ফনেটিক ইউনিজয়
ক্রমবর্ধমান দলিত নিগ্রহ ও সুপ্রিম কোর্টের রায়
শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দলিতদের বিক্ষোভ
----

সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ঘিরে উত্তপ্ত হলো ভারতের রাজনীতি। দলিত বিক্ষোভে উত্তাল হলো বহু অঞ্চল। প্রাণ হারালেন নয়জন। যদিও সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না আসার কথাই স্পষ্ট জানিয়েছেন।
তফসিলি জাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে ১৯৫৫ সালে পাস হয়েছিল আনটাচেবিলিটি (অফেন্সেস) অ্যাক্ট। ১৯৭৬ সালে এটি নাম পরিবর্তন করে হয় প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস অ্যাক্ট। কার্যক্ষেত্রে অপারগতার কারণে এর বদলে ১৯৮৯ সালে নতুন আইন শিডিউল্ড কাস্ট অ্যান্ড শিডিউল্ড ট্রাইবস (প্রিভেনশন অব অ্যাট্রোসিটিজ) অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল তফসিলি জাতি ও নৃগোষ্ঠীর ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচার বন্ধ করতে কার্যকর একটি আইন আনা। ২০১৫ সালে এটি সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়। জাত বিদ্বেষমূলক মন্তব্যকেও জাতপাতমূলক অপরাধের আওতায় আনা হয়। এ আইনানুযায়ী  জাতবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করার ক্ষমতা রাখত। আইনের এ বিশেষ অংশটিকে নিয়েই আদালতের নির্দেশ। ২০ মার্চের আদেশ অনুসারে, সরকারি কর্মীরা জাতভিত্তিক অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে নিয়োগকারী সংস্থার লিখিত অনুমতি নিতে হবে। একই অপরাধে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়ার আগে সিনিয়র পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্টের অনুমতি ছাড়া গ্রেফতার করা যাবে না। উপরন্তু প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সারবত্তা না থাকলে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ক্ষেত্রে আগাম জামিনের আবেদন করা যাবে। ‘আইনের অপব্যবহার’ রোধের উদ্দেশ্যে এ আদেশ নিয়েই দানা বেঁধেছে বিরোধ।  
এ আদেশের পর স্বাভাবিকভাবেই ভারতজুড়ে তফসিলি জাতি ও নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ভারতে ক্রমবর্ধমান দলিতদের ওপর অত্যাচারের পটভূমিতে কীভাবে আইনের অপব্যবহার প্রাথমিক বিচার্য হলো, তা নিয়ে সরব দলিতরা। তাদের আশঙ্কা, দলিত অত্যাচারবিরোধী একমাত্র বিশেষ আইন লঘু হয়ে যাওয়ায় দলিতদের ওপর অত্যাচার আরও বাড়বে। নিকট অতীতের বেশকিছু ঘটনা দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। গত সপ্তাহেই এক দলিত যুবককে উচ্চবর্ণের সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে। কারণ তিনি একটি ঘোড়া পুষেছিলেন এবং নিম্নজাতের হয়েও ঘোড়ায় চড়তেন। এ পটভূমিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে যদি আগে অনুমতির প্রয়োজন হয়, তবে সুরাহা তো দূরের কথা, অভিযোগ নথিবদ্ধ করাই অসম্ভব হবে। এ আশঙ্কা থেকেই আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছেন দলিতরা। ২ এপ্রিল গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে বেশকিছু দলিত সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগসহ এ ঘটনায় প্রাণ হারায় অন্তত নয়জন।
এ ঘটনায় পিছু হটে কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে। যথারীতি দলিত ভোটব্যাংক বড় হওয়ায় সরকার দলিতদের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, সরকার প্রথমে বলেছিল, এ আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। এদিকে আবার সেই সরকার পুনর্বিবেচনা চায়। বিচারপতিরা যদিও এ রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেননি। তবে বাদী সম্বাদী পক্ষকে এ ব্যাপারে মতামত জানাতে বলা হয়েছে। বিচারপতিদের বক্তব্য, গ্রেফতারি সম্পর্কে আইনের স্থিরকৃত নিয়ম অনুযায়ীই তারা আদেশ দিয়েছেন।
সরকারে থাকা বিজেপির নানা রকম উলটপূরণ দেখে ভারতবাসী বিস্মিত। প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে দলিতের পক্ষে বিজেপির মায়াকান্না ও রিভিউ পিটিশন দাখিল প্রকৃতপক্ষে চাপের ফল। হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা হিন্দুত্ববাদীরা সরাসরিই জাতভিত্তিক সমাজের কথা বলে ও তার পক্ষে যুক্তি দেয়। তাদের নেতাকর্মীরা কখনও রোহিত ভেমুলার বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করে, কখনও রোহিতের মৃত্যুর পর তার জাত নিয়ে সন্দেহ করার অশালীনতা দেখায়। উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকার তো যোগীর দলিত বস্তি পরিদর্শনের আগে সেখানে সাবান বিতরণ করে পরিষ্কার থাকার নির্দেশ দিয়ে বিতর্ক কুড়িয়েছে। লোকনীতি-সিএসডিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিজেপি ২০১৪ সাল পর্যন্ত উচ্চবর্ণের ভোটের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। হিন্দুত্ববাদী আদর্শে নিম্নবর্ণের স্থান অনুযায়ীই তাদের সম্পর্কে সরকারের মনোভাব স্থির রয়েছে। যদিও বিজেপিকে দলিত ভোটব্যাংকের দিকেও নজর দিতে হচ্ছে। যে সরকারের আমলে জাতভিত্তিক অত্যাচারের সুরাহা প্রায় অসম্ভব, সেখানে দলিতদের ওপর অত্যাচারবিরোধী আইন লঘু হওয়া যে বিজেপির জন্য অসুবিধার না, তা বলা বাহুল্য। লোক দেখানো ব্যবস্থা নেয়াটা ভোট রাজনীতির অঙ্গ। বস্তুত চার হাজার বছরের ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ ব্যবস্থা ভারতীয় সমাজকে এখনও গ্রাস করে আছে তার প্রমাণ প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়। গোঁফ রাখা বা ঘোড়ায় চড়ার মতো সাধারণ ঘটনাকে নিম্নবর্ণের লোকের শুধু ‘দুঃসাহস’ মনে করা নয়, ‘সবক শেখাতে’ মারধর বা হত্যা করাও যেন খুব সাধারণ! এখনও ভারতে সমাজের সর্বস্তরে জাত ব্যবস্থার বিষের অস্তিত্ব প্রমাণিত। আম্বেদকার তার ‘অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট’ গ্রন্থে ১৯৩৫ সালে উল্লেখ করেছিলেন দলিতের ভোজে অভ্যাগতদের ঘি পরিবেশন করার অপরাধে গৃহকর্তা ও নিমন্ত্রিতদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার কথা। আজও সেই একই সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য, দলিত হয়ে কিছুদিন আগে উচ্চবর্ণের পাড়া দিয়ে বিয়ে করতে যাওয়ার ‘অপরাধে’ নিগৃহীত হন হবু বর।
এমন পরিস্থিতিতে, বিশেষত শাসনে অবস্থিত মতাদর্শ যখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হিন্দু সমাজ অর্থাৎ জাতভিত্তিক সমাজের কথা প্রচার করে চলেছে, তখন দলিত নিগ্রহরোধী অন্যতম একটি আইনের ধারাকে লঘু করে দেয়ায় কার্যত আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।  

Disconnect