ফনেটিক ইউনিজয়
প্রশান্ত মহাসাগরে চীন-মার্কিন প্রভাবের দ্বন্দ্ব বাড়ছে
আহমেদ শরীফ
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাছে মার্কিন নৌ-মহড়া
----

‘রিম অব দ্য প্যাসিফিক (রিমপ্যাক)’কে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নৌ-মহড়া। ১৯৭১ সাল  থেকে দুই বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্র এর আয়োজন করে। প্রথম মহড়াটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে হলেও বর্তমানে ২৬টি দেশের ৪৭টি যুদ্ধজাহাজ, পাঁচটি সাবমেরিন, ২০০ যুদ্ধবিমান ও ২৫ হাজার সামরিক সদস্য এতে অংশ নিচ্ছে। গত ২৭ জুন শুরু হওয়া এ মহড়া আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাছে চলবে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশের দেশগুলো ছাড়াও রয়েছে ব্রাজিল, ব্রিটেন, ভারত, ইসরায়েল, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও শ্রীলংকা। ২০১৮ সালের এ আয়োজনে বিশেষ ব্যাপারটি ঘটেছে চীনকে নিয়ে। আগে ২০১৪ ও ২০১৬ সালের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে চীনারা অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র চীনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেই আমন্ত্রণ বাতিল করে। গত মে মাসে পেন্টাগনের মুখপাত্র লে. কর্নেল ক্রিস লোগান জানান, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিকীকরণ এ এলাকার উত্তেজনা বাড়িয়েছে। চীনের এমন আচরণ রিমপ্যাকের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণেই এ মহড়ায় চীনের আমন্ত্রণ বাতিল করা হয়েছে।
গত ২৮ জুন মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ-বহরের কমান্ডার অ্যাডমিরাল জন সি একুইলিনো বলেন, মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকার সমুদ্রে শান্তি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ব্যাপারে সবাই একযোগে কাজ করা। অ্যাডমিরাল একুইলিনো চীনকে বাদ দেয়ার ব্যাপারকে ছোট করে দেখাতে গিয়ে বলেন, এবারের আসরে খুবই কম পরিবর্তন আসবে। অংশগ্রহণকারীরা যে সুবিধার আশা নিয়ে আসবে, সেগুলোই তারা এখান থেকে পাবে। তার এ কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক রাখাকে সুবিধাজনক বলে মনে করছে। তবে একুইলিনো যত সহজে চীনের অংশগ্রহণ না নেয়াকে ছোট করে দেখছেন, কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রীয় নীতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, চীনের অবস্থান সেখানে অতটা হালকা নয়।
মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব বারবার চীনের সামরিক উত্থানকে মার্কিন স্বার্থবিরোধী বলে তাদের সামরিক বাজেট বাড়াতে চাপ দিয়েছেন। ফলে ২৮ জুন মার্কিন কংগ্রেস ৩৫৯ বনাম ৪৯ ভোটে তাদের সামরিক বাজেট পাস করে। এবারের বাজেট ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৬৭৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে চীনা টেলিকম কোম্পানি ‘জেডটিই’ ও ‘হুয়াই’র কাছ থেকে সার্ভিস নেয়া থেকে পেন্টাগনকে দূরে রাখতে আইন পাস করা হয়। জেডটিইর বিরুদ্ধে কারণ হিসেবে বলা হয়, তারা উত্তর কোরিয়া ও ইরানের কাছে সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। আর হুয়াই সম্পর্কে বলা হয়, চীনা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় তা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। মার্কিন রাজ্য অ্যারিজোনার কংগ্রেসম্যান রুবেন গ্যালেগো বলেন, এ নতুন আইন চীনের হাত থেকে মার্কিন জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে রক্ষার কৌশলের ছোট পদক্ষেপ। গণমাধ্যম ‘সাউথ চায়ন মর্নিং  পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কংগ্রেসের এ ভোটাভুটি এমন সময়ে এল, যখন তাদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যুদ্ধ সত্যিকারের রূপ নিচ্ছে। মেধাস্বত্ব অমান্য ও প্রযুক্তি চুরির অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করে। টেক্সাসের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান কে গ্র্যাংগার বলেন, বৃদ্ধি করা সামরিক বাজেট ব্যবহৃত হবে রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও উগ্রপন্থীদের হুমকির বিরুদ্ধে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন শোনা যাচ্ছিল। মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার পল রায়ান নতুন সামরিক বাজেট পাস করার সময় বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের মার্কিন সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতিতে থাকা ঘাটতি অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদন দিয়ে কাটানোর চেষ্টা করা হবে। গত পাঁচ বছরে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৩৩ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। গত বছর সামরিক মিশনে যেখানে ২৪ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, সেখানে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য অপারেশনে নিহত হয়েছেন ৮০ জন। এ কারণে প্রশিক্ষণ, মেইনটেন্যান্স ও প্রস্তুতির পেছনে ২৪৬ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কংগ্রেসম্যানদের কথায় বোঝা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় শুধু চীনের বিরুদ্ধে নয়,  বৈশ্বিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিম্নমুখী। এ সময়ে রিমপ্যাক নৌ-মহড়া থেকে চীনের বাদ পড়াটা দেখিয়ে দিল যে, মার্কিন দুর্বলতার পুরোপুরি সুযোগ নেয়ার মতো সক্ষমতা চীনের এখনও হয়নি।  
মার্কিন নিয়ন্ত্রিত নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে চীন একসময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৬ সালের সেই মহড়ায় চীন ১ হাজার ২০০ নৌ-সদস্যসহ পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। তখন চীনের অংশগ্রহণকে অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও বিশ্বপরিসরে অংশগ্রহণমূলক নীতি হিসেবে দেখেছিল। মার্কিন নেতৃত্বাধীন  বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে অংশগ্রহণকে চীন খারাপ চোখে দেখেনি। অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিতে চীনের চেষ্টা থেমে থাকেনি; কিন্তু তা সাফল্য-ব্যর্থতার মাঝে ঘুরপাক খেয়েছে। মালয়েশিয়ায় নাজিব রাজাক সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্কোন্নয়ন হলেও এ বছরের নির্বাচনের পর মালয়েশিয়া সরকারের চীন নীতির সম্ভবত পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। আবার দুতার্তের ফিলিপাইন চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের দিকে এগোলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে যায়নি। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোতে চীনের সামরিক কর্মকা- ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কোন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পরিষ্কার যে, চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবকে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হলেও নিজস্ব কোনো আঞ্চলিক গ্রুপ তৈরি করতে সক্ষম হয়নি, সেটা এখনও তাদের বড় দুর্বলতা।

Disconnect