ফনেটিক ইউনিজয়
যুদ্ধাপরাধ ঢাকতে
আইসিসি’র বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধ’
স্বর্ণা চৌধুরী

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কখনোই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে এ সম্পর্কের তারতম্যও লক্ষণীয়। ১২৪টি দেশ আইসিসি’র অংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেনি। এ তালিকায় আরও রয়েছে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, কাতার ও ইসরায়েল। আইসিসি’র সৃষ্টিই হয়েছে যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য। আর এ কারণেই তাদের কর্মকা- ভালো চোখে দেখে না বিশ্বের এক নম্বর সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসি’র বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। যার মূল লক্ষ্য আফগানিস্তানে সংঘটিত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ এবং ২০১৪ সালে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত বন্ধ করে দেয়া। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ফেডারেলিস্ট সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন আইসিসিকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করে সংস্থাটিকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আইসিসিকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করব না। আমরা আইসিসিতে যুক্ত হবো না। আমরা আইসিসিকে নিজ থেকেই মরে যেতে ছেড়ে দেবো। সব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সহকারে আইসিসি ইতিমধ্যেই আমাদের কাছে মৃত।’
এখানেই শেষ নয়। বোল্টন আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো কর্মকাণ্ডের তদন্ত করতে চাইলে মার্কিন প্রশাসন আইসিসি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এমনকি আইসিসি’র তদন্ত কর্মকর্তাদের মার্কিন আদালতে বিচার করার হুমকিও তিনি দিয়েছেন। বোল্টন আইসিসির তদন্তকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি’ বলেও দাবি করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে আইসিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধ চালিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে তালেবান ও আফগান বাহিনীর বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষের ওপর বৃহৎ পরিসরে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ উঠে আসে।
প্রতিবেদনে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোর প্রথমদিকে তাদের গড়ে তোলে বন্দীশালায় যুদ্ধাপরাধের বেশ কয়েকটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদনে অভিযুক্ত বা আক্রান্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে সংঘটিত ওই যুদ্ধাপরাধে মার্কিন সেনাবাহিনী ও দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন, যারা সাধারণ আফগানদের আটক করে ওই বন্দীশালাগুলোতে অমানবিক আচরণ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।  
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ওই অপরাধগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবিশেষের কাজ নয়। বরং খুব সহজেই এ বিষয়টি বোঝা যায় যে, অপরাধগুলো আফফানিস্তানে মার্কিন স্বার্থে পরিচালিত নীতিরই অংশ। যেখানে জিজ্ঞাসাবাদের নামে সহিংস, অমানবিক প্রক্রিয়া জারি থাকে।’  
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই আইসিসি’র অভিযোগ খারিজ করে তার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানিয়ে আসছে। নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টনের বক্তব্যে তারা এ বার্তাই দিতে চাইছে যে, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার প্রশ্নে সব আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে। এমনকি তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করার এখতিয়ারও কারো নেই!
আইসিসি’র ওই প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে যে সময়ের যুদ্ধাপরাধের চিত্র উঠে এসেছে, তখন বোল্টন ছিলেন জাতিসংঘে জর্জ বুশ প্রশাসনের দূত। আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর বেশ কয়েক বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ওইসব দেশে তার বন্দিনীতি নিয়ে সমালোচিত হতে থাকে। আবু গারিব কারাগারে বন্দিদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষ আর তা ঢেকে রাখতে পারেনি। একইভাবে বন্দিদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয় আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটিতে, যেখানে নির্যাতন করে বন্দিদের মেরে ফেলার ঘটনাও সামনে এসেছে।
নির্যাতনের এসব ঘটনায় সিআইএ’র সঙ্গে বেসামরিক লোকজনও জড়িত। সিআইএ’র বেসামরিক ঠিকাদার ডেভিড পাসারো আফগানিস্তানের একটি বন্দিশালায় আবদুল ওয়ালী নামের এক আফগান বন্দিকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেন। মার্কিন আদালত পাসারোকে সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে এটিকে আদালত ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই মূল্যায়ন করেছেন, সংঘবদ্ধ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নয়। এখনো পর্যন্ত পাসারোই একমাত্র বেসামরিক লোক, যাকে সিআইএ’র বন্দি প্রকল্পে অপরাধের জন্য সাজা পেতে হলো। ২০১৪ সালে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সিআইএ কর্মকর্তাদের নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরা হয়।   
মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করতে দেশটির বিচারিক আদালতের অনিচ্ছা ও অক্ষমতার জন্যই আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ন্যূনতম পর্যায়ে দায়বদ্ধতার নিশ্চিত করতে আইসিসি’র উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত নভেম্বরে আইসিসি জানিয়েছে, তারা ২০১৬ সালের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে অধিকতর তদন্ত শুরু করবে।
মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টনের হুমকির বিপরীতে এক বিবৃতিতে আইসিসি জানিয়েছে, ‘একটি বিচারিক আদালত হিসেবে নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইসিসি তার কাজ অব্যাহত রাখবে।’
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইসিসি’র বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক এ আদালত মনে করে না যে, অপেক্ষাকৃত কম মারমুখো কোনো মার্কিন প্রশাসনও তাদের তদন্তে সহযোগিতা করবে। তবে যুদ্ধাপরাধের তদন্তে নিয়োজিত আইসিসি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধকে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোয় মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ভঙ্গের বিষয়টি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) পরিচালক জামিল দাকওয়ার গত ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীনধারার সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাসি নাউ-কে বলেন, ‘আইসিসি মার্কিন সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে এ বিষয়টি সামনে আনেনি, যেমনটা বোল্টন দেখাতে চেয়েছেন। বরং তারা এজন্যই বিষয়টি সামনে এনেছেন, কারণ আমরা- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইনের শাসন ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি।’
উল্লেখ্য, ২০০২ সালের ১ জুলাই ৬০ দেশের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে রোম শহরে যাত্রা শুরু করে আইসিসি। কার্যত এটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে এক চুক্তি, যার আওতায় স্বাধীনভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করা হয়। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটির সদর দফতর নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত।

Disconnect