ফনেটিক ইউনিজয়
গভীর সংকটে মালদ্বীপ
মাসুদুর রহমান
মালদ্বীপের পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী
----

গভীর সংকটে পড়েছে মালদ্বীপ। প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিনের সরকার দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এ অবস্থা চলবে আপাতত ১৫ দিন। এর মেয়াদ পরে বাড়ানো হবে কি না, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ঠিক করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার আগেই দেশটির পার্লামেন্ট সিলগালা করে দিয়েছে দৃশ্যত সরকারের অনুগত সেনাবাহিনী। সরকারের বিপক্ষে মালদ্বীপের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায়কে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট চলতি মাসের প্রথম দিন এক রায়ে সরকারবিরোধী নয়জন নেতাকে মুক্তি ও বরখাস্ত হওয়া ১২ জন এমপিকে পুনর্বহালের রায় দিয়েছেন। মালদ্বীপের পার্লামেন্টে বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ৮৫ জন। সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হলে পার্লামেন্টে সরকারের বিরোধী সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে আব্দুল্লাহ ইয়ামিনকে অভিসংশন করার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনিল দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাস্তবায়ন করা হবে সংবিধানের লঙ্ঘন। এদিকে এই রায়ের নেপথ্যে কারা, তা জানতে গ্রেপ্তার হওয়া বিচারপতিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি আব্দুল্লাহ সায়ীদ, বিচারপতি আলী হামীদসহ আরও কয়েকজন বিচারক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ অবস্থার ফলে পার্লামেন্ট স্থগিত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের হাতে সর্বময় ক্ষমতা চলে যাওয়ায় সুপ্রিম কোর্টেরও আর কোনো কার্যকারিতা নেই। এ সময় ইয়ামিনের সরকার পুরো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইউমকে গ্রেপ্তার করেছে। মালদ্বীপে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ এখন সেনাবাহিনীর হাতে আর সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও পুলিশ ইয়ামিন সরকারের খুবই অনুগত। যদিও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ দাবি করেছেন, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে না দেওয়ায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা বিব্রত হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বিদায় নিয়েছেন বলেও নাশিদের দাবি।
মালদ্বীপে সরকারের বিরোধী পক্ষ হলো এর আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদই। তিনি নির্বাসনে আছেন অনেক দিন ধরে। বর্তমানে প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অবস্থান করছেন তিনি। নাশিদই ছিলেন মালদ্বীপের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ২০০৮ সালে বহুদলীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটের জয়ে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান। তার আগে প্রায় ৩০ বছর একনায়কতন্ত্র চালান মামুন আব্দুল গাইউম।
মোহাম্মদ নাশিদ ক্ষমতায় যাওয়ার পর বেশ কিছু চমক দেখিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সমুদ্রের নিচে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক করেন।
মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের অভ্যন্তরে একটি দ্বীপরাষ্ট্র। সেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০-এর বেশি দ্বীপ রয়েছে। তবে চার লাখের মতো জনসংখ্যার দেশটির বেশির ভাগ মানুষ রাজধানী মালেতে বাস করে। ফলে মালের নিয়ন্ত্রণের ওপরই নির্ভর করে গোটা দেশের নিয়ন্ত্রণ। আর জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের ফলে গোটা মালদ্বীপ একদিন ভারত মহাসাগরের পানির নিচে তলিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়। এমন ধারণা বিশ্বের নজরে আনতে সমুদ্রের নিচে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন নাশিদ। বৈঠকটি সারা বিশ্বের নজর কাড়ে। নাশিদ ক্ষমতায় গিয়ে নিজের এলাকা আদ্দু সিটিতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন।
মালদ্বীপ পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় জায়গা। তবে পর্যটকদের জন্য দেশটি খুবই ব্যয়বহুল। আদ্দু সিটিও নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ভরপুর। রাজধানী মালে থেকে বিমানে যেতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। অনেকটা চরের মতোই ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে এখানে। তা ছাড়া যতদূর চোখ যায় নীল জলরাশি, শান্ত ঢেউ, সেখানে মাছের আনাগোনা। নাশিদ তাঁর ওই এলাকাটিকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলেন। সেখানে প্রতিটি দ্বীপেই পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত পর্যটন খাতনির্ভর করে গড়ে উঠেছে। ফলে বর্তমান অস্থিরতা চলতে থাকলে পর্যটনের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত স্থিতিশীলতা ফেরাতে চাইবে।
২০১৩ সালে দেশটিতে পুলিশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নাশিদকে বন্দি করে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নাশিদ কিছুদিন মালদ্বীপে ভারতীয় হাইকমিশনে আশ্রিত ছিলেন। নাশিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা করলে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য যান। এরপর সেখানেই নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি শ্রীলঙ্কা থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি টুইটারে মন্তব্য করেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় অমান্য করা একটি ক্যু।
প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইউমের সৎভাই। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারের পরিস্থিতিতে গাইউম অনেকটাই গাটছড়া বেঁধেছেন নাশিদের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সমালোচনা করছে। পশ্চিমা দেশগুলো আব্দুল্লাহ ইয়ামিনকে আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলেছে। কিন্তু আদালতের রায় মেনে নিলে তাঁর পতন নিশ্চিত। তাই তিনি জরুরি অবস্থা দিয়ে নতুন চাল দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইয়ামিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে, তা ধরে রাখতে পারলে এবং ভারত কিংবা চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো ইয়ামিন সরকারকে সহায়তা করলে সরকার এই যাত্রায় টিকে গেলেও যেতে পারে।

Disconnect