ফনেটিক ইউনিজয়
তুতিকোরিন হত্যাকাণ্ড
সরকার ও বহুজাতিক সংস্থার আঁতাত প্রকট
শৌর্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা
বেআইনি কার্যকলাপে ক্রমাগত বৈধতা দিয়ে চলা সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে জনতা
----

তামিলনাড়ূর তুতিকোরিনে স্টারলাইট কপারের তামা উৎপাদন কেন্দ্রের দূষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৩ জন নিহত হন। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘাতের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি করা হয়েছিল। গত ২২ মে প্রথম দিনেই ১১ জন আন্দোলনকারী নিহতের দুদিন পর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন আরও একজন। পরে আরেক আন্দোলনকারী নিহত হলে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তামিলনাড়ূ সরকার। এ ঘটনা  কেন ঘটল, তামিলনাড়ূ সরকারের কাছে তার জবাব চেয়েছেন আদালত।    
স্টারলাইটের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্দোলন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নয়। প্রায় দুই দশক ধরে ১৯৯৮ সাল থেকে তুতিকোরিনের মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। গত ২৪ মার্চ থেকে আন্দোলন সর্বাত্মক আকার নেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি একদিনের ধর্মঘট পালন করে। স্থানীয় জেলে সংগঠন, অটোচালক ইউনিয়ন থেকে শুরু করে তুতিকোরিন চেম্বার অব কমার্স- প্রত্যেকেই আন্দোলনে যোগ দেয় সরকারি মদদে রমরমিয়ে দূষণ চালাতে থাকা বেদান্ত স্টারলাইট কপারের তুতিকোরিন ইউনিট বন্ধের দাবিতে। ফলাফল স্নাইপার দিয়ে জনতার ওপর গুলি চালনা ও রাষ্ট্রীয় মদদে নাগরিক হত্যা। গত ২২ মের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় ও গুলিতে ১৩ জন নিহত ছাড়াও আহত হয় শতাধিক।
স্টারলাইট কপার লন্ডনে লিস্টেড ভারতীয় মালিকানাধীন বেদান্ত রিসোর্সেস গোষ্ঠীর তামা উৎপাদক শাখা। ১৯৯৩ সালে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবের জন্যই মহারাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনের অনুমতি পায়নি। এক বছরের মধ্যেই তামিলনাড়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নো অবজেকশন সার্টফিকেটসহ স্টারলাইট কপারের তুতিকোরিন ইউনিট স্থাপিত হয়। প্রসঙ্গত, নো অবজেকশন সার্টিফিকেটে একটি শর্ত ছিল, মান্নার উপসাগর থেকে অন্তত ২৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা স্থাপন করতে হবে এবং একটি এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) করতে হবে- ওই দুই শর্তের একটাও মানা হয়নি, স্মেল্টার তৈরি হয়েছে মান্নার উপসাগরের ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে। আর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে ইআইএ ছাড়াই ছাড়পত্র পেয়ে যায় স্টারলাইট। তামিলনাড়ূ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ লাইসেন্সের ক্রমাগত শর্ত লঙ্ঘন সত্ত্বেও ছাড়পত্র দিয়ে গেছে স্টারলাইটের ক্রমাগত উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোকে মান্যতা দিয়ে। দূষণ কমানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কোম্পানির পক্ষ থেকে। অন্যদিকে তারা উৎপাদন ক্রমাগত বাড়িয়েছে দৈনিক ৩০০ থেকে ৯০০ টন পর্যন্ত। যদিও সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত পরিদর্শক দল এ সম্প্রসারণের বিপক্ষে অভিমত জানিয়েছিল, তা সত্ত্বেও সরকার থেকে সম্প্রসারণের অনুমতি স্টারলাইট পেয়ে যায়। এ মুহূর্তে আন্দোলন  জোরদার হয়ে ওঠার প্রত্যক্ষ কারণ স্টারলাইটের ইউনিট সম্প্রসারণ পরিকল্পনা- যার ফলে কোম্পানি দৈনিক ১২০০ টন উৎপাদনক্ষমতার লাইসেন্স পেয়ে যাবে। উৎপাদনক্ষমতা বাড়ার অর্থ আরও বেশি মাত্রায় বায়ুদূষণ, যা থামাতে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে মাত্রা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
বেআইনিভাবে কারখানা চালানোর বিতর্ক ছিল চিরসঙ্গী, সঙ্গে চিরস্থায়ী দূষণের অভিযোগ। স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই স্টারলাইট কারখানার বায়ুদূষণে তুতিকোরিনের মানুষেরা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। আদালত বারবার স্টারলাইটের কাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন, তাতে কাজ থেমেছে দু-একদিনের জন্য। অবশেষে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির জেরে তামিলনাড়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ স্টারলাইট কপারের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।
তুতিকোরিন আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য শুধু স্টারলাইটের কার্যকলাপ নয়, বরং  বেআইনি কার্যকলাপে ক্রমাগত বৈধতা দিয়ে চলার সরকারি নীতির বিরুদ্ধেই ফুঁসে ওঠে জনতা। ক্রমাগত আইন ভঙ্গ করে গেলেও কী করে বারবার স্টারলাইটের লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হয়, প্রশ্ন আন্দোলনকারীদের।
প্রসঙ্গত, ভারতে খনিজ উত্তোলক কোম্পানি বেদান্ত গোষ্ঠী অন্যান্য জায়গাতেও একই দোষে অভিযুক্ত, তাদের সঙ্গী সরকারি মদদ। ছত্তিশগড়ের বস্তার অরণ্য, বা ওড়িশার নিয়মগিরি, সর্বত্রই সরকারি বাহিনীকে সঙ্গী করে বহুজাতিক কোম্পানিটি  দেশীয় সম্পদ বিদেশে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। একাজে বারবারই  লেঠেলের ভূমিকায় সরকারি বাহিনী।  দেশীয় সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দিতে দেশের সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই মানবাধিকার ও রাজনৈতিক কর্মীদের আক্রমণের নিশানা।
তুতিকোরিনের ঘটনায় একটা বিষয় পরিষ্কার যে, প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে যা এতদিন সীমাবদ্ধ ছিল, করপোরেট স্বার্থে নাগরিকদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানোর এ কার্যক্রম এখন সংক্রমিত হয়েছে শহরাঞ্চলেও। তুতিকোরিনের মতো ব্যস্ত বন্দর শহরে স্নাইপার দিয়ে গুলি চালানো হয়েছে। কোন উদ্দেশ্যে বা কার স্বার্থের জায়গা থেকে সরকার ক্রমাগত আড়াল করে চলেছে বেদান্তসহ আরও বহুজাতিক সংস্থাগুলোর দূষণ ও জাতীয় সম্পদের লুট?  তুতিকোরিনের ঘটনা আরও একবার এ প্রশ্নকে সরব করে তুলেছে। একদিকে বিভিন্ন পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক দলিল স্বাক্ষর, দেশীয় আইন পাস, অন্যদিকে কার্যক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো রাস্তা নেয়ার সরকারি নীতি মানবাধিকারের লড়াই ও পরিবেশ রক্ষার লড়াইকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে।

Disconnect