ফনেটিক ইউনিজয়
বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
আহমেদ শরীফ
হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রেরের প্রভাব কমছে
----

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের মধ্যে আলোচনা হওয়াটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ এ ঘটনা বহু বছরে প্রথমবারের মতো ঘটল। ২০১৮ সালে শীতকালীন অলিম্পিকে দুই কোরিয়ার একত্রে কুচকাওয়াজের পর থেকেই কোরীয় উপদ্বীপে শান্তিই শুধু নয়, দুই কোরিয়ার একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নিয়েই শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। তবে সেই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে প্রথমে দেখতে হবে বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক সুপারপাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরিয়াকে দুই ভাগ করে ফেলে। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ার যুদ্ধের পরও এ বিভক্তি থেকেই যায়। কোরিয়ার যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ায় সামরিক শক্তি মোতায়েন রেখে চলেছে। বর্তমানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ হাজারের মতো সৈন্য রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনার জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র জাপানেও বিশাল সামরিক বাহিনী মোতায়েন রেখেছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে মার্কিনদের সম্পর্কোন্নয়নের সাথে সাথে ফিলিপাইন থেকে মার্কিনরা তাদের নৌ ও বিমানশক্তিকে সরিয়ে ফেলে। তবে কোরিয়া ও জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি সরায়নি। উভয় দেশেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটির বিরুদ্ধে আন্দোলন রয়েছে। জাপান টাইমসের এক প্রতিবেদনে জাপানের দক্ষিণের ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জে মার্কিন ঘাঁটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে বলা হয়, ওকিনাওয়ার জনগণ প্রশ্ন তুলছে, সমগ্র জাপানে মোট ৫০ হাজার মার্কিন সেনার ৭০ শতাংশ কেন ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জে। ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নতুন নয়, যা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন সরকার। এতে নিয়মিতই ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। এর উপরে আবার গত নভেম্বরে মদ্যপ হয়ে গাড়ি চালিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার পর সেখানে মার্কিন সেনাদের মদ খাওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। জাপানে মার্কিন সামরিক অবস্থানকে ধরে রাখতে জাপানের রাজনীতিবিদদের বেশ কষ্ট করেই পক্ষে রাখতে হচ্ছে মার্কিনদের।  
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমনের পর থেকে উত্তর কোরিয়ার সাথে মার্কিন সরকারের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে নিয়মিত বিরতিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর সবচেয়ে ভীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে কোরিয়ার প্রতিবেশী জাপানকে। কোরিয়ার নিক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাপানের আকাশসীমা পার হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়েছে, যা জাপানকে যারপরনাই ভীতিতে ফেলেছে। উত্তর  কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা জাপানকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী করা ছাড়াও তার সমগ্র সামরিক শক্তিকে নিয়েই নতুনরূপে ভাবতে শিখিয়েছে। জাপানের যুদ্ধবিরোধী সংবিধানে আগ্রাসী অস্ত্র তৈরি ও ক্রয় নিষেধ থাকলেও কোরিয়ার উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে জাপান সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসছে। জাপানের সামরিকীকরণ একই সাথে বিচলিত করেছে চীনকে। চীন যখন দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগরে তার প্রভাব বাড়াতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কোরিয়ার উত্তেজনা জাপানকে দাঁড় করিয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। একই সাথে জাপানে মার্কিন ঘাঁটি রাখার সমর্থকদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির পায়রার আনাগোনা পুরো হিসাব-নিকাশই যেন পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করছে। কোরিয়া ও জাপানে মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখার মূল কারণটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে দুই কোরিয়ার শান্তি আলোচনা।
ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত পৃথিবীর ৩৮টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রদূত নেই। এর মাঝে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত কাছের কয়েকটি দেশ। দক্ষিণ কোরিয়াও এর মধ্যে একটি। কোরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। প্রতিটি দেশে মার্কিন স্বার্থরক্ষার কাজ সে দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতই করে থাকেন। আর রাষ্ট্রদূতের অভাবে সে দেশে মার্কিন প্রভাব কমতে থাকে। ওই ম্যাগাজিনের লেখায় বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমে যাওয়ার পেছনে মিত্র রাষ্ট্রগুলোয় মার্কিন দূত না থাকাকে দোষারোপ করা হয়।
পশ্চিমা সেকুলার চিন্তার ঝা-াবাহক হয়েও যুক্তরাষ্ট্র সে চিন্তাগুলোকেই সমূলে উৎপাটিত করেছে ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়ার মতো দেশগুলোয় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে। আবু গারিব ও গুয়ান্তানামো বের কয়েদখানাগুলোয় মার্কিন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিন্দা বয়ে আনা ছাড়াও তার আদর্শিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সেই আদর্শিক অবস্থানে রাখতে মোটেও চেষ্টা করছেন না। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও অনেকেই তার পক্ষে রয়েছেন। ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আদর্শিক শক্তি নয়, বরং মার্কিন জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবেই নিজেকে দেখতে শুরু করেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এবার ৭১৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট চাইছেন, যার মূল টার্গেট করা হচ্ছে চীন ও রাশিয়াকে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের অবতারণা করা ছাড়াও হুয়াই ও  জেডটিইর মতো চীনা টেলিকম কোম্পানির বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ তুলে মার্কিন সীমানার ভেতরে ব্যবসা বন্ধ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সাথে তুরস্ককেও সামরিক দিক থেকে চাপে ফেলার চিন্তা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। নীতিনির্ধারকদের অনেকেই তুরস্কের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান বিক্রি ঠেকাতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর একটিও আদর্শিক শক্তি নয়। এদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে এনে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের পরিবর্তিত অবস্থানের কথাই জানান দিচ্ছে। সুইডিশ গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৬১০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট সারা দুনিয়ার মোট সামরিক বাজেটের ৩৫ শতাংশ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পরের সাতটি দেশের মোট সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি ছিল মার্কিন বাজেট। এর পরও প্রভাব হারাচ্ছে দেশটি। আর সামরিক বাজেটের বিশাল বৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চাইছে। তবে সে চেষ্টা কতটা সফল হতে পারে, তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে দুই কোরিয়ার শান্তি আলোচনার মতো ঘটনাগুলো।

Disconnect