ফনেটিক ইউনিজয়
আফ্রিকায় মার্কিন কমান্ডো : আট বছরে বেড়েছে ১৬ গুণ
তরিকুর রহমান সজীব
প্রতিরোধমূলক সতর্কতা থেকেই আফ্রিকার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় মার্কিন কমান্ডোরা
----

গত বছরের ৪ অক্টোবর আফ্রিকার দেশ নাইজারে ‘জঙ্গি’ হামলায় নিহত হন মার্কিন সেনাবাহিনীর চার সদস্য। এর মধ্যে গ্রিন বেরেটস হিসেবে পরিচিত মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো ইউনিটের দুই সদস্যও ছিলেন। এরপর থেকেই বলা হচ্ছে, মার্কিন সেনাদের জন্য আফ্রিকা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই এসব দেশে তাদের উপস্থিতি কমিয়ে আনতে হবে। গত জুনে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এক পর্যালোচনায়ও তিন বছরে ৫০ শতাংশ সেনাসদস্য প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলোয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি কমিয়ে আনার কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, শিগগিরই তাদের এমন ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডোর পক্ষ থেকে সরবরাহ করা উপাত্তে দেখা গেছে, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত মার্কিন কমান্ডো বাহিনীর ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ রয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোয়। এ সংখ্যা কমিয়ে আনার ঘোষণার সময় থেকে কোনোভাবেই কম নয়। বরং গত আট বছরে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৬ গুণ! জানা যায়, ২০১০ সালে এ দেশগুলোয় নিয়োজিত মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল দেশটি থেকে বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত সেনার মাত্র ৩ শতাংশ। এরও চার বছর আগে, ২০০৬ সালে সে পরিমাণটা ছিল মাত্র ১ শতাংশ।
সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়া আফ্রিকার দেশগুলোতেই এখন সবচেয়ে বেশি মার্কিন কমান্ডো নিয়োজিত রয়েছে। ২০০৬ সালে আফ্রিকাজুড়ে মার্কিন বিশেষ কমান্ডো ছিল মাত্র ৭০ জন। চার বছর আগেও তাদের সংখ্যা ছিল ৭০০। অথচ স্পেশাল অপারেশন কমান্ডোর মুখপাত্র কেন ম্যাকগ্রার দেয়া তথ্যানুযায়ী, আফ্রিকাজুড়ে এখন বিশেষ কমান্ডো নিয়োজিত ১ হাজার ৩০০-এরও বেশি, যা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
পেন্টাগনের মুখপাত্র মেজর শেরিল ক্লিনকেলের তথ্যানুযায়ী, পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা নিয়োজিত। আবার গত বছরের শুরুতে সোমালিয়ায় বিশেষ কমান্ডো বাহিনীসহ সেনাসদস্যের উপস্থিতি ছিল মাত্র ১০০ জন। অথচ এখনকার তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে মার্কিন সেনা কাজ করছেন ৫০০ জন। অর্থাৎ পেন্টাগনের পক্ষ থেকে আফ্রিকায় সেনা উপস্থিতি কমানোর কথা বলা হলেও কার্যত এর কোনো প্রতিফলনই দৃশ্যমান নয়।
এদিকে গত মে মাসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রবার্ট এসকারেম বলেন, বিশেষ কমান্ডোরা সেখানে নিয়োজিত থাকলেও তাদের সম্মুখসমরে অংশ নেয়ার অভিপ্রায়ে রাখা হয়নি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন নীতি, নাইজারে কমান্ডো সদস্যদের মৃত্যু ও আফ্রিকায় মার্র্কিন সেনাদের বিশেষ অভিযান কমিয়ে আনার কথা বললেও সেখানে কমান্ডো বাহিনীকে প্রায়ই সম্মুখসমরের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে নাইজারের স্থানীয় বাহিনী ও তাদের সহযোগী গ্রিন বেরেটের একটি দলের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আইএসের ১১ জঙ্গি নিহত হয়। আবার গত মাসেও সোমালিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী শাবাবের সঙ্গে সংঘর্ষে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর স্টাফ সার্জেন্ট আলেক্সান্ডার কনরাড নিহত হন। এর আগে গত বছরের মে মাসেও জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে সোমালিয়ায় নেভি সিল টিমের সিনিয়র চিফ পেটি অফিসার কাইল মিলিকেন নিহত হয়েছিলেন। এ বছরের মার্চে নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর ১০টি হামলার ঘটনা তুলে ধরে, যেগুলোর কথা আগে জানা যায়নি। আবার মার্কিন রাজনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানাচ্ছে, ক্লাসিফায়েড প্রোগ্রামের আওতায় ক্যামেরুন, কেনিয়া, লিবিয়া, মালি, মৌরতানিয়া, নাইজার, সোমালিয়া ও তিউনিশিয়ার মতো দেশগুলোয় পাঁচ বছর ধরেই সম্মুখসমর চালিয়ে আসছে বিশেষ মার্কিন কমান্ডো বাহিনী।
ফলে পেন্টাগন আফ্রিকা অঞ্চল নিয়ে তাদের যে ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্তের কথা বলে আসছে, তা মূলত ভিত্তিহীন। বরং বাস্তবতা হলো, ২০১৪ সালের তুলনায় এখন আফ্রিকার দেশগুলোয় মার্কিন সেনার উপস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ।

মার্কিন সৈন্য কেন আফ্রিকায়?
নাইজারে চার মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, ‘তারা (নিহতরা) আমেরিকাকে রক্ষা করতে নিয়োজিত ছিল। তারা আমেরিকা ও আমাদের মিত্রদের ওপর হামলার প্ল্যাটফর্ম ঠেকাতে কাজ করছিল।’ কিন্তু প্রকৃত অর্থে মার্কিন সৈন্যরা আফ্রিকায় কী করছে?
আফ্রিকার দেশগুলোয় মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতির শুরু মূলত নাইন-ইলেভেনের পর থেকে। ওই সময় মার্কিনরা ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যে অভিযান শুরু করে, তারই অংশ হিসেবে আফ্রিকায়ও ঘাঁটি গাড়ে তারা। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী হামলার হুমকি না থাকলেও ‘প্রতিরোধমূলক’ সতর্কতা থেকেই আফ্রিকায় হাজির হয় সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে।
মার্কিনদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আল-কায়েদার মতো ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের বিস্তৃতির অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে আফ্রিকার দেশগুলো। তাদের ‘ঠেকাতে’ আগেভাগেই শক্তিশালী করে তুলতে হবে এসব দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এমন ‘প্রতিরোধমূলক’ ব্যবস্থার নাকের ডগাতেই আল-কায়েদা ও পরবর্তী সময়ে আইএস, বোকো হারাম, আল-শাবাবের মতো সংগঠনগুলো বেড়ে উঠেছে সেখানে!
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত জুনে তিনি কংগ্রেসে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, আফ্রিকা অঞ্চলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আফ্রিকান অংশীদারদের বহুমুখী সমর্থন ‘অব্যাহত রাখতে হবে’। এদিকে নাইজারের আগাদেজ শহরে ড্রোন সার্ভেইল্যান্সের জন্য ১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঘাঁটি স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলেছে। ফলে পেন্টাগন যতই বার্তা দিক, ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের অংশ হিসেবে আফ্রিকায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমছে, এমন ভাবনা বাতুলতা মাত্র।
সূত্র : ইন্টারসেপ্ট, নিউইয়র্ক টাইমস পলিটিকো ও আটলান্টিক

Disconnect