ফনেটিক ইউনিজয়
ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ করবে গুগল
তরিকুর রহমান সজীব
গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হামলা চালাবে মার্কিন ড্রোন
----

যাত্রার দিকে মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগলকর্মীদের আচরণবিধিতে বলা ছিল, ‘ডোন্ট বি ইভিল’, বাংলায় ‘অশুভকে না বলব’। বলতে গেলে এটাই তাদের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। প্রায় ১৫ বছর পর গুগল নিজেদের প্যারেন্ট কোম্পানি ‘অ্যালফাবেট’ তৈরির সময় আচরণবিধির শুরুতে স্থান পেল ‘ডু দ্য রাইট থিং’, বাংলায় ‘ঠিক কাজটি করব’। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসে এসে গুগলের ‘কোড অব কন্ডাক্টে’ও কথাটি স্থান পেল সবার শেষে। অশুভকে না বলার নীতি থেকে কি গুগল তবে সরে দাঁড়াল? অর্থ উপার্জনে ‘সঠিক কাজ’ বেছে নেয়াকেই সঙ্গত মনে করল গুগল?
চলতি বছরের মার্চে ফাঁস হওয়া এক নথি থেকে তেমন ইঙ্গিতই মিলছে। ওই নথি থেকে জানা যায়, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনের সঙ্গে ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ নামে একটি প্রকল্পে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে গুগল। ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওই চুক্তির আওতায় পেন্টাগনকে যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত ড্রোনের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সরবরাহ করবে গুগল। ড্রোনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব ছবি বা ভিডিও তুলবে, সেগুলো চিহ্নিত করা যাবে। ফলে ড্রোনের মাধ্যমে আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো যাবে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধাস্ত্রে নতুন প্রযুক্তির সংযোগের লক্ষ্যই হলো প্রজেক্ট ম্যাভেন।পেন্টাগনের সঙ্গে গুগলের এ চুক্তির কথা জানাজানি হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ হয়ে প্রজেক্ট ম্যাভেন থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তারা। গুগল সিইও সুন্দর পিচাই বরাবর তাদের লেখা চিঠিতে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, গুগলের যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। তাই আমরা প্রজেক্ট ম্যাভেনের চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানাই। আমরা চাই, গুগলের নীতিমালায় এটা স্পষ্ট করা হোক যে, যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গুগল চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা কখনও যুদ্ধাস্ত্রের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে না।’ তিন হাজারেরও বেশি কর্মী ওই পিটিশনে সই করেন।
গুগলের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা প্রজেক্ট ম্যাভেনের যে অংশটি নিয়ে কাজ করছে, তা ‘আক্রমণাত্মক ধরনের নয়’। যদিও পেন্টাগনের ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করেই নিয়মিত বিদ্রোহ-সন্ত্রাস দমনের অভিযানগুলো পরিচালনা করা হয়। আবার পেন্টাগন ও গুগল দাবি করছে, তারা এমন কোনো যন্ত্র তৈরি করবে না, যা মানুষের নির্দেশ ছাড়া কোনো হামলা চালাবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা ছবি বা ভিডিও আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে তা মূলত নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নিশ্চিত করতেই সহায়তা করবে এর অপারেটরকে।
এদিকে গুগলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পেন্টাগনের সঙ্গে তাদের চুক্তি ছিল মাত্র ৯ ডলারের। যদিও গুগলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সেবা বিক্রয় বিভাগের সদস্য আইলিন ব্ল্যাক নিজেই প্রজেক্ট ম্যাভেনের বিবরণে লিখেছেন, প্রথম দেড় বছরে গুগল এ প্রজেক্ট থেকে ১৫ মিলিয়ন ডলার পাবে। তবে প্রজেক্ট সম্প্রসারিত হলে বছরে এর জন্য বাজেট থাকবে আড়াইশ মিলিয়ন ডলার। প্রজেক্ট ম্যাভেনের নথি ফাঁসের এক মাস পরই এ প্রকল্পে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়ে সেটাই প্রমাণ করে পেন্টাগন।
জানা গেছে, পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু হয়েছে প্রজেক্ট ম্যাভেনের। প্রকল্পের তথ্যানুসারে, মাস ছয়েক আগেই বিমান বাহিনীর ঘাঁটি পরিদর্শন করেছে গুগল ক্লাউডের একটি দল। প্রজেক্ট ম্যাভেনের দায়িত্বে থাকা লে. জেনারেল জন শানাহানও গুগলের অ্যাডভান্সড সল্যুশন ল্যাব পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলছেন, ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা দফতর এমন কোনো ড্রোন আকাশে উড়াবে না, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিল্ট-ইন থাকবে না। তবে প্রজেক্টের টাইমলাইন থেকে জানা যায়, চলতি জুনেই পেন্টাগনের ড্রোনগুলোয় পরীক্ষামূলকভাবে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হবে।পেন্টাগনের সঙ্গে আরও বড় অংকের কাজ করতে মুখিয়ে রয়েছে গুগল। ‘জয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ ডিফেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা ‘জেডি’ নামে আরও একটি প্রকল্প রয়েছে পেন্টাগনের। ওই প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১০ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার! প্রকল্পটি পেতে মাইক্রোসফট ও অ্যামজেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে গুগল। ক্লাউডনির্ভর পেন্টাগনের এ প্রজেক্টের জন্য গুগলও ক্লাউডে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এজন্য পেন্টাগনের বেশকিছু সিকিউরিটি সার্টিফিকেশন থাকা রেড হ্যাটকে গুগল কিনে নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রজেক্ট ম্যাভেনের মাধ্যমে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের সঙ্গে গুগলের কাজের ক্ষেত্র উন্মুক্ত হলো মাত্র। এ প্রজেক্টের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে পেন্টাগনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অন্যান্য প্রজেক্টেও জড়িয়ে পড়বে গুগল। তবে কর্মীদের চাপের মুখে খানিকটা নতুন করে ভাবতে হচ্ছে গুগলকে। ৭ জুন গুগলের সিইও তাদের নিজস্ব ব্লগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নীতিমালা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই ‘মানুষের কল্যাণে’ ব্যবহৃত হয়, এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করবে গুগল। পিচাই লিখেছেন, ‘অস্ত্রে ব্যবহৃত হয়, এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমরা কাজ করব না। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখব।’
পিচাইয়ের এমন বক্তব্যেও গুগলের ভবিষ্যৎ কর্মধারা নিয়ে নির্ভার নন অনেকেই। আমেরিকান সিভিল লিবার্টি ইউনিয়নের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জেক স্নো বলছেন, গুগল সিইওর এ ঘোষণা তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারকে রোধের জন্য যথেষ্ট নয়। এ নীতিমালা তাদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বৈষম্য, নজরদারি বা যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার থেকে বিরত রাখবে না।
ডিনামাইট থেকে পারমাণবিক সক্ষমতা- সবকিছুরই উদ্ভাবন ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য। তবে এর ব্যবহার শেষ পর্যন্ত কোথায় ঠেকেছে, তা সবার জানা। প্রযুক্তির এ যুগে পেন্টাগনের হাতে ড্রোনের জন্য উন্নততর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগটাও কেমন হতে পারে, সেটা আন্দাজ করা যায় সহজে। এ পরিস্থিতিতে গুগল তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘কল্যাণমূলক’ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তথ্যসূত্র : ইন্টারসেপ্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইমস, ডিফেন্স ওয়ান, ইনডিপেনডেন্ট ও টেলিগ্রাফ

Disconnect