ফনেটিক ইউনিজয়
সিরিয়ায় কার বিরুদ্ধে কে লড়ছে
তরিকুর রহমান সজীব
সিরিয়া যেন এক মৃত্যুকূপের নাম
----

শুরুটা স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে, দুর্নীতির অবসান ঘটানোর দাবিতে। মধ্যপ্রাচ্যে তখন ‘আরব বসন্তে’র জোয়ার। সেই ঢেউয়েই টালমাটাল সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ। কিন্তু মিশর, লিবিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যেমন ঘরে তুলতে পারেনি আরব বসন্তের সুফল, দ্রুতই একই পরিণতির পথে হাঁটতে শুরু করল সিরিয়া। আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের পর সিরিয়া যেন এখন পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসন জাহিরের জন্য উন্মুক্ত এক যুদ্ধক্ষেত্র। আর এ যুদ্ধে কোনো পক্ষ লাভবান আর কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সিরীয়দের নিয়তি একটাই- মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। তাদের রক্তে রঞ্জিত সিরিয়া তাই এখন এক জীবন্ত বধ্যভূমি।
স্বৈরশাসক আসাদকে উৎখাতের দাবিতে আট বছর আগে শুরু হয়েছিল যে যুদ্ধ, তা এখনও চলমান। আজ সিরিয়ার মাটিতেই আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, যদিও তাদের অবস্থান সিরিয়া সরকারের সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে। এর মধ্যে সিরীয় ও কুর্দি বাহিনীর বিরুদ্ধে রয়েছে তুরস্কের লড়াই, যার প্রতিপক্ষ সিরিয়ার গণতন্ত্রকামী সংগঠনগুলো। এদিকে আসাদ সরকারের প্রতি হিজবুল্লাহ ও ইরানের সমর্থনের কারণে ইসরায়েলও নেই স্বস্তিতে।
মার্কিন মদদপুষ্ট আরব দেশগুলো আবার বাশারের বিরোধী ফ্রি সিরিয়ান আর্মিসহ অন্যান্য ইসলামী গোষ্ঠীকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া রাশিয়া রয়েছে তুরস্কের পাশেও। ইরানও হিজবুল্লাহর পাশাপাশি সমর্থন দিচ্ছে আসাদ সরকারকে। আর বিবদমান সব রাষ্ট্র, গোষ্ঠীই কমবেশি লড়াই করছে আইএসের বিরুদ্ধে, যেখানে আইএস লড়াই করছে আসাদ সরকারকে উৎখাত করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার। সিরিয়ার চলমান যুদ্ধে তাই প্রকৃতপক্ষে কে কার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সে হিসাব মেলানোটাই এক বড় চ্যালেঞ্জের নাম।
সিরিয়ায় বিবদমান রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর এক পক্ষে রয়েছে সিরিয়ার আসাদ সরকারের সমর্থকরা। এ দলে রয়েছে রাশিয়া, যারা প্রত্যক্ষভাবে আসাদ সরকারের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাঠে যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে জাতিসংঘসহ বহির্বিশ্বে আসাদ সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থনও দিয়ে যাচ্ছে। এ দলে থাকা ইরান কেবল অস্ত্র ও অর্থই নয়, সরাসরি সৈন্য পাঠিয়েও আসাদ সরকারের পাশে রয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ছাড়াও আরও কিছু শিয়া সংগঠন রয়েছে আসাদ সরকারের সঙ্গে।
এদিকে আসাদ সরকারের বিরোধী তথা সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া বিদ্রোহীদের পক্ষের দেশগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। ৬০ দেশের জোট নিয়ে আইএস নির্মূলে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র আসাদবিরোধী প্রায় প্রতিটি গোষ্ঠীকেই অস্ত্র, প্রশিক্ষণসহ সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি সিরিয়ায় এসে যুক্তরাষ্ট্রকেও পাশে পেয়েছে তুরস্ক, যারা আসাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। আসাদের বিরোধীদের অর্থের আরেক বড় সংস্থান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো।
সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন বছর পর ২০১৪ সালে এতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ৬০টি দেশকে নিয়ে গড়ে তোলা জঙ্গিবাদবিরোধী প্ল্যাটফর্ম নিয়ে সরাসরি সিরিয়ায় হামলার সুযোগ করে নেয় দেশটি। স্বৈরশাসক আসাদের পদত্যাগকেই সিরিয়ার সব সমস্যার সমাধান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। তাই আইএসকে দমন করতে গিয়ে আসাদের বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছে অস্ত্র। এর মধ্যে আসাদের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করলেও এখনও কুর্দি ও আরবদের নিয়ে গঠিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
আবার ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র যেমন স্বৈরশাসক উৎখাতে ভূমিকা রেখেছে, প্রায় একই ভূমিকা তারা রেখে চলেছে সিরিয়ায়ও। এর মধ্যে এতদিন সরাসরি আসাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ না চালালেও সম্প্রতি আসাদ বাহিনীর একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের নেতৃত্বে সিরিয়ায় মার্কিন তৎপরতা নিয়েও তাই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। ২০১৫ সাল থেকেই সিরিয়ায় যুদ্ধ করে আসছে রাশিয়া। সরাসরি বিমান হামলাও চালিয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আইএস দমনের নামে আসাদের বিদ্রোহীদের দমনে ব্যস্ত রাশিয়া। আবার রাশিয়ার পাল্টা অভিযোগ, আইএস দমনের নামে সিরিয়া-রাশিয়ার অগ্রগতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়ায় বিমান ও নৌঘাঁটি থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তি অক্ষুণœ রাখতেই রাশিয়া আসাদ সরকারের পাশে মিত্র হতে চায়। সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক, তা নিয়ে রাশিয়ার ভাবনা নেই।
সুন্নিপ্রধান আরব দেশগুলোর কর্তৃত্বের বাইরে শিয়া সম্প্রদায়ের আসাদ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় মিত্রশক্তি। লেবাননের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্রসহায়তা দিতেও সিরিয়াকেই ব্যবহার করে ইরান। আঞ্চলিক ক্ষমতা কাঠামোয় নিজেদের অবস্থানের কারণেই তাই ইরানের অবস্থান আসাদের পক্ষে।  
সিরিয়ায় আইএস ও আসাদের বিরোধী অবস্থানে অনড় প্রতিবেশী তুরস্ক। তবে তাদের মূল লক্ষ্য তুরস্কে স্বাধীনতার জন্য দশক ধরে লড়াই করে আসা কুর্দিরা (পিকেকে)। সিরিয়ার কুর্দিদেরও (ওয়াইপিজি) তুরস্ক পিকেকের অংশই মনে করে। তাই সিরিয়ায় যখন আইএসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ওয়াইপিজিকে সহায়তা দেয়, তখন তুরস্কও আইএসের বিরুদ্ধে থাকলেও তা তার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আইএস দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ওয়াইপিজির শক্তি বাড়ছে। তারা তুরস্কের কুর্দিদের শক্তিশালী করে তুলবে বলে মনে করে তুরস্ক।
লেবাননের দীর্ঘ যুদ্ধের সময়ের মতো সিরিয়ায়ও খুব বেশি সক্রিয় ছিল না ইসরায়েল। হিজবুল্লাহ আর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরোধিতার জন্য যতটুকু করা দরকার, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তারা। কিন্তু সিরিয়ায় ইরান ও হিজবুল্লাহর অবস্থান শক্তিশালী হতে থাকায় নড়েচড়ে বসে ইসরায়েল। সম্প্রতি সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইসরায়েলের হামলা তারই প্রমাণ।
এ পরিস্থিতিতে আইএস ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ায় সিরিয়ায় চলমান সংকট আরও তীব্র হতে শুরু করেছে। আইএসকে দমনের নামে সিরিয়ায় লড়াই চালিয়ে আসছে পরস্পরবিরোধী পরাশক্তিগুলো। একে-অন্যের বিরুদ্ধে মৌখিক লড়াই চালিয়ে এলেও সরাসরি কেউ কাউকে আক্রমণ করেনি। আশঙ্কা আছে, আইএস পরাজিত হলে এসব দেশের পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলোই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সিরিয়ায় পরাশক্তিগুলোর লড়াইকে এখন অনেকেই ‘ছায়া যুদ্ধ’ বলে থাকেন। আইএস-শূন্য মাঠে সিরিয়া নিয়ে বিবদমান দেশগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কোনদিকে নিয়ে যায়, তা নিয়েই রয়েছে শঙ্কা।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, ওমরান দাকনিশ বা আয়লান কুর্দির মতো শিশুদের জীবনে কি কোনো পরিবর্তন আসবে? যেখানে সাধারণ সিরীয়দেরই চূড়ান্ত মূল্যটি পরিশোধ করতে হয় জীবন দিয়ে। এরই মধ্যে তিন লাখেরও বেশি সিরীয়র প্রাণহানি আর প্রায় ৭৬ লাখ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার তালিকায় যুক্ত হবে আর কত সিরীয় নাম? সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দিয়ে স্বৈরশাসকের উৎখাতের যে ফল ইরাক-মিশর-লিবিয়ায় দেখা গেছে, সেই একই পরিণতি কি বরণ করতে হবে সিরিয়াকেও?
সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, ব্লুমবার্গ, আল জাজিরা ও টাইম

Disconnect