ফনেটিক ইউনিজয়
তথ্য ফাঁস : গোপনীয়তার অধিকার বনাম আধার কার্ড
শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা
এভাবেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে জনগণের গোপনীয় তথ্য
----

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ২০১৬ সালে আধার আইন পাস করে। শুরু থেকেই এ আইন বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। অর্থবিল না হওয়া সত্ত্বে¡ও আইন পাস করানোয় যেনতেন প্রকারে একটি বিতর্কিত বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আধার আইন মোতাবেক নাগরিকদের কাছ থেকে তার বায়োমেট্রিক তথ্য নিয়ে তাকে একটি নির্দিষ্ট নম্বর দেয়া হয়। এ নম্বরের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি জনসুবিধার ‘টার্গেটেড ডেলিভারি’ হওয়ার কথা। তত্ত্বানুযায়ী, বায়োমেট্রিক তথ্যভিত্তিক পরিচয়ে সেবা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তবের চিত্র এর ঠিক উল্টো। নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য ফাঁস হওয়ার একাধিক ঘটনা আধারকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তথ্য ফাঁসের তালিকায় নতুন করে যোগ হলো প্রভিডেন্ট ফান্ড সংস্থা ইপিএফওর পোর্টাল হ্যাক হয়ে যাওয়া। এ ফান্ডের সঙ্গে প্রাপকদের আধার সংযোগ করাতেই হয়।
শুরু থেকেই বিভিন্ন জনপরিষেবা যেমন রেশন, রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি অথবা ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের সুবিধা ইত্যাদির জন্য আধারকে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা চলতে থাকে। যুক্তি ছিল, এতে পরিষেবা বা সামাজিক সুরক্ষা নির্দিষ্ট সুবিধা প্রাপকের কাছেই পৌঁছবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আধারকে শুধু পরিষেবার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একমাত্র পরিচয়পত্র হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। আধার প্রজেক্ট ও আইনের বৈধতা নিয়ে মামলা আপাতত  সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তা সত্ত্বেও আগ্রাসীভাবে আধারকে একমাত্র পরিচয়পত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফোন নম্বর বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ‘সরকারি সুবিধা’র বিন্দুমাত্র সংযোগ না থাকলেও আধার সংযোগ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ফোন বা অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযোগ পিছিয়ে দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও সরকারের পরোক্ষ মদদে আধার ছাড়া সিম কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব টাকা ব্যাংকে রাখার পর সেই টাকা তুলতে বায়োমেট্রিক তথ্যের প্রয়োজন কী, এ প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না জনতা। বিশেষত যখন একের পর এক ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় দেখা গেছে, তা হয়েছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের চেনাজানার সুবিধা নিয়ে। বিতর্কের মূল জায়গা বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ। এটি এখনো বিকশিত বিজ্ঞান নয়। বহু জায়গায় হ্যাকাররা এর ফাঁপা চরিত্র উন্মোচন করেছে। এ অবস্থায় ভারতের মতো দেশের এতসংখ্যক মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ কতদূর যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে জনপরিষেবা দেয়ার নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারির উপায় মনে করছেন।
বস্তুত প্রতি মুহূর্তে নাগরিকরা বিভিন্ন কাজে নিজেদের তথ্য দিয়ে চলেছেন। ট্রেনের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা, ফোনের সিম তোলা বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ প্রায় সব কাজে আধার সংযুক্ত থাকায় মাউসের একটি ক্লিকে সব তথ্য এক জায়গায় চলে আসে। ফলে রাষ্ট্রের পক্ষে কোনো নাগরিকের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ বা মানবাধিকারকর্মীরা আধারের মূল উদ্দেশ্য গণনজরদারি বলেই মনে করছেন।
এ পরিস্থিতিতে আধার ব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল অংশ বেরিয়ে আসছে তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে। একের পর এক সরকারি পোর্টাল থেকে নাগরিকদের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর সর্বশেষ সংযোজন ইপিএফও পোর্টাল কেলেঙ্কারি। সম্প্রতি কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের সঙ্গে আধার লিংক করতে সাহায্যের জন্য সরকার পরিচালিত একটি ওয়েব পোর্টাল হ্যাক করা হয়। জানা যায়, সাইটটি থেকে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তথ্য ফাঁস হচ্ছিল, আর হ্যাকারদের কাছে কী পরিমাণ তথ্য রয়েছে, তাও জানা যায়নি। ইপিএফও থেকে কোনো তথ্য ফাঁসের খবর নেই বলে জানানো হলেও, সিকিউরিটি চেকের জন্য ওই পোর্টালের কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এর আগেও অন্ধ্র প্রদেশ সরকারের গ্রামীণ কর্মযোজনাসংক্রান্ত একটি পোর্টাল থেকে প্রায় দেড় লাখ নাগরিকের তথ্য ফাঁস হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে ইপিএফও কেলেঙ্কারি নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সংস্থাটি যা-ই দাবি করুক, ইপিএফওর প্রভিডেন্ট ফান্ড কমিশনার লিখিত আধার সংযোগ প্ল্যাটফর্ম সিএসসির সিইওকে লেখার একটি গোপন চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে, যাতে পত্র প্রেরক তথ্য ফাঁসের ব্যাপারটি স্বীকার করে নিয়েছেন।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, যে দেশে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ওয়েবসাইট হ্যাকারদের কবল থেকে রক্ষা পায় না, সেখানে নাগরিকদের থেকে সংগৃহীত তথ্য সুরক্ষিত থাকে কী করে? তাছাড়া যেভাবে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত জানাবোঝার ভিত্তিতে দেয়া সম্মতির তোয়াক্কা না করেই নাগরিকদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সর্বক্ষেত্রে আধারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রচেষ্টা চলছে নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই, এখানে এটাই স্পষ্ট যে, আধারের মূল উদ্দেশ্য নির্দেশিত জনসেবা নয়, বরং জনগণের ওপর নজরদারি চালানোটাকে সুবিধাজনক করে তোলা। এক্ষেত্রে সরকার নাগরিকদের গোপন তথ্যের লোক দেখানো সুরক্ষার ব্যবস্থাও করছে না।
ভারতের মতো দেশে, যেখানে মানুষের ডিজিটাল স্বাক্ষরতার হার অনেক পেছনে, সেখানে নাগরিক অধিকারের ওপর নামিয়ে আনা এ আক্রমণ হয়ে চলেছে জনতার জানাবোঝার বাইরেই। তথ্য চুরিজাতীয় কোনো ধারণাই যেখানে দেয়া হয়নি, সেখানে তথ্য সংগ্রহ করে নেয়া মানুষের অধিকারবিরোধী। এ ব্যাপারে সরকারের গা-ছাড়া ভাবে তার জনপ্রেমের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি আধার আদৌ সুবিধা প্রদানের উদেশে কিনা সেটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকে।
আধারের সাংবিধানিক বৈধতাসংক্রান্ত মূল মামলা, পুত্তাস্বামী বনাম ভারত সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দিয়েছিলেন, গোপনীয়তার অধিকার একটি  মৌলিক অধিকার। সে মামলায় গোপনীয়তা ভঙ্গকারী আধার আইনকে শেষমেশ বাতিল করা হয় কিনা তা দেখতে উদগ্রীব জ্ঞাত জনগণ।

Disconnect