ফনেটিক ইউনিজয়
সিরিয়ায় মুখোমুখি হচ্ছে তুরস্ক-সৌদি আরব
আহমেদ শরীফ
মার্কিনরা হাত গুটিয়ে নিলে সৌদিরা সরাসরি মুখোমুখি হবে তুর্কিদের
----

তুর্কি মিডিয়া আনাদোলু এজেন্সি গত ২৯ মের এক প্রতিবেদনে বলছে, সৌদি আরবের তিনজন সামরিক উপদেষ্টা কুর্দি মিলিশিয়া সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে সিরিয়ার কোবানিতে গেছেন। এসডিএফ হলো কুর্দিদের মার্কিন সমর্থিত অংশ, যাদেরকে তুর্কি সরকার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে কুর্দি পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটের (ওয়াইপিজি) প্রতিনিধি হিসেবে আখ্যা দেয়। এ বছরের জানুয়ারি থেকে সিরিয়ার আফরিনে এসডিএফের সঙ্গে তুর্কি সরকারি বাহিনী ও তাদের সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপ ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সংঘর্ষ চলছে। তবে এসডিএফের মধ্যে আল-সানদিদ গোত্র থেকে আসা কিছু আরব অংশও রয়েছে। সৌদি সামরিক উপদেষ্টারা আল-সানদিদকে কেন্দ্র করে উত্তর সিরিয়ায় আরবদের একটা আলাদা গ্রুপ তৈরি করতে যাচ্ছে। আনাদোলু আরও বলছে, সৌদিরা সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের আল-হাসাকাহ ও আল-কামিশি শহরে চেকপয়েন্ট তৈরি করে আরব রিক্রুট খুঁজছে। প্রত্যেক নতুন রিক্রুটকে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিনিময়ে ২০০ ডলার করে দেয়া হবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরবদের মাঝ থেকে একটা সেনাবাহিনী গঠন করতে চান, যেটি সিরিয়ায় মার্কিন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করবে। প্রতিবেদনটির পর পরই  সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের বলেন, সিরিয়ায় সেনা পাঠানোকে কেন্দ্র করে সৌদিরা মার্কিনদের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সৌদিরা বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপকে সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে। ২০১৩ সালের শেষের দিকে সৌদিদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ হাজার ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের খবর নিয়ে বেশ জল্পনা শুরু হয়। সৌদি সেনাবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যবহারকারী না হওয়ার পরও সেগুলো ক্রয়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, অস্ত্রগুলো সিরিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য কেনা হয়েছিল। তবে সিরিয়ায় কোন বিদ্রোহী গ্রুপগুলো সেই ক্ষেপণাস্ত্র পাবে, তা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তবে এর বড় অংশ ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে পড়ায় সেই অস্ত্রগুলো সরবরাহের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। এবারও সৌদিরা তাদের সেনাবাহিনীকে কোথায় ব্যবহার করবে তা মার্র্কিনরা নির্ধারণ করছে।  
২০১৪ সালে আইএসকে পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্র একটি কোয়ালিশন গঠন করে। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে মার্কিন সামরিক সহায়তা ধীরে ধীরে কুর্দি এসডিএফের দিকে যেতে থাকে। তখন পর্যন্ত সৌদিরা সহায়তা দিচ্ছিল জইস আল-ইসলাম ও আহরার আল-শাম নামের গোষ্ঠীগুলোকে। তবে রাশিয়া ও ইরান সহায়তা দেয়ার পর থেকে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে গোষ্ঠীগুলো বেশকিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়। এর বাইরে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি নামে পরিচিত বিদ্রোহী দল তুর্কি সমর্থনপুষ্ট হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তবে তুর্কিদের সমর্থন মূলত ছিল তাদের ঘোষিত সন্ত্রাসী কুর্দি গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে, যাদের মার্কিনরা সমর্থন দিয়ে আসছিল। এভাবে তুর্কিদের সঙ্গে মার্কিনদের দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। এ রকম এক অবস্থায় সৌদিরা এসডিএফের একাংশকে সরাসরি সমর্থন দেয়ার পরিকল্পনা করছে, যা সিরিয়ায় তুর্কি-সৌদি প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে।
সৌদিদের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বেশ উঁচু-নিচুর মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের রেষারেষি শুরুর পর থেকে। তুরস্ক কাতারকে সমর্থন দেয়। কাতারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে সেখানে তুরস্ক সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে চুক্তি করে। সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক অবনমনের পর পরই ২০১৭ সালের জুনে প্রথম তুর্কি সেনারা কাতারে অবতরণ করে। ডিসেম্বরে আরও সেনা যোগ দেয়। আবার তুরস্ক ইরানের সাথেও ভালো সম্পর্ক রেখে চলেছে, যা সৌদি আরব ভালোভাবে দেখেনি।
তবে সৌদিরা তুর্কিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। গত ডিসেম্বরে তুরস্কের সরকারি অস্ত্র কোম্পানি আসেলসান এবং সৌদি আরবের সরকারি অস্ত্র কোম্পানি তাকনিয়া একত্রে সৌদি ডিফেন্স ইলেকট্রনিকস কোম্পানি বা এসডিইসি নামের এক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি সামরিক গোয়েন্দা বিমানে ব্যবহারে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার, রাডার, টার্গেটিং সিস্টেম, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট, ইনফ্রারেড রিসিভার তৈরি করবে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত এএফইডি-২০১৮ সমরাস্ত্র মেলায় তুর্কি সমরাস্ত্র উৎপাদনকারীরা ছিল ‘সম্মানিত অতিথি’। সেখানে তুরস্কের সাথে সামরিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে সৌদি আরব। এপ্রিলে সৌদি আরবের পূর্বে আল-জুবাইল প্রদেশে অনুষ্ঠিত গালফ শিল্ড-১ সামরিক মহড়ায় ২৫টি দেশের মাঝে তুরস্ক ও কাতার উভয়ই ছিল। অন্যপক্ষে এপ্রিল-মে মাসে তুরস্কের ইজমিরে অনুষ্ঠিত ইএফইএস-২০১৮ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় সৌদি আরব।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, ট্রাম্প সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্যদের দ্রুত সরিয়ে আনতে তাদের লক্ষ্যকে ছোট করতে চায়। অর্থাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে টার্গেট করে বর্তমানে সিরিয়ায় যে দুই হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে, তাদের ছয় মাসের মধ্যে ট্রাম্প ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছেন। নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি সেনাদের সিরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তারা  সৌদি সামরিক বাহিনীকে ‘ট্রাম্পের নতুন সেনাবাহিনী’ বলে আখ্যা দেয়।
সিরিয়ায় সৌদি আরবের সরাসরি জড়ানোর ফলে নতুন এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ হাজির হতে যাচ্ছে। মার্কিনরা হাত গুটিয়ে নিলে সেখানে সৌদিরা সরাসরি তুর্কিদের মুখোমুখি হবে। তবে তুরস্কের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক যেমন ধোঁয়াশার মাঝে রয়েছে, তেমনি সিরিয়ায়ও তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা উঁচু-নিচুর মধ্য দিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সিরিয়ায় সৌদিদের সামরিক মিশন আপাতদৃষ্টে মার্কিন প্রক্সি হলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় নতুন করে ইয়েমেনের মতো সৌদি-ইরান প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। এ অবস্থায় তুর্কিরা কোন পক্ষ নেবে, সে সিদ্ধান্ত হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Disconnect