ফনেটিক ইউনিজয়
মালয়েশিয়ার ‘ইউ-টার্ন’
আহমেদ শরীফ
বয়সের ভারকে জয় করে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী
----

বয়স ৯২ বছর। তবুও বয়সের ভারকে জয় করে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন। নির্বাচনে নাজিব রাজাক সরকারের পরাজয়ের মাধ্যমে রাজাকের বারিসান নাসিওনাল কোয়ালিশন সরকারের ১৯৭৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকার অবসান ঘটল। মাহাথির নিজেই বারিসান নাসিওনালের দলপতি ছিলেন। এর পরও মাহাথিরের ক্ষমতায় আরোহণ বা বিরোধী দলের নির্বাচনে জেতার জন্য নয়, বরং ভূরাজনৈতিক কারণেই মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল গুরুত্বপূর্ণ।  
১২ মে মাহাথির মোহাম্মদ তার অর্থমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেছেন। লিম গুয়ান এং হলেন ৪৪ বছরের মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রথম চীনা বংশোদ্ভূত অর্থমন্ত্রী। ১৯৫৯-৭৪ সাল পর্যন্ত টান সিউ সিন ছিলেন শেষ চীনা বংশোদ্ভূত অর্থমন্ত্রী। এরপর থেকে সব অর্থমন্ত্রীই ছিলেন মালয়ের। লিম গুয়ান এংকে তার চীনা পরিচয়ের কথা মনে করিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে এং বলেন, তিনি নিজেকে চীনা নয়, বরং মালয়েশীয় হিসেবে দেখেন। বলেন, তার প্রথম কাজ হবে ‘অসুবিধাজনক চুক্তি’গুলোকে নতুন করে দেখা। এংয়ের এ কথাগুলো মাহাথিরের নির্বাচনী প্রচারণার সময়কার চীনাদের বড় বিনিয়োগগুলো নিয়ে কথা বলাকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। গণমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর এক লেখায় বলা হয়, মালয়েশিয়ায় চীনা বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখের মতো, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। জাতিগতভাবে চীনা হলেও মালয়েশিয়ার সঙ্গে তাদের বিশ্বাসের সম্পর্কে ভাটা ফেলতে তারা ইচ্ছুক নন। মালয়েশিয়ায় জন্ম নেওা চীনা বংশোদ্ভূতরা এখন প্রকৃতপক্ষে মালয়েশিয়ান, যারা ‘ওয়ান মালয়েশিয়া’ সেøাগানে বিশ্বাসী। ২০১৫ সালে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়াং হুইকাং কুয়ালালামপুরের চায়না টাউনে গিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফেঁসেই যান। তার ওই কথাগুলোকে মালয়েশিয়ার চীনা বংশোদ্ভূতরা ভালোভাবে নেননি। কারণ তারা মনে করছিলেন, চীনা রাষ্ট্রদূত মালয়েশিয়ার প্রতি তাদের আনুগত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছেন। আর মালয়েশিয়ার সরকারও মনে করছিল, এটা দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীনাদের হস্তক্ষেপ। চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের বর্তমান নীতিতে বিশ্বের সব দেশে জাতিগতভাবে চীনাদের কৌশলগত দিক থেকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা জিনপিং কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ হলো মালয়েশিয়ার নির্বাচনে। ভূরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্রাটফর’ বলছে, এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জাতিগতভাবে চীনা শক্তিশালী প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার মাঝে মালয়েশিয়ায় চীনা সম্প্রদায়ের প্রভাব কমার লক্ষণই দেখা যাচ্ছে।     
গত ১ এপ্রিল মালয়েশিয়ান প্রত্রিকা ‘বেরনামা’য় এক সাক্ষাৎকারে মাহাথির বলেন, তার দল পাকাতান হারাপান কোয়ালিশন জয়ী হলে ‘ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক’ নামের চীনা প্রকল্প বাতিল করে দিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এ প্রকল্পে মালয়েশিয়ার মালয় উপদ্বীপের পূর্র্ব উপকূল বরাবর ৬৮৮ কিলোমিটার লম্বা হাই-স্পিড রেললাইন তৈরি করা হবে। ৫৫ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের সেই প্রকল্পকে অর্থ নষ্ট করার সঙ্গে তুলনা করেছেন মাহাথির। চীনা এ প্রকল্প চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কৌশলগত পরিকল্পনারই অংশ।
শুধু এ রেল লাইনই নয়, মাহাথির সিঙ্গাপুরের উত্তরে মালয়েশিয়ার জহরে ফরেস্ট সিটি নামের বিরাট আকারের বেসরকারি বসতি প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বেশির ভাগ মালয়েশীয়র জন্যই এ বসতির অ্যাপার্টমেন্টগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে, কাজেই এর প্রয়োজন কতটুকু, তা দেখা দরকার। মাহাথিরের এ কথাগুলো অনেককেই ভাবাচ্ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় চীনা প্রকল্পগুলোকে নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের। গত পাঁচ বছরে চীনারা মালয়েশিয়ায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন ব্যাংক সিটি গ্রুপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, চীনারা মালয়েশিয়ায় দুই দশকের মধ্যে রেল ও সমুদ্রবন্দরসহ অবকাঠামো খাতে ৯৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে, যা এ অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে চীনাদের মালয়েশিয়ার সমুদ্রবন্দরের বিনিয়োগকে লাভজনক দেখছে না সিটি গ্রুপ। তারা বলছে, এ বন্দরের বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ। কাজেই বন্দর উন্নয়নের পেছনে চীনাদের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। উদাহরণ হিসেবে বলছেন, মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূলে বন্দর উন্নয়ন করতে পারলে মালাক্কা প্রণালির নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে চীনারা সুবিধা পেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, মালয়েশিয়া এতকাল পশ্চিমা নির্মিত অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও নজিব রাজাকের সময়ে তারা চীনাদের থেকে অস্ত্র কেনায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। মালয়েশিয়ায় চীনাদের এ প্রকল্পগুলোকে অনেকেই তাদের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছিলেন। বিশেষ করে কৌশলগত মালাক্কা প্রণালির ওপর অবস্থিত হওয়ায় চীনসহ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান ও পূর্ব এশিয়ার বাকি দেশগুলোর কাছেও মালয়েশিয়ার গুরুত্ব অনেক।
‘স্ট্রাটফর’ বলছে, মাহাথিরের দল ক্ষমতায় আসার আগে চীনা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা প্রকল্পগুলো বন্ধ করায় উদ্যত হবেন না। কারণ মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীনাদের এসব প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক। মাহাথির নিজেও আগে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছিলেন এবং সম্পর্কোন্নয়ন করেছিলেন। বর্তমানে মালয়েশিয়ার মোট বাণিজ্যের ১৫ শতাংশ হয় চীনের সাথে। তবে এতকাল মালয়েশিয়ার রাজনীতিকে নিয়ে অনেকেই যতটা নিশ্চিত ছিলেন, ততটা এখন কেউই থাকতে পারছেন না। মাহাথিরের দল খুব অল্প ব্যবধানেই নির্বাচনে জিতেছে, যা সবাইকেই অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলেছে। এর মধ্যে চীনারাও রয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পরও আঞ্চলিক রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটানোর ক্ষমতা এখনও চীনারা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।

Disconnect