ফনেটিক ইউনিজয়
স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ
ট্রাম্পের কণ্ঠে বুশের প্রতিধ্বনি
তরিকুর রহমান সজীব
১৫ বছর পর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে বুশের কথার পূনরাবৃত্তি করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
----

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব’কে উপজীব্য করে দেওয়া এই ভাষণের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল উত্তর কোরিয়া। এই ভাষণে উত্তর কোরিয়াকে সরাসরি ধ্বংস করার হুমকি দেননি ট্রাম্প। বরং ঠান্ডা মাথায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশটিকে সরাসরি হুমকি মনে করার কারণেই বাগাড়ম্বরের নীতি ছেড়ে ‘কাজের কথা’য় এসেছেন ট্রাম্প। আর উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে দেওয়া তাঁর বক্তব্যগুলো ঠিক যেন ১৫ বছর আগে দেওয়া জর্জ ডব্লিউ বুশের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেরই প্রতিচ্ছবি! যে ভাষণকে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পূর্ব ঘোষণা মনে করে থাকেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফলে আগামী দিনগুলোয় উত্তর কোরিয়াকেও ইরাকের পরিণতি বরণ করতে হয় কি না, সেই শঙ্কা করছেন তাঁরা।
২০০২-০৩ সালে বুশ তাঁর ভাষণে ইরাককে নিয়ে যে ধরনের বার্তা দিয়েছিলেন, সেগুলোই যেন ট্রাম্পের ভাষণে ফিরে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ইরাকের জায়গায় কেবল প্রতিস্থাপিত হয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য হুমকি মনে করা, এর কারণ, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, প্রতিটি বিষয়েই ট্রাম্প যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, ঠিক একই ধরনের বক্তব্য ইরাককে নিয়ে রেখেছিলেন তাঁরই উত্তরসূরি বুশ।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান মাইক পম্পেই কয়েক দিন আগে বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা উত্তর কোরিয়া অর্জন করতে পারে। ট্রাম্পও তাঁর ভাষণে বলছেন, ‘“আমাদের মাতৃভূমির প্রতি হুমকিস্বরূপ” সশস্ত্র উত্তর কোরিয়াকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং “গোটা বিশ্বের জন্যই এক বিপজ্জনক হুমকি”।’
ঠিক ১৫ বছর আগে বুশ বলেছিলেন, আমেরিকার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, এমন অস্ত্র ইরাকের কাছে থাকতে দেওয়া মার্কিনরা কখনো মেনে নেবে না। ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ও ইরাককে নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, সাদ্দাম হোসেনের মানসিক সুস্থতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর ভরসা করা কোনোভাবেই কৌশল হতে পারে না। আর বুশের দৃষ্টিতে ইরাক ছিল ‘আমেরিকা ও গোটা বিশ্বের জন্য সবচেয়ে গভীরতর বিপদের আরেক নাম’। উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে ট্রাম্পের এমন গভীর উদ্বেগ অবশ্য এই প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি আচমকাই কেন এত ভয়াবহ হয়ে উঠল?  ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলছেন, ‘আমেরিকার প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলার যে হুমকি, তার ধরন বুঝতে দেশটির নৈতিক স্খলনের শিকার শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র আমাদের বুঝতে হবে।’ সেই ‘চরিত্র’ বোঝার জন্য ট্রাম্প এরপর হাজির করতে থাকেন কিম জং উনের বিভিন্ন ‘কীর্তি’র কথা। আর এ ক্ষেত্রে তাঁর সহায় হয়ে ওঠে উত্তর কোরিয়ায় ‘নির্যাতিত’ হয়ে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়া জি সিওং-হো’র ভাষ্য। উত্তর কোরিয়া ভ্রমণে গিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আটক এবং পরে নিহত মার্কিন শিক্ষার্থী অটো ওয়ার্মবিয়ারের কথাও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
বুশও ঠিক একইভাবে ইরাকি নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই পাওয়া ইরাকি শরণার্থীদের উদাহরণই তুলে ধরেছিলেন। বুশ বলেছিলেন, ‘ইরাকি শরণার্থীরা আমাদের জানায়, স্বীকারোক্তি নেওয়ার জন্য মা-বাবার সামনেই নির্যাতন করা হয় সন্তানদের।’ ইরাকের টর্চার সেলগুলোতে ইলেকট্রিক শক, গরম ইস্ত্রির ছ্যাঁকা, এসিডে পোড়ানো, খতনা, ধর্ষণ, শরীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলার মতো বিষয়গুলোও তুলে ধরেন বুশ।
উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে বিশ্ববাসীর বিপদের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়াকে দেওয়ার মতো সময় এখন মানুষের হাতে নেই। উত্তর কোরিয়া যে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে যাচ্ছে, তা শিগগিরই চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। আর সে কারণে উত্তর কোরিয়াকে এখনই মোকাবিলা করতে হবে। ট্রাম্প বলছেন, ‘কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে আত্মতুষ্টি আর ছাড় দেওয়ার মানসিকতা কেবল আগ্রাসন আর প্ররোচনাকেই উসকে দেয়।’
ট্রাম্প আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘হয়তো এমন কোনো দিন আসবে, যখন বিশ্বের সব দেশ একজোট হয়ে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রগুলোকে ধ্বংস করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা এখনো সেই সময়ে যেতে পারিনি।’ তাঁর এই কথাগুলোই আবার গত বছর কংগ্রেসের যৌথ সভায় দেওয়া প্রথম ভাষণের ঠিক বিপরীত। ওই সময় তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই এক হয়ে থাকতে চাই; যুদ্ধ বা সংঘর্ষ নয়, আমরা স্থিতিশীলতা চাই। যেখানেই সম্ভব, আমরা শান্তি চাই।’
ঠিক একইভাবে বুশ বলেছিলেন, ‘আমাদের হাতে সময় নেই। একদিকে যখন বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে, তখন আমরা তা চেয়ে চেয়ে দেখতে পারি না। সমূহ বিপদ যখন ক্রমেই সন্নিকটে আসছে, তখন আমি হাত গুটিয়ে থাকতে পারি না।’
এর পরের ইতিহাস সবার জানা। তাই ঠিক একইভাবে যখন ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে বুশের কণ্ঠস্বরই প্রতিধ্বনিত হলো, তখন উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনগুলো ইরাক-যুক্তরাষ্ট্রের মতো হয়ে উঠবে কি না, সেই শঙ্কাই করছেন সবাই।
কোরিয়া উপদ্বীপে শান্তির জন্য নারীদের নিয়ে কাজ করছে উইমেন ক্রস ডিএমজেড। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টিন আহন বলেন, ট্রাম্পের এই ভাষণ মূলত উত্তর কোরিয়ার অধিবাসীদের ‘স্বাধীন’ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ শুরুর একটি নৈতিক ভিত্তি দাঁড় করানোর প্রয়াস। তাঁর এই ভাষণ নিশ্চিতভাবেই বুশের ২০০২ সালের ভাষণের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা তিনি ইরাক যুদ্ধের আগে দিয়েছিলেন।
সূত্র : ইন্টারসেপ্ট, টাইম ম্যাগাজিন
ভক্স, ওয়াশিংটন পোস্ট

Disconnect