ফনেটিক ইউনিজয়
রুশ-ভারত অস্ত্র চুক্তি কীভাবে দেখবে যুক্তরাষ্ট্র?
আহমেদ শরীফ
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন (বামে) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (ডানে)
----

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এবারের ভারত সফর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এবারের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল রাশিয়া থেকে ভারতের প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অত্যাধুনিক এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের চুক্তি। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার কারণে বিভিন্ন দেশের উপর মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের হুমকির মুখে রুশ-ভারতের এ সামরিক চুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।   
গত ৫ অক্টোবর রুশ-ভারত সামরিক চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম মতামত প্রকাশ করে। বলা হয়, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রদের সামরিক সক্ষমতার ক্ষতি করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো-রাশিয়াকে ‘খারাপ আচরণের’ জন্য অর্থনৈতিকভাবে শাস্তি দেয়া। তবে দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র সরাসরি ভারতের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাটা এড়িয়ে যান। গত বছর মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া কাউন্টারিং আমেরিকাস এডভার্সারিস থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট বা কাটসা আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার অস্ত্র বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা জানায়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার সর্বক্ষেত্রে এ আইনের প্রয়োগ না করায় কংগ্রেসের উভয় দলই ট্রাম্পের সমালোচনা করে। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ইউক্রেনে আগ্রাসন এবং মার্কিন স্বার্থের উপরে সাইবার হামলার কারণ দেখিয়ে মার্কিন কংগ্রেস আইনটি পাস করেছিল। তবে মার্কিন সরকার বলছে, কাটসা আইন ব্যতিক্রম হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত এক একটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে নেয়া হবে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। তাই এ মুহূর্তে ভারতের উপর নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাও নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যে রাশিয়ার সব অস্ত্র রপ্তানিকে একইভাবে দেখছে না, তার প্রমাণ পাওয়া যায় চীনের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে। ২০ সেপ্টেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা দেয়, রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার ‘অভিযোগে’ চীনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ইক্যুইপমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন ও এর ডিরেক্টরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই চীনা সামরিক সংস্থার কাজ ছিল অন্য দেশ  থেকে অস্ত্র কেনা। এ কাজের অধীনে সংস্থাটি রাশিয়া থেকে সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, এটা রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে করা হয়েছে, কারণ দেশটির অর্থনীতি এখন অস্ত্র রপ্তানির উপর বেশ নির্ভরশীল। তবে রুশ অস্ত্র যদি মার্কিন বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে যায়, সেক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না-ও হতে পারে।
বহু প্রতীক্ষার পর গত ৬ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠক করেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘কমিউনিকেন্স কম্প্যাটিবিলিটি এন্ড সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট’ (সিওএমসিএএসএ) বা কমকাসা চুক্তি। এ চুক্তির ফলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রযুক্তি ক্রয় করতে পারবে, যা চীনের সামরিক শক্তিকে ভারসাম্যে রাখতে কাজে লাগবে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ প্রযুক্তি থাকায় দুই দেশের মাঝে সরাসরি সংবেদনশীল সামরিক তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে।
ভারতের বেশির ভাগ অস্ত্র এখনও রাশিয়ায় তৈরি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (সিপরি) তথ্যমতে, ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মাঝে ভারত যত অস্ত্র কিনেছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ১০ শতাংশেরও কম অস্ত্র। প্রযুক্তি আলাদা হবার কারণে রুশ অস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সাথে একত্রে কাজ করতে সক্ষম নয়। যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র কৌশলগতভাবে তাদের খুব কাছের দেশগুলোর সঙ্গেই এ যোগাযোগ প্রযুক্তি আদান-প্রদান করে। ২০১৬ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে। লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট (এলইএমওএ) বা লেমোয়া চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ একে-অপরের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করার অনুমতি পায়। অন্যকথায়, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় সামরিক বিমান ঘাঁটি এবং নৌঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে।
ভারতকে নিজের বলয়ে আরও শক্তভাবে নিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে তেল ক্রয়ের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কিছুটা ছাড় দিচ্ছে, কারণ ইরানের সহায়তা ছাড়া ভারতের পক্ষে আফগানিস্তানে মার্কিন-সমর্থিত সরকারকে সহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। গত ৫ অক্টোবর ভারত ইরান থেকে সাড়ে ১২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনার ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি যাবার ফলে ভারত একইসঙ্গে রাশিয়া, ইসরায়েল এবং ফ্রান্স থেকে অস্ত্র কিনলেও ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে কোন বাধা না-ও আসতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর এক লেখায় ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো আলিসা আয়ার্স বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনায় ভারতের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবেন কিনা, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। হঠাৎ করেই ভারতের পক্ষে সকল রুশ অস্ত্র যেহেতু বর্জন করাও সম্ভব নয়, তাই রাশিয়াকে টার্গেট করে কাটসা আইন ট্রাম্পের হাতে ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি হাতিয়ার হিসেবে থাকবে। অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা স্ট্রাটফর বলছে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি এলেও তাদের সম্পর্ক সমস্যা-বিবর্জিত হবে না।
ভারতের আমদানি করা অস্ত্রগুলি যেহেতু চীন এবং পাকিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছি মোতায়েন করার লক্ষ্যে কেনা হচ্ছে, তাই অস্ত্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে না। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বাণিজ্য হারালেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলের সাথে এটি সাংঘর্ষিক হবে না।

Disconnect