ফনেটিক ইউনিজয়
যুক্তরাষ্ট্রের ইরান চুক্তি বাতিল
নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা
তরিকুর রহমান সজীব
পরমাণু চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
----

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগ থেকেই ইরানের পরমাণু চুক্তিকে ‘ইতিহাসের জঘন্যতম’ বলে অভিহিত করে আসছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের দেড় বছর পূরণ হওয়ার আগেই সে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বেশি উসকে দিতে পারে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত। এ থেকে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। চুক্তির আওতায় থাকা দেশ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এ সিদ্ধান্তকে ‘প্যানডোরার বাক্সের মুখ খুলে দেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মন্তব্য, এটা যুদ্ধের শামিল।
পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার শর্তে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেই সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ইরানের সঙ্গে ছয় দেশ চুক্তিবদ্ধ হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)’ শীর্ষক এ চুক্তিতে সই করে জার্মানি। প্রায় দুই বছরের আলোচনার পর সই হওয়া এ চুক্তির মাধ্যমে ইরান যেকোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকতে সম্মত হয়। বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পরমাণু কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিশ্ব সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এরই মধ্যে ১০ বার জানিয়েছে, চুক্তি মেনেই চলছে ইরান। বিশ্লেষকরা বলছে, ইরান চুক্তি মেনে চললেও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কারণেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এ ঘোষণার একদিন পরই সিরিয়ায় ইরানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটি বলছে, ইসরায়েল দখলকৃত সিরীয় ভূখণ্ড গোলান হাইটসে ইরানের রকেট হামলার জবাব দিতেই এ হামলা। এ হামলা-পাল্টা হামলার খবর সত্য হলে সিরিয়ার ভেতর থেকে ইসরায়েলি কোনো স্থাপনায় এটাই ইরানের প্রথম হামলা। আর এর আগে ইসরায়েলও কোনো ইরানি স্থাপনায় এত বড় হামলা চালায়নি। স্পষ্টতই প্রতিপক্ষ দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। শুধু তা-ই নয়, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের যে সংঘাত, পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাকে আরও উসকে দেবে। এসব হামলা তারই প্রতিফলন।
মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল-সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে মরিয়া ইরানের দুই প্রতিপক্ষ। এর মধ্যে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়া সৌদি রাজতন্ত্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। মাঝখানে তেলের দাম ব্যাপকভাবে পড়ে যাওয়ায় দেশটির অর্থনীতিও ধুঁকতে শুরু করেছে। দেশটির যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান এখন সৌদি আরবের আধুনিকায়নে মনোযোগী। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সৌদি সফরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়ে এসেছেন, পাশেই আছেন তিনি। একইভাবে জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে অটল থেকে ইসরায়েলের স্বার্থে অন্য সবাইকে অগ্রাহ্য করার নীতিও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প। ফলে ইরান চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বস্ত বন্ধুর জন্য ট্রাম্পের উপহার।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার রাজনীতি বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলছেন, অপরাধমূলক পররাষ্ট্রনীতিকে বৈধতা দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সবসময় শত্রুর প্রয়োজন হয়। কমিউনিস্ট, আরব জাতীয়তাবাদ ও জঙ্গিদের পর এখন তাদের শত্রু ইরান। আবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জন্যও ইরান হুমকি। ফলে মিত্র দেশের জন্য কোনো হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্র স্বস্তিতে থাকতে দেবে না, সেটাই স্বাভাবিক।
আর এ পরিস্থিতিতেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সংঘাতকে আরও উসকে দেবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। এ সংঘাত নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাবক বলেও মনে করছেন তারা। শান্তিতে নোবেলজয়ী আইএইএর সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আল বেরাইদও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার মন্তব্য, বিশ্বে আরও একটি যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হলো। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি বিরোধে সরাসরি সৌদি আরবের মুখোমুখি ইরান। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে এ দুই দেশ ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। আবার লেবাননেও রয়েছে ইরানের সক্রিয় উপস্থিতি। এদিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইরত হামাসের প্রধান মিত্র ইরান। আবার ফিলিস্তিনের মিত্র ও ইসরায়েলের প্রতিপক্ষ হিজবুল্লাহর প্রধান সহায়তাকারীও ইরান। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গেও ছায়াযুদ্ধ চলছে ইরানের।
পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দেয়ার আকাক্সক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর পরমাণু অস্ত্র তাক করেছে ইরান। ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর এ অভিযোগের সুরেই বলেছেন, ইরানকে এ কারণেই কোনোভাবে বিশ্বাস করা যায় না। আবার সৌদি যুবরাজও বলেছেন, আমরা পারমাণবিক বোমা চাই না। তবে ইরান এমন বোমা বানালে আমরা বসে থাকব না। বিশেষজ্ঞরা তাই আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ যেকোনো সময়ই সরাসরি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ইসরায়েলে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্টিন এস ইন্ডিক বলছেন, এটি একেবারে সরাসরি যুদ্ধ। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট পলিসির পরিচালক নাটান স্যাকও মনে করছেন, এ সংঘাত থামবে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সব পক্ষই নিজ নিজ সক্ষমতার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করবে।
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সানাম ভাকিল মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াশিংটনের বোঝাপড়ার অভাবই ফুটে উঠেছে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের হস্তক্ষেপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত রাজনৈতিক উত্তাপের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বদলে বরং ট্রাম্প সেই দৈত্যকেই মুক্ত করে দিলেন, যাকে এখন বোতলে ভরে ফেলাটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র : গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই, সিএনবিসি, দ্য হিল ও টাইমস অব ইসরয়েল

Disconnect