ফনেটিক ইউনিজয়
প্রজেক্ট ‘ফেয়ারভিউ’
সারা বিশ্বের অনলাইনে এনএসএর নজরদারি
তরিকুর রহমান সজীব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত আটটি বিশাল ভবন। এসব ভবনের একটি স্থানে লাগানো রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর এটিঅ্যান্ডটির লোগো। টের পাওয়ার উপায় নেই, এই একেকটি ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে টেলিকম ও অনলাইন যোগাযোগে নজরদারির জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র!
অবাক লাগলেও এটিঅ্যান্ডটির সম্পূর্ণ কারিগরি সহায়তা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও ভায়া হয়ে যাওয়া সব ধরনের টেলিকম ও অনলাইন যোগাযোগে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)। এতে প্রতিদিন সারা বিশ্বের মধ্যে বিনিময় হওয়া শত শত কোটি ই-মেইল, ফোন কল, অনলাইন চ্যাটিং, এমনকি ভিডিও কলও রেকর্ড হচ্ছে এনএসএর ভাণ্ডারে।
সম্প্রতি ভবনগুলোর তথ্য ফাঁস করেছে অনুসন্ধানী অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম দ্য ইন্টারসেপ্ট। এনএসএর গোপন নথি পর্যালোচনা ও এটিঅ্যান্ডটির সাবেক কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত করেছে যে, প্রতিটি ভবনই অকল্পনীয় পরিমাণ তথ্য নজরদারিতে যথেষ্ট সক্ষম। ইন্টারসেপ্ট বলছে, আটলান্টা, শিকাগো, ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক সিটি, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটল ও ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ওই ভবনগুলোয় এ নজরদারির কর্মযজ্ঞ চলছে। সহস্র কোটি তথ্য নজরদারির এ কর্মসূচির নাম এনএসএ দিয়েছে ‘ফেয়ারভিউ’।
এটিঅ্যান্ডটির কারিগরি বিভাগে কাজ করা ফিলিপ লং, ডাটা নেটওয়ার্কিং কনসালট্যান্ট থমাস সন্ডার ও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও কয়েকজন কর্মী ইন্টারসেপ্ট চিহ্নিত আটটি ভবনের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যে লং বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এটিঅ্যান্ডটির বহন করা সব তথ্য সান ফ্রান্সিসকোর এটিঅ্যান্ডটি ভবনের মাধ্যমে রাউটিং করার নির্দেশ পেয়েছিলেন। তখনই তিনি সন্দেহ করেছিলেন, মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকেই হয়তো তাদের নেটওয়ার্কের বহন করা সব তথ্যে আড়িপাতা হচ্ছে। এনএসএর নথি থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় বাহক হওয়ায় ‘ফেয়ারভিউ’ প্রকল্পের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে এটিঅ্যান্ডটি। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। অন্যান্য মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও এ কোম্পানির সম্পর্ক ভালো এবং তারাও গ্রাহকদের সেবা দিতে এটিঅ্যান্ডটির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। ফলে এটিঅ্যান্ডটির বিশাল অবকাঠামোকেই নজরদারির জন্য বেছে নিয়েছে এনএসএ।
জানা গেছে, এটিঅ্যান্ডটি গ্রাহকদেরই নয়, অন্যান্য ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদেরও বিপুল তথ্য এনএসএর হাতে তুলে দেয়া হয় এ ভবনগুলো থেকে। সেবাদাতাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক থাকলেও অনেক সময়ই সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসেবে তারা বড় কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ব্যবহার করে। একটি অপারেটরের সঙ্গে অন্য অপারেটরের এ নেটওয়ার্ক শেয়ারিংকে বলা হয় ‘পিয়ারিং’। এটিঅ্যান্ডটির বিশাল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো থাকায় মার্কিন টেলিকম জায়ান্ট স্প্রিন্ট, কোজেন্ট কমিউনিকেশনস ও লেভেল থ্রি থেকে শুরু করে সুইডেনের টেলিয়া, ভারতের টাটা কমিউনিকেশনস, ইতালির টেলিকম ইতালিয়া ও জার্মানির ডয়েচে টেলিকমের মতো বড় বড় টেলিকম জায়ান্টও এটিঅ্যান্ডটির নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় ‘পিয়ার’ হিসেবে যুক্ত।
এনএসএর নথি থেকে জানা যায়, ভবনগুলো মূলত এটিঅ্যান্ডটির ‘পিয়ার’ নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এটিঅ্যান্ডটি নিজের ও এর ‘পিয়ার’ কোম্পানিগুলোর তথ্য বাহনের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করে এ ভবনগুলোকে। এটিঅ্যান্ডটির কারিগরি বিভাগে ২২ বছর কাজ করা মার্ক ক্লেইন বলছেন, এটিঅ্যান্ডটির নেটওয়ার্ক দিয়ে ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের বিপুল পরিমাণ তথ্য এই আটটি সেন্টার থেকেই মনিটরিং করা সম্ভব। সে কারণে এ কেন্দ্রগুলোকেই এনএসএ ব্যবহার করছে ‘ফেয়ারভিউ’ প্রকল্পের জন্য।
এটিঅ্যান্ডটি বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তাদের। যেকোনো কর্মদিবসে তাদের নেটওয়ার্কে গড়ে ১৯৭ পেটাবাইট (১ পেটাবাইট = ১০০০ টেরাবাইট) তথ্য প্রবাহিত হয়। এনএসএর ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এটিঅ্যান্ডটির সহায়তায় প্রতিদিন এক দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভায়া হয়ে অন্য দেশে যাওয়া প্রায় ছয় কোটি ই-মেইল জমা পড়ে তাদের কাছে! নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফেয়ারভিউ’ প্রকল্পের আওতায় ২০০৩ সালে অনলাইনে গণনজরদারি শুরু করে এনএসএ। কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন দেশের মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কিত প্রায় ৪০ হাজার কোটি তথ্য জমা হয় এনএসএর ভাণ্ডারে। এখান থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন ‘কি ওয়ার্ড’ সংবলিত ১০ লাখেরও বেশি নির্বাচিত ই-মেইল পাঠনো হতো এনএসএর সদর দপ্তরে।
এনএসএর এমন নজরদারির কথা এর আগেই ফাঁস করেছেন আরেক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাবেক কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড স্লোডেন। ২০১৩ সালে তিনি প্রকাশ করেছিলেন ‘প্রিজম’ নামে এক নজরদারি প্রকল্পের কথা, যার আওতায় ফেসবুক, ইয়াহু, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ইউটিউব, অ্যাপলসহ বড় বড় সব প্রযুক্তি জায়ান্টকে না জানিয়েই তাদের সার্ভারে ঢুকে তথ্য হাতিয়ে নিত এনএসএ ও এফবিআই। স্লোডেনই ইন্টারসপ্টেকে আরও একটি গোপন নথি দেন, যাতে তথ্যে নজরদারিতে এনএসএর মরিয়া হয়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘সাগুয়ারো’ নামের এ প্রকল্পেও এটিঅ্যান্ডটির ওই আটটি স্থাপনাকেই তথ্য নজরদারির জন্য এনএসএ ব্যবহার করে বলে জানা যায়। এ নথি ফাঁসের জন্য স্লোডেনকে এখন রাশিয়ায় নির্বাসনে থাকতে হচ্ছে।
তবে এনএসএর মুখপাত্র ক্রিস্টোফার অগাস্টিন বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি। কিন্তু অগাস্টিন জানান, মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা দিতে তারা বাধ্য। তবে মার্কিন আইনের আওতায় থেকেই বিদেশি বিভিন্ন তথ্যে তারা গোয়েন্দাগিরি করেন। বেশির ভাগ ‘পিয়ার’ কোম্পানি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে কোজেন্ট কমিউনিকেশনসের সিইও ডেভ শেফার বলেন, নজরদারির জন্য এমন স্থাপনায় প্রবেশগম্যতা পেলে যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থাই খুশি হবে। এ নজরদারি ‘চরম উদ্বেগের’ বলেও মন্তব্য করেন শেফার।

Disconnect