেন। ভারতীয় নৌবাহিনী ওমানের সঙ্গে নিয়মিত যৌথ মহড়া দেয়, যার সর্বশেষ হয়েছে গত ডিসেম্বরে ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘শাঙ্কুশ’-এর অংশগ্রহণে।
ওমান মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন কেন্দ্র হতে চলেছে কি না, তা দুকমে বিভিন্ন দেশের  কৌশলগত বিনিয়োগ এবং সামরিকীকরণই বলে দিচ্ছে। ইরান ও ভারতের অবস্থান যেখানে বেশ শক্ত, সেখানে সৌদি আরব বেশ দেরিতেই ঢুকেছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে।

Disconnect