ফনেটিক ইউনিজয়
ইরাকের নির্বাচন
নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত
আহমেদ শরীফ
ইরাকের নির্বাচনে মুকতাদা আল-সদরের জয়
----

চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত ইরাকের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল অনেককেই বিস্মিত করেছে। ইরাকি শিয়া ধর্মীয় নেতা মুকতাদা আল-সদরের ‘সাইরুন কোয়ালিশন’ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৫৪টি আসন পেয়েছে। ইরান সমর্থিত হাদি আল-আমেরির ‘বদর কোয়ালিশন’ পেয়েছে ৪৭টি, প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদির ‘ভিক্টোরি কোয়ালিশন’ ৪২, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকির কোয়ালিশন ২৫, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াদ আলাউইর সেকুলার কোয়ালিশন ২১ ও আম্মার আল-হাকিমের শিয়া ‘হিকমা’ কোয়ালিশন পেয়েছে ১৯টি আসন। আল-সদরের কোয়ালিশনের মূল লক্ষ্যই থাকছে ইরাকের জাতীয় ঐক্যকে ধরে রাখা। কারণ ইরাকের পশ্চিমা নেতৃত্বের সাম্প্রতিক সংঘাতে জাতিগত বিভাজন দেশটাকে ভীষণভাবে বিভক্ত করেছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে পরিষ্কার। আল-সদর আঞ্চলিকভাবে একটা ‘ব্যালান্সড’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছেন। এ নীতিই বলে দিচ্ছে, আল-সদরের ইরাক শুধু ইরান নয়, অন্যান্য প্রতিবেশীকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে।
৪৪ বছর বয়সী মুকতাদা আল-সদর ইরাকের সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। বাবা ছিলেন শিয়াদের ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ সাদেক আল-সদর। তার শশুর ছিলেন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ বাকির আল-সদর। মুকতাদা নিজেও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। মুকতাদার বাবা ছিলেন শিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিদের একজন। সাদ্দাম হোসেন দুই সন্তানসহ সাদেক আল-সদরকে হত্যা করেন। মুকতাদার শ্বশুরকেও ১৯৮০ সালে ফাঁসিতে ঝোলান সাদ্দাম।
২০০৩ সালে মার্কিন সেনাবাহিনী ইরাক দখল করার পর মুকতাদা আল-সদর ‘মাহাদি আর্মি’ নামে এক সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। অল্প সময়েই এ সশস্ত্র বিদ্রোহ সমগ্র ইরাকে ছড়িয়ে পড়ে। স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ম্যাপিং মিলিট্যান্টস প্রজেক্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাকের অনেক অংশেই মাহাদি আর্মিকে আল-কায়েদার চেয়েও বেশি শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে দেখা হতো। ২০০৬ সালে সংবাদমাধ্যম নিউজউইকে আল-সদরের ছবিসহ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়; আর টাইটেল দেয়া হয় ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস ম্যান ইন ইরাক’। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের লেখায় ডেভিড গার্ডনার আল-সদরের প্রচ্ছদের ধরনকে ‘ড্রাকুলার কফিন থেকে উত্থিত হওয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে আল-সদর কতটা অপছন্দনীয় ব্যক্তি ছিলেন, তা হয়তো ওই প্রচ্ছদটিই বলে দেয়।
এর পরও আল-সদর অন্যান্য ইরাকির থেকে আলাদা। মার্কিন নীতিনির্ধারক দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর যেসব ব্যক্তির নাম শোনা গেছে, আল-সদরের নাম থাকবে তাদের সবার উপরে। তিনিই একমাত্র ইরাকি নেতা, যিনি জাতিগত বিভাজনের উপরে উঠতে পেরেছেন। ইরাকের মানুষ তাকে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবেই দেখেছে। আগ্রাসী শক্তি হিসেবে তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই টার্গেট করেননি; ইরানের আধিপত্যবাদেরও সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। ইরাকিদের মধ্যে আল-সদরের নাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন একজন নেতা হিসেবে, যিনি কারও সঙ্গে সমঝোতা করে নতি স্বীকার করেননি।
২০০৮ সালে আল-সদরের নির্দেশে মাহাদি আর্মি অস্ত্র ফেলে দেশ গঠনের কাজে মনোনিবেশ করে। এলাকার উন্নয়নকাজে তারা ব্যস্ত হয়। ওই বছরই আল-সদর ইরানে চলে যান এবং ২০১১ সালে মার্কিন সৈন্যরা ইরাক ছেড়ে গেলে তিনি ফেরত আসেন। ২০১৪ সালে আল-সদর রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বললেও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরুর পর তিনি মতামত পরিবর্তন করেন। মাহাদি আর্মির পুরনো সদস্যদের একত্র করে তিনি ‘পিস ব্রিগেড’ গঠন করেন, যার মূল কাজ ছিল ইরাকের শিয়া উপাসনালয়গুলো রক্ষা করা। ২০১৬ সালে ইরাকের হায়দার আল-আবাদি সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদ জানাতে বাগদাদের গ্রিন জোনের ভেতর তিনি তার সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করেন।
২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে মুকতাদা আল-সদর ইরাকের কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোর সঙ্গে কোয়ালিশন করেন। এতে ইরান-সমর্থিত গ্রুপগুলো অন্য পক্ষে পড়ে যায়। ইরাক দখলের পর মার্কিন সরকার ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা শুরু করে। ফলে ইরাকে ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকে। আল-সদরের এ কোয়ালিশন অসম্ভব বলেই মনে করতেন অনেকে। আবার ২০১৭ সালের জুলাইয়ে মুকতাদা সৌদি আরব সফর করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন-সালমানের সঙ্গে দেখা করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ভ্রমণ করেন। গত অক্টোবরে সৌদি আরব ও ইরাক তাদের মধ্যে বিমান পরিবহন চালু করতে সম্মত হয়। একই সঙ্গে বাগদাদে সৌদি কনসুলেট খোলার ঘোষণাও দেয়া হয়। পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা সৌদি আরবের সঙ্গে মুকতাদা আল-সদর, তথা ইরাকের সম্পর্ককে ভালোভাবে দেখেনি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব ইরাকের রাজনীতিতে জড়িয়ে ইরানের মুখোমুখি হলে মারাত্মক ভুল করবে। তারা বলছেন, মুকতাদার সঙ্গে সৌদিদের সখ্যতা ইরানকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিনিধি আলী আকবর বেলায়েতি বলেন, ইরান নরমপন্থী ও কমিউনিস্টদের ইরাক শাসন করতে দেবে না। অন্যদিকে আল-সদর ইরান সম্পর্কে বলেছেন, প্রতিবেশী ইরান তার প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। তবে আশা করা যায়, তারা ইরাকের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করবে না।
মুকতাদা আল-সদরের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হবে ইরাকের উত্তরের কুর্দি অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে আনা। সাদ্দাম হোসেন ও আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিনরা কুর্দিদের শক্তিশালী করেছে। গত সেপ্টেম্বরে কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানির ডাকে গণভোটে কুর্দিরা নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত দেয়, ইরাকি সুপ্রিম কোর্ট এটিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন। তুর্কিরাও কুর্দিদের এ ভোটাভুটি পছন্দ করেনি। কুর্দিদের বিরত করতে তুরস্ক ও ইরাকের সামরিক বাহিনী কুর্দি গণভোটের সময় ইরাকের তুর্কি সীমান্তের হাবুরে সামরিক মহড়া দেয়। কুর্দি ইস্যু ইরাককে তুরস্কের কাছাকাছি এনেছে, আবার ইরাকের অভ্যন্তরে ইরানের প্রভাব দেশটিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী করেছে। সে হিসেবে মুকতাদা আল-সদরের নির্বাচন জয় ইরাকের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করছে।

Disconnect