ফনেটিক ইউনিজয়
মার্কিনদের ‘যুদ্ধ-ব্যবসা’
আহমেদ শরীফ
এরিক প্রিন্সের চিন্তাভাবনা জন্ম দিচ্ছে অসংখ্য প্রিন্সের
----

এরিক প্রিন্স একজন বিতর্কিত ব্যক্তি বলেই পরিচিত। তিনি মার্কিন বেসরকারি প্রতিরক্ষা কন্ট্রাক্টর ‘ব্ল্যাকওয়াটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও পেছন থেকেই কলকাঠি নেড়েছেন বেশির ভাগ সময়। ২০০৭ সালে ইরাকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরই ব্ল্যাকওয়াটার ও প্রিন্সের নাম সামনে আসে।  সে সময় আদালতে এসে ইরাকিরাসহ প্রিন্সের অধীনে কাজ করা কন্ট্রাক্টর ও মার্কিন সেনারা অভিযোগ তোলেন, প্রিন্স নিজেকে একজন ‘খ্রিস্টান ক্রুসেডার’ বলে মনে করতেন।
এরপর এরিক প্রিন্সকে খুব একটা দেখা না গেলেও তিনি পেছনে পেছনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিরক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ সামনে রেখে তিনি বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছিলেন। তবে প্রিন্সের কোম্পানি আড়ালে চলে গেলেও তার চিন্তাধারা অসংখ্য প্রিন্সের জন্ম দিয়েছে, যারা যুদ্ধকে ব্যবসা হিসেবে দেখছেন। প্রিন্সের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাত তার  সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স তৈরি করেছে কলম্বিয়ার ভাড়াটে সেনাদের দিয়ে। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষে অংশ নিচ্ছে ভাড়াটে সেনা ও সামরিক বিমানের পাইলট। সিরিয়ায় অংশ নিচ্ছে রুশ ভাড়াটে সৈন্য। এমনকি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে ২০১৭ সালের অক্টোবরে চারজন মার্কিন সেনার মৃত্যুর পর জানা যায়, সেখানে বিপদে পড়া মার্কিন সেনাদের উদ্ধারের দায়িত্ব ছিল ‘বেরি এভিয়েশন’ নামের এক বেসরকারি কন্ট্রাক্টরের হাতে। প্রিন্সের অবর্তমানে অন্যরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রকে ব্যবহার করে চুটিয়ে ব্যবসা করে চলেছেন, তখনই আবারও আবির্ভাব এরিক প্রিন্সের।  
২০১৭ সালে প্রিন্স বলেন, মার্কিন সরকারের উচিত আফগানিস্তানের যুদ্ধকে বেসরকারীকরণ করা। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ এখন কারও কাছেই নেই। সেখানে ১ লাখ ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেও কিছু করা যায়নি। আবার প্রতি বছর আফগানিস্তানের জন্য যে পরিমাণ বাজেট রাখতে হচ্ছে, তা ব্রিটেনের পুরো সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হেরে যাচ্ছে! তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের মডেল হওয়া উচিত ‘ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি’র মতো, যেখানে একজন ‘ভাইসরয়’-এর অধীনে সবকিছু থাকবে। এভাবে সেখানে সরকারি বাহিনী রাখার রাজনৈতিক ঝামেলাও এড়ানো সম্ভব হবে।
প্রিন্সের কথায় অনেকেই হতবাক হয়েছিলেন। ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রিন্সের এ প্রস্তাবকে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট বা প্রধান কৌঁসুলি স্টিভ ব্যানন একেবারে উড়িয়ে দেননি। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব রেক্স টিলারসন এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন প্রিন্স। ট্রাম্পের পেছনে আড়াই লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। এর ফলাফল খারাপ ছিল না। প্রিন্সের বোন বেটসি ডি-ভোস এখন ট্রাম্পের শিক্ষামন্ত্রী। একই সঙ্গে ইরাক যুদ্ধের রক্তমাখা হাত মুছে নিয়ে প্রিন্স এখন ট্রাম্প প্রশাসনকে উপদেশ দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন যে আফগানিস্তান সম্পর্কে নতুন করে ভাবছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় রেক্স টিলারসনের কথায়। তিনি বলেন, আগে যা করা হচ্ছিল, সেভাবেই সব চলবেÑ ট্রাম্প এটা মেনে নেবেন না। তিনি কঠিন সব প্রশ্ন করছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলে হিসাব পাল্টেছে অনেক। ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে প্রিন্সের কাছের এক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, জন বল্টন ম্যাকমাস্টারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় প্রিন্সের ব্যবসার পালে আবারও হাওয়া লাগতে যাচ্ছে। নতুন সিআইএ প্রধান হয়েছেন মাইক পম্পেও, যিনি এর আগে বেসরকারি প্রতিরক্ষা কোম্পানিতে কাজ করেছেন। ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষানীতির বাণিজ্যিকীকরণ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এদিকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ মার্কিনদের জন্য ভালো যাচ্ছে না অনেকদিন থেকেই। অক্টোবর ২০০১ থেকে তারা আফগানিস্তানে রয়েছে; কিন্তু দেশটাকে এখনও স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তালেবানরা সেখানে তাদের দখলে থাকা ভূমিকে আরও সম্প্রসারণ করেছে এবং মার্কিনরা বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এর উপরে গত ২ এপ্রিল আফগানিস্তানের কুন্দুজে এক মাদ্রাসার ওপর মার্কিন সমর্থিত আফগান বাহিনীর বোমা হামলায় শতাধিক শিশু হতাহত হওয়ার পর সেখানে সামরিক অপারেশন নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। আল জাজিরা বলছে, এ হামলার পর পরই আফগান সরকার নিজেদের অপারেশনকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে মার্কিনদের মতোই নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রিন্সদের সমাধানের দিকেই অনেকে ঝুঁকবেন, যেখানে বেশির ভাগ অপারেশনই হবে লোকচক্ষুর আড়ালে। সরকারি বাহিনীর মতো জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে না; মানবাধিকার যতই পদদলিত হোক।  
তবে প্রিন্সের রাস্তা খুব পরিষ্কার নয়। ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার গোপন যোগসাজশে প্রিন্সের কোনো মধ্যস্থতা ছিল কিনা, সেটা এখন মার্কিন আদালত ক্ষতিয়ে দেখছেন। অভিযোগ উঠেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রিন্স রাশিয়া ও  ট্রাম্পের একটা দলের মাঝে গোপন আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। ২০১০ সাল থেকেই প্রিন্স আমিরাতে রয়েছেন। ৫১৯ মিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্টে তিনি আমিরাতের জন্য ৮০০ সৈন্যের এক ভাড়াটে স্পেশাল ফোর্স গড়ে দিয়েছেন। ফোর্সটি আমিরাতের রাজবংশকে রক্ষা করা ছাড়াও ইয়েমেনের যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, যেখানে মানবাধিকার অচল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী আফগানিস্তানে ২৩ হাজার ৫২৫ জন বেসরকারি কন্ট্রাক্টর রয়েছেন, যাদের পেছনে বছরে খরচ হচ্ছে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর আলোচনায় ভাড়াটে সৈন্যের সংখ্যা উল্লেখই করা হয় না। আফগানিস্তান কোনো কোম্পানির অধীনে বাস্তবে আসুক বা না আসুক, প্রিন্সের মতো ভাড়াটে যুদ্ধ ব্যবসায়ীরাই বিশ্বব্যাপী মার্কিনদের শুরু করা যুদ্ধগুলোকে চালিয়ে নিচ্ছে।

Disconnect