ফনেটিক ইউনিজয়
সমকামী রুলিং : ভারত এগোল না পেছাল?
আহমেদ শরীফ
রায় শোনার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে শত শত সমকামী
----

৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে সমকামিতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয় বলে ঘোষণা দেন। ১৮৬১ সাল থেকে ভারতের পেনাল কোডের অংশ হিসেবে ‘সেকশন ৩৭৭’-এ ছিল, ‘অস্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক’তে জড়ালে ১০ বছরের কারাদ- হতে পারে। দেশটির প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ছিলেন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চের প্রধান। তিনি রুলিং দেয়ার সময় বলেন, ব্যক্তিকে যৌনতার ভিত্তিতে আলাদা করে দেখা হলে তা ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে। তিনি বলেন, সমাজের বিবেকের মাপকাঠিকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার হতে দেয়া যায় না। সমাজের মাপকাঠির কাছে সাংবিধানিক মাপকাঠির মৃত্যু হতে দেয়া যায় না।
নয়াদিল্লিতে শত শত সমকামী এ রায় শোনার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে। সমকামীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত এক পিটিশনার অশোক রাও কাভি সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এ রায়ে ‘সেকশন-৩৭৭’ বাতিলের সঙ্গে সমকামীরা সমধিকারের নাগরিক হলো। ‘দ্য নিউইয়র্ক’-এ বলা হয়, ভারতের অনেকেই বিশ্বাস করে, তাদের সনাতনী ধর্মে দেব-দেবীদের যৌনাচারের পরিচিতিতে সমকামিতাবিরোধী কিছু নেই, বরং সেখানে অন্যান্য ধর্মের আমদানিতেই এটি হারিয়ে গিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা ভারতে ইসলামের আবির্ভাবকেই বুঝিয়েছেন।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এ রায়ের ব্যাপারে চুপ থাকার নীতিতে রয়েছে। সরকার বলছে, তারা এ সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাকেই মানবে। অথচ ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপির রাজনীতিবিদ রাজনাথ সিং বলেছিলেন, সমকামিতা একটা অস্বাভাবিক কাজ, যা সমর্থনযোগ্য নয়। সেই রাজনাথই এখন এ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতে এ রায়ের কারণে এশিয়ার বাকি দেশগুলোর সমকামীরাও শক্তি পাচ্ছে। জেনেভায় অবস্থিত সমকামীদের একটি সংগঠনের মুখপাত্র লিউ এন ভু বলেন, এ সিদ্ধান্ত ভারতকে বিশ্বের কাছে আরও বড় করবে। পাশাপাশি তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোও এ ব্যাপারে লক্ষ রাখবে। তিনি বলেন, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সমকামীরাও নিজেদের দেশে সমকামিতাবিরোধী আইন বাতিলের চেষ্টা করছে। ভারতে এ রায়ের ফলে ওইসব দেশে এ ব্যাপারে কথা বলা বাড়বে। চীন ১৯৯৭ সালে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করে। সমকামিতা নিয়ে আন্দোলনরতরা বলছে, তারা এটিকে ধীরে ধীরে সমাজের চোখে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় রয়েছেন।
ভারতের রক্ষণশীল সমাজ রায়টিকে কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে। দেশটিতে সমকামীদের অধিকার রক্ষায় আইন হলেও সেখানে বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষের অধিকারচর্চায় বাধা দানের ব্যাপারগুলো বিশ্বমিডিয়ায় যথেষ্ট প্রচার পেয়েছে। সমকামিতার রুলিংয়ের পর ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’-এর প্রেসিডেন্ট ফারুক আব্দুল্লাহ বলেন, কোনো মুসলিম কখনও কোনো হিন্দু বা খ্রিস্টানকে ধর্ম পালনের পদ্ধতি বা খাদ্যাভ্যাসের ধরন কেমন হবে তা বলেনি; ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাওয়াও বন্ধ করতে বলেনি। কিন্তু যখন মুসলিমদের তাদের উপাসনার ধরনকে পরিবর্তন করতে বা আজান দেয়া বন্ধ করতে বলা হচ্ছে, এতে বোঝা যায়, তারা গান্ধীর ভারতকে পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। তিনি ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী ধর্মীয় উপাসনার অধিকার দাবি করেন। কাশ্মীরের মুসলিম হিসেবে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে রাজনীতি করা আব্দুল্লাহর কথাগুলো সেখানকার মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বের প্রতীক। এক্ষেত্রে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকারই রক্ষিত হচ্ছে না। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তার মুসলিম নাগরিকদের অধিকার কতটুকু রক্ষা করছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
শুধু মুসলিমরাই নয়, ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও বিভিন্ন সময় ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নিম্নবর্ণের দলিত সম্প্রদায় অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হলেও সেটাকে অবদমিত করার চেষ্টা চলছে বলেই অভিযোগ অনেকের। সমকামী রায়ের দুদিন আগে মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ ভারতীয় মিডিয়ায় দলিত সম্প্রদায়কে কিরূপে দেখানো হবে, সে ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে। দেশটির সরকার তাদের সংবাদমাধ্যমগুলোকে উপদেশ দেয়, তারা যেন ‘দলিত’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘শিডিউলড কাস্ট’ ব্যবহার করে। অ্যামনেস্টি বলছে, ‘দলিত’ শব্দকে অবদমিত করে শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে তাদের অধিকার আদায়কে ছোট করার চেষ্টা চলছে। সংস্থাটির অনুষ্ঠান পরিচালক আসমিতা বসু বলেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে ‘দলিত’ শব্দটিকে তুলে ধরা হয়েছে শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে। শব্দটির মধ্য দিয়ে ভারতের শ্রেণিবৈষম্যের লম্বা ইতিহাস প্রকাশ পায়। বসু আরও বলেন, দলিতরা নিজেদের কী বলে পরিচয় দেবে, সেটা ভারত সরকার কেন বলে দেবে?
 ভারতের বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশ নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সেসব জাতির বিরোধ রয়েছে। ভারতের দক্ষিণের তামিলনাড়– রাজ্যের ঐতিহাসিক ‘জাল্লিকাট্টু’ উৎসব রাজ্য সরকার দমন করতে চাইলেও সেখানকার জনগণের মাঝে উৎসবটি জীবিত রয়েছে। সমকামী রুলিংয়ের তিনদিন আগে চেন্নাইয়ের মারিনা বিচ এলাকায় জাল্লিকাট্টু উৎসবপন্থীদের এক বিক্ষোভ সমাবেশকে চেন্নাইয়ের উচ্চ আদালত বন্ধ করার নির্দেশ দেন। অথচ ২৮ এপ্রিল একজন বিচারক এ সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। বিচারক রায়ে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সময়ে এ বিক্ষোভকে বন্ধ ঘোষণা করলে মহাত্মা গান্ধী ও তিলাকর এ বিক্ষোভে যোগ দিতেন।
ভারতীয় বিচার ব্যাবস্থায় সমকামীদের ব্যাপারে রুলিং বারবার পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৯ সালে দিল্লির হাইকোর্টের দেয়া রুল সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে ২০১৩ সালে। ২০১৮ সালে এসে এ কোর্টই আবার রায় পরিবর্তন করলেন। কিন্তু যেখানে মুসলিম-দলিতসহ বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষের অধিকার অপ্রতিষ্ঠিত, সেখানে সমকামীদের সমর্থন করে পশ্চিমা বিশ্বের চোখে অগ্রগামী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়ে ভারত কতটুকু লাভবান হবে, এখন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।

Disconnect