ফনেটিক ইউনিজয়
সৌদি-ইরান সম্পর্কে নতুন মোড়ের আভাস?
আহমেদ শরীফ
গত জুনে তেহরানের এক বাজারে ধর্মঘটের সময় দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়
----

৫ আগস্ট ইরানের সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, সৌদি আরব তাদের দেশে ইরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধির জন্য অফিস খুলতে দিতে রাজি হয়েছে। সেই অফিসের কাজ হবে সেখানে ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখাশোনা করা। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ইরনা জানায়, সৌদি আরব ইরানের কূটনৈতিককে ভিসা দিয়েছে। নতুন এ অফিস সৌদি আবরে সুইস কূটনৈতিক মিশনের ভেতরে স্থাপিত হবে। এ ব্যাপারে ২০১৭ সালে এক সমঝোতাও স্বাক্ষর হয়েছে। ২০১৬ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে ইতি ঘটার পর থেকে এটাই তাদের সম্পর্কোন্নয়নের বড় খবর। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরব আঞ্চলিক প্রতিযোগী হিসেবে পত্রিকার শিরোনাম কেড়েছে বহুবার। বিশেষ করে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি সরকার ও তাদের মার্কিন সমর্থকরা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের জন্য ইরানের সামরিক সহায়তার ব্যাপক সমালোচনা করেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও অন্যান্য শহরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এর পেছনে ইরানের কতটুকু হাত রয়েছে, এ দেশ দুটি সে ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করে।
ইয়েমেনের দক্ষিণে বাব-এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমুদ্রবাণিজ্য সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল নিয়ে এ প্রণালি দিয়ে ইউরোপের বন্দরে পৌঁছে। প্রণালিটিতে সমুদ্রপথ মাত্র ২০ কিলোমিটার চওড়া। সম্প্রতি প্রণালিটিতে হুথি বিদ্রোহীরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। গত ২৬ জুলাই সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজে তারা হামলা করে। সৌদি আরব বলছে, হুথি বিদ্রোহীদের এ ক্ষেপণাস্ত্র ইরান সরবরাহ করছে। ইরান বরাবরের মতোই বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এ হামলার পর সৌদিরা  বাব-এল মান্দেব দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ৪ আগস্ট সৌদি প্রেস এজেন্সির বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়,  সৌদিরা সে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে। ফলে এ পথ দিয়ে পুনরায় সৌদি জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ বলেন, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক কোয়ালিশনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে যেখানে সৌদি জোটের যুদ্ধজাহাজগুলোয় হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে সফলতা দেখিয়েছে, সেখানে তেলের জাহাজগুলোর নিরাপত্তা কতটা দেয়া সম্ভব তা প্রশ্নবিদ্ধ।   
ভূরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স তাদের বিশ্লেষণে বলছে, বাব-এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদিদের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার অর্থ হলো, তারা এখন ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলাকে আর বিপজ্জনক মনে করছে না। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপগুলো সবাইকে শুধু অবাকই করেনি, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতিরও আভাস দিচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্কোন্নয়নের খবরগুলো এমন সময়ে এল, যখন উভয় দেশের সরকারই আর্থসামাজিক চাপের মুখে রয়েছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় প্রথমবারের মতো সৌদি নাগরিকদের করের আওতায় আনা হয়েছে। তেলের বাজারে দরপতনের পর থেকে সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে আর তেলের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল রাখতে চাইছে না। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে  সৌদি যুবরাজ মুহম্মদ বিন-সালমান তার ক্ষমতাকে আরও শক্ত করতে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন। পাশাপাশি রাজপরিবারের অধীনে থাকা সম্পদের নতুন করে ভাগ-বাটোয়ারার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় বাব-এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেলের বাণিজ্য চালু রাখাটা সৌদিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে গত জানুয়ারি থেকে ইরানের রাস্তায় রাস্তায় চলছে বিক্ষোভ। ৮০টিরও বেশি শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে সহিংসতার ফলে ২৫ জন নিহত হন। চার হাজারের বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিভিন্ন শহরে চলা এ বিক্ষোভ সম্প্রতি আরও বেড়েছে। ইরানের দুর্বল অর্থনীতি, সামাজিক নিয়মকানুন, পানির জন্য হাহাকার, ধর্মীয় বাদানুবাদ ও এলাকাভিত্তিক সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে সেখানে বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব। ২ আগস্ট ইরানের আরাক, ইস্ফাহান, কারাজ ও শিরাজ শহরে বিক্ষোভ হয়। প্রতিটি বিক্ষোভেই কয়েকশ মানুষ ছিল। তারা মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়াও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, তেহরানের পশ্চিমে এশেতহার্দ শহরে একটি ধর্মীয় স্কুলে একদল লোক হামলা করে ৫০০ শিক্ষককে পালাতে বাধ্য করে। ইরানের ট্রাকচালকেরা ধর্মঘট শুরু করায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের ঘাটতি দেখা দেয়। গত মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করে। পাশাপাশি ইরানের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। এরপর ইরানের অর্থনীতির আরও অবনতি হয়। গত এক বছর আগের তুলনায় ইরানি মুদ্রার মূল্য ৮০ শতাংশ পড়ে গেছে। ইরানের মধ্যবিত্তরাই তাদের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে ভোট দিয়েছিল। এখন তারাই বলছে, রুহানির অর্থনৈতিক নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের এ বিক্ষোভ ট্রাম্প প্রশাসনকে খুশি করবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করতে ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস নতুন ভূরাজনৈতিক খেলার জন্ম দিচ্ছে। এ অঞ্চলের কোনো হিসাব-নিকাশই এখন আর পূর্বনির্ধারিত নিয়মে চলছে না।

Disconnect