ফনেটিক ইউনিজয়
অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেই তুলে ধরলেন ভারতের সেনাপ্রধান
আহমেদ শরীফ
২১ ফেব্রুয়ারি দেয়া ভারতীয় সেনাপ্রধানের মন্তব্যের সমালোচনা করেন অনেকেই
----

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত এক কনফারেন্সে বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় পাকিস্তানের প্ররোচনায় এবং চীনা সহায়তায় বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে তার নাগরিকদের অবৈধভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তিনি এ পরিকল্পনাকে পাকিস্তানের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে আসামে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও মন্তব্য করেন। পাশাপাশি মওলানা বদরউদ্দিন আজমলের ‘অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড  ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এআইইউডিএফ)-এর সমালোচনা করেন। তার মতে, আসামে  এ মুসলিম রাজনৈতিক দলের বৃদ্ধি ১৯৮০-এর দশকে ভারতে বিজেপির আকার বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত। সমাধান হিসেবে বলেন, সমস্যাকে খুঁজে বের করে একে ইতিহাসের আলোকে দেখতে হবে। তিনি বিজেপি সরকারের বর্তমান ‘বাংলাদেশবিরোধী’ আসাম নীতিকে সমর্থন করে বলেন, এ এলাকার উন্নয়নের জন্য যারা সমস্যার সৃষ্টি করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। ভারতীয় সেনাপ্রধানের এ মন্তব্যের পর থেকে ভারতে এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ বক্তব্যকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছাড়াও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের অবস্থানকে বুঝতে হবে।
ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে রাজনীতিকদের মতামত নতুন নয়। তবে সেনা নেতৃত্বের এমন মন্তব্য অনেককেই হতবাক করেছে। পুনের সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুহাস পালসিকার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক লেখায় বলছেন, ‘জেনারেল রাওয়াতের মন্তব্য যদি বুদ্ধিদীপ্ত হয়, তাহলে তা বাজে উদাহরণ তৈরি করছে। আর রাজনৈতিক বক্তব্য হলে সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে এনে তিনি আরেক সমস্যার উদ্রেক করছেন।’ অধ্যাপক পালসিকার যেটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন, তা হলো, জেনারেল রাওয়াত একেবারে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূলে আঘাত করেছেন। একই পত্রিকায় বাংলাদেশী সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসান লেখেন, ‘জেনারেল রাওয়াত এ মন্তব্য করে এমন জায়গায় হাত দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে বড় অনুচিত কাজ বলে প্রতীয়মান হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এ মন্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ থেকে দূরে থাকত, তাহলেও হয়তো ভালো কিছু বলা যেত।’
তবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিং এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে জেনারেল রাওয়াতের পক্ষই নেন। তিনি বলেন, ‘সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজা ঠিক নয়। এটি তার ব্যক্তিগত মন্তব্য। তার কথা সবার পছন্দ না-ই হতে পারে।’ ভি কে সিংয়ের আরেকটা উল্লেখযোগ্য পরিচয় রয়েছে। তিনি ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সেনাপ্রধান ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি বিজেপিতে  যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সূত্র দিয়ে দ্য হিন্দু পত্রিকা বলছে, ‘সেনাবাহিনী মনে করছে, জেনারেল রাওয়াতের এ বক্তব্যে আসলে রাজনৈতিক কোনো কিছু নেই। তিনি শুধু ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক একত্রীকরণের কথাই বলেছেন।’
আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ এ মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সেনাপ্রধানকে কোনো রাজনৈতিক দল নিয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এআইইউডিএফের সদস্যদের মধ্যে ভারতের লোকসভায় রয়েছেন তিনজন প্রতিনিধি এবং আসামের পার্লামেন্টে রয়েছেন ১৩ জন। দলটির প্রেসিডেন্ট মওলানা আজমল এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘একটি সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক দল যদি বিজেপির চেয়ে বেশি দ্রুত বড় হয়, তাহলে সেটি কেন সেনাপ্রধানের চিন্তার কারণ হবে?’
ভারতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি দূরবর্তী রাজ্যের রাজনীতির ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সম্পর্কের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভারতের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে বিশ্লেষণের অধীনে আনতে হবে। ভূরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্রাটফর’ ভারতের ভূকৌশলগত চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করতে গিয়ে এক বিশ্লেষণে বলে, ভারতের প্রধান সমস্যাগুলোর মাঝে একটি হলো, এর কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়, আর তা রাজ্যগুলোর দাপটের সামনে অনেক বিষয়েই ছাড় দিয়ে চলতে বাধ্য হয়। একেকটি রাজ্য আবার জাতি-ধর্ম-বর্ণ হিসেবে আলাদা রকমের। ভারতের এ দৌর্বল্য শুধু আজকের নয়; সবসময়ের। আরেক গবেষণা সংস্থা ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’ একই রকমের বিশ্লেষণ দেয়। তারা বলছে, অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভারতকে উপমহাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দিচ্ছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দেশটির দুর্বলতার প্রতীক। ভারতের উত্তর-পূর্বের ‘সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাতটি রাজ্য মাত্র ১৫ মাইলের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’-এর মাধ্যমে বাকি ভারতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এ করিডোরের উত্তরে নেপাল আর দক্ষিণে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের আঁকা এ মানচিত্রের কারণে ভারত সর্বদাই অস্বস্তিতে পড়েছে, আর সেই অস্বস্তি কাটাতে বিভিন্ন সময় আগ্রাসীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ভারত ১৯৭৫ সালে সিকিম দখল করে করিডোরের প্রশস্ততা বাড়ায়। এ করিডোরের ছোট্ট পরিসরেই ভারতের দু-দুটো সামরিক বিমানঘাঁটি রয়েছে। এ করিডোরের পাশের দোকলাম মালভূমি নিয়েই ক’দিন আগে ভারতের সঙ্গে চীনের উত্তেজনা চলেছে, যা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। আবার উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোয় রয়েছে অনেকগুলো সশস্ত্র বিদ্রোহ, যা দমন করতে ভারতের সেনাবাহিনীর কয়েকটি বিভাগ সর্বদা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। ভারতকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহায়তা নিতে হয়েছে এ রাজ্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। আসামের মুসলিম জনগণের ব্যাপারে ভারতের সেনাপ্রধানের সমালোচনামূলক মন্তব্য দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছে। তেমনি ভারতের ভূখণ্ডগত স্থিতাবস্থার জন্য দেশটি প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর কতটা নির্ভরশীল, সে বিষয়টাকেও আলোচনায় আনছে।

Disconnect