ফনেটিক ইউনিজয়
শরণার্থী ইস্যুতে জার্মানিতে নব্য নাৎসিদের ক্ষমতা প্রদর্শন
তরিকুর রহমান সজীব
জার্মানিতে এক জার্মান-কিউবান নিহতের পর উগ্র ডানপন্থীদের বিক্ষোভ
----

ঘটনাস্থল পূর্ব জার্মানি, স্যাক্সন প্রদেশের চিমনিজ শহর। ইরাকি ও সিরীয় দুই তরুণের মারামারির মধ্যে পড়ে এক জার্মান-কিউবান গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থান প্রাণ হারান। এর পরই শুরু হয় উগ্র ডানপন্থীদের বিক্ষোভ। জার্মানির বৃহত্তম বিরোধী দল উগ্র ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ছাড়াও ক্যাওটিক চিমনিজ, প্রো চিমনিজ, থার্ড ওয়ে, ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট অব চিমনিজ ও এনপিডির মতো কট্টর ডানপন্থী ও নব্য নাৎসি হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন মাঠে নামে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ বা শ্যাম বর্ণের মানুষদের তাড়া করে ফিরছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা। এ সময় অনেককে নাৎসি স্যালুট দিতেও দেখা গেছে। ‘ফ্রি, সোস্যাল অ্যান্ড ন্যাশনাল : ন্যাশনাল সোস্যালিজম নাউ’, ‘অ্যাডলফ হিটলার হুলিগান’- নব্য নাৎসিদের এমন স্লোগানও ফিরেছে বিক্ষোভে অংশ নেয়া কট্টরপন্থীদের মুখে মুখে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ আদৌ এসব বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তরিক ছিল কিনা! এরই মধ্যে অবশ্য বর্ণবাদবিরোধী কনসার্টও সাড়া ফেলেছে।
এ ঘটনাকে মূলত নব্য নাৎসিসহ উগ্র ডানপন্থীদের ক্ষমতা প্রদর্শন হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতিতে পুরনো প্রশ্নই ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে- শরণার্থী বা বিদেশিদের মেনে নেয়ার মতো সহিষ্ণুতা কি জার্মানদের রয়েছে? বিশেষ করে ডানপন্থীদের যে উত্থান জার্মানিতে, তাতে সেখানে কি স্থান হবে শরণার্থীদের?
চিমনিজের ঘটনাটিই এসব প্রশ্নের একমাত্র কারণ নয়। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এ বছর শরণার্থী বা অভিবাসীদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে জার্মানিতে। শুরু থেকেই শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ডান ও উগ্র ডানপন্থী দলগুলো। কয়েক বছর ধরেই শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিরূপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে দেশটিতে। এমন ঘটনার নজির রয়েছে তিন দশক আগেও।
১৯৯১ সালে তখনও দুই জার্মানির একত্র হওয়ার এক বছর পূরণ হয়নি। ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ শরণার্থী আশ্রয় নেয় জার্মানিতে। শরণার্থী বা বিদেশিরা কর্মসংস্থান ও বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছে, সরকারি ভর্তুকিতেও ভাগ বসাচ্ছে- এমন অভিযোগে সে সময় পূর্ব জার্মানির প্রায় ২০টি শহরে শরণার্থীদের ওপর হামলা করে উগ্র ডানপন্থী জার্মানরা। টানা কয়েক দিনের হামলার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় শতাধিক জার্মান নাগরিককে। জার্মান রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয় এ শরণার্থীবিরোধী বিক্ষোভ। ওই সময় শরণার্থীদের স্বাগত জানানো উদারপন্থী দলগুলোর জনসমর্থন কমতে থাকে।
একই পরিস্থিতি বর্তমানেও। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা শুরু হলে ইরাক-সিরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে প্রচুর শরণার্থী পাড়ি জমায় ইউরোপে। এর বড় একটি অংশেরই স্থান হয় জার্মানিতে। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত মেরকেল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই স্বাগত জানিয়ে আসছে শরণার্থীদের। তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও মেরকেলের জোট ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের সমর্থন কমেছে; বিপরীতে এএফডির মতো দলের সমর্থন দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশেরও বেশি! রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্যান্য ইস্যুর পাশাপাশি শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর নীতি মেরকেলের জনপ্রিয়তা কমাতে ও এএফডির জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে নব্য নাৎসি হিসেবে পরিচিত সংগঠনগুলোর সমর্থনও বেড়েছে!
বর্তমান পরিস্থিতিতে শরণার্থী বা বিদেশিদের নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে জার্মানির ডানপন্থীরা। কিন্তু সরকার তাদের স্বাগত জানানোয় নিজেরাই তাদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এএফডির একজন সংসদ সদস্য মারকাস ফ্রনমেয়ার এক টুইট বার্তায় বলেন, “রাষ্ট্র নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে জনগণই রাস্তায় নামবে এবং নিরাপত্তা দেবে। ‘ছুরি-চাকু শরণার্থী’দের আগমন বন্ধ করার নাগরিক কর্তব্য পালনের সময় এখনই। তাদের হাতে পরের শিকার আপনারই বাবা, ছেলে বা ভাই।” তার ওই টুইটকে সমর্থন দিয়েছেন দলের কো-চেয়ারম্যান আলেক্সান্ডার গল্যান্ডও।
শরণার্থীদের নিয়ে জার্মানদের এ আতঙ্ক বা বিদ্বেষ সাবেক পূর্ব জার্মানিতেই বেশি। তিন দশক আগে এ অঞ্চলের মানুষের বিদেশিদের নিয়ে যে মনোভাব ছিল, তার পরিবর্তন হয়নি এখনও। সে কারণেই ২০১৬ সালে জার্মান দৈনিক ডাই ওয়েলট তাদের প্রথম পাতায়ই লিখেছিল, অন্তর্ভুক্তিমূলক জার্মান সংস্কৃতিতে অভিবাসীরা নয়, স্যাক্সনের অধিবাসীরাই সমস্যা।
মূলত জার্মানির পূর্বাঞ্চলের এ সংকটের মূল অনেক গভীরে প্রোথিত। অঞ্চলটি মূল জার্মানির অংশ হয়েছে অনেক পরে। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি ছিল স্লাভ নামে নৃতাত্তিক জাতিগোষ্ঠীর দখলে। প্রায় ৮০০ বছর ধরে জার্মান ও স্লাভদের মধ্যে এ ভূখ- নিয়ে ছিল বিরোধ। পরে প্রুশিয়া রাষ্ট্রের অধীনে প্রথমবারের মতো এক হয় পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি। কালে কালে জার্মান ফেডারেশন, ডয়েচে রেইখ পেরিয়ে নাৎসিদের হাতে সমাপ্তি ঘটে প্রুশিয়ার। কিন্তু পূর্ব জার্মানির সঙ্গে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মিলন আর ঘটেনি। তারই ফল দেখা যায় ১৯৯১ সালে। ফের তা ফিরে আসে ২০১৮ সালেও। ‘শর্টেস্ট হিস্ট্রি অব জার্মানি’র লেখক জেমস হাওয়েস তাই বলেছেন, ‘পূর্ব জার্মানির রাজনীতি ফের গোটা জার্মানিকে নাড়িয়ে দেয়ার আগেই পশ্চিমকে সতর্ক হতে হবে এবং সব শক্তি দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে, চিমনিজের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।’
ক্ষমতাসীন মেরকেলের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের নেতা ও জার্মানির পূর্বাঞ্চলবিষয়ক কমিশনার ক্রিশ্চিয়ান হার্তে চিমনিজের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশে বলেছেন, ‘স্যাক্সনের ভালো মানুষের জন্য সমর্থন প্রয়োজন।’ ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক শিক্ষক ও লেখক জর্ডান স্ট্যানসিলও বলেন, ‘স্যাক্সনিসহ পূর্ব জার্মানিতে নব্য নাৎসিদের শেকড় নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে সেখানকার ভালো মানুষের কথাই আগে ভাবতে হবে। এখন তাদেরই সময় সামনে এগিয়ে আসার।’
সূত্র : গার্ডিয়ান, দ্য ন্যাশন, নিউইয়র্ক টাইমস ইন্টারসেপ্ট ও বিবিসি

Disconnect