ফনেটিক ইউনিজয়
চীন-মার্কিন বৈরিতা কোন পথে এগুচ্ছে?
আহমেদ শরীফ
করমর্দনরত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (বামে) ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে)
----

২১ সেপ্টেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং চীনের উপরে নতুন মার্কিন সামরিক নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার ভুল শুধরে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া। নাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে এর কঠিন ফলাফল ভোগ করতে হবে। এর আগের দিন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার অভিযোগে চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ইক্যুইপমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন এবং এর পরিচালকের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, চীনা ঐ সংস্থা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাস হওয়া কাউন্টারিং আমেরিকাস এডভার্সারিস থ্রু স্যাংশনস এক্ট বা কাটসা নামের আইন ভঙ্গ করেছে বলেই এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ, ইউক্রেনে আগ্রাসন এবং মার্কিন স্বার্থের উপরে সাইবার হামলার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে আইন পাস করেছিল। তবে ওই আইনকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা না বাড়ানোর জন্যে কংগ্রেসের উভয় দলই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর। এখন ট্রাম্প প্রশাসন এ আইন চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইছে। উপরোক্ত চীনা সামরিক সংস্থার কাজ ছিল অন্য দেশ থেকে অস্ত্র কেনা। এ কাজের অধীনে এই সংস্থাটি রাশিয়া থেকে সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয় যে, এটা রাশিয়াকে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে, কারণ রাশিয়ার অর্থনীতি এখন অস্ত্র রপ্তানির উপর বেশ নির্ভরশীল।  
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা যেন বেড়েই চলেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর চীন হংকং-এ মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ওয়াসপ-এর নির্ধারিত সফর বাতিল করেছে। এটি অক্টোবরে হওয়ার কথা ছিল। একই সময়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র লে. কর্নেল ডেইভ ইস্টবার্ন বলেন যে, মার্কিনিদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ চীনা নৌ-কর্মকর্তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে চীনা কর্মকর্তাদের বেইংজিংয়ে ফেরত যেতে বলা হয়েছে। আবার একইদিনে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ঘোষণায় বিরক্তি প্রকাশ করে। ২৬ সেপ্টেম্বর এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, চীনারা আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চাইছে। এর জবাবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক ভাষণে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই বলেন যে, চীন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্থক্ষেপ করে না এবং করবেও না।
এদিকে ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ডেকাটুর দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা অধিকৃত গ্যাভেন এবং জনসন রিফের ১২ নটিক্যাল মাইলের মাঝ দিয়ে ঘুরে আসে। মার্কিনিরা বলছে যে, এটা তাদের নিয়মিত ফ্রিডম অব নেভিগেশন অপারেশন-এর অংশ। মার্কিনিরা এর আগে এ ধরনের অভিযান চালিয়েছিল গত মে মাসে। তবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের এই অভিযানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না। ২৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন বিমান বাহিনীর দু’টি বি-৫২ বোমারু বিমান প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুয়াম থেকে উড়ে দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরের উপর দিয়ে উড্ডয়ন করে এবং মহড়া চালায়। পরদিন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিস সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন যে, এ রকম যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন বিশেষ কিছু নয়। আর যুক্তরাষ্ট্র এ মুহূর্তে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এবং অন্যান্য বিষয়ে উত্তেজনার সময় পার করছে। তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার মূলনীতি থেকে দূরে সরে না এলেও, উভয় দেশকে চিন্তা করতে হবে- কি করে এ বিভেদের মীমাংসা করা যায়।   
বার্তাসংস্থা ব্লুমবার্গের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হংকং ব্যাপটিস্ট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জঁ পিয়েরে কাবেস্তান বলেন যে, চীনের উপরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে শি জিন পিংসহ কট্টরপন্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হবে, কারণ এতে প্রমাণ করা সহজ হবে যে, ট্রাম্প সরকারের মূল লক্ষ্য হলো চীনের উত্থানকে ঠেকানো। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে হয়তো বিভিন্ন কর্মকা-কে বেছে নেবে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য-যুদ্ধ যাতে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ করা যায়, সেই পথ বেইজিং খোলা রাখতে চাইবে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের পিছনে রয়েছে রপ্তানিমুখী অর্থনীতি, যার সবচাইতে বড় বাণিজ্য-সহযোগী হলো যুক্তরাষ্ট্র। আবার প্রযুক্তির দিক থেকে যেসব ক্ষেত্রে চীন এখনও উৎকর্ষতা অর্জন করতে পারেনি, সেগুলিতে চীনের রাশিয়ার উপরে নির্ভরশীলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীনের জন্যে প্রযুক্তির সেই দরজাটা বন্ধ করে দেয়া। এছাড়াও রাশিয়া-চীনের সামরিক কৌশলগত কোনো অংশীদারিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।   
ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর হবার কথা বলেছিলেন। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আগে চীনের সঙ্গে এহেন মনোমালিন্যের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রমাণ করতে চাইবেন যে, তার নীতি থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। ট্রাম্পের চীন-বিরোধিতা তার ভোট-ব্যাংককে খুশি করবে বলেই তিনি মনে করছেন। তবে মার্কিন চিন্তাবিদেরা একমত যে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হবার সম্ভাবনা নেই। কারণ মার্কিনীরা চীনা আমদানির উপরে যারপরনাই নির্ভরশীল। আর এ মুহূর্তে চীন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্বল্পমূল্যের পণ্যের আর কোনো বিকল্প সরবরাহক নেই। প্রতিরক্ষা সচিব ম্যাটিসের কথাতেই বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো বিবাদে না জড়িয়ে বরং আলোচনার পথকেই বেছে নেয়ার চিন্তায় রয়েছে। তবে আপাতত মার্কিন নির্বাচনের আগে আগে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে যেমন বাড়াতে পারে, তেমনি বেইজিংয়ে শি জিনপিং-এর হাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রকে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশ সাম্প্রতিক সময়ে চ্যালেঞ্জ করে সুপারপাওয়ারের ক্ষমতার ক্ষয়িষ্ণুতাকে তুলে ধরলেও যুক্তরাষ্ট্র যে এখনও তার সুপারপাওয়ারের আসনচ্যুত হয়নি, তা পরিষ্কার। চীনের উপরে সামরিক নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এহেন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। কিন্তু চীনের এ বক্তব্য বলে দেয় যে, মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা একটা আইন বিশ্বরাজনীতিতে আজও কতটা গুরুত্ব বহন করে।

Disconnect