ফনেটিক ইউনিজয়
যুদ্ধ, খরা ও বাঁধের কবলে বিপর্যস্ত ইরাকি কৃষক
স্বর্ণা চৌধুরী
ক্রমেই পানিশূন্য হয়ে পড়া ইরাকে চাষবাস করাই ছেড়ে দিচ্ছে কৃষকরা
----

একসময় যেখানে পানির কোনো অভাব ছিল না, ছিল ফসলী জমির বিশাল ক্ষেত্র- আজ সেখানে নেই বৃষ্টি, শুকিয়ে গেছে নদী, ফসলের মাঠও নেই। যুদ্ধ, আগ্রাসন, সন্ত্রাস সহ্য করলেও; খরা ও বাঁধের ফলে এখন বিপর্যস্ত ইরাকের কৃষক। এ অবস্থা থেকে মুক্তির কোনো সহজ পথও তারা দেখছেন না। পানির অভাব বা খরা প্রাকৃতিক হলেও, এখানে তেলের মতো পানিও রাজনৈতিক।
৭৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ খলিল ইব্রাহীম, ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বসরা নগরীর আল-মুশারাহ জেলার একজন কৃষক। তিন প্রজন্ম ধরে তারা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮০-এর দশকে তাদের ৫০ হাজার খেজুর গাছ ছিল। খরা ও জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেখানে হাজারখানেকই মাত্র বর্তমান। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-কে ইব্রাহীম জানান, তার কোনো সন্তানই এ মৃত্যুপথ যাত্রী কৃষি খামারের দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। এমনকি প্রতিমাসে অন্তত তিন জন কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। আল-মুশারাহ জেলার অনেক গ্রাম এখন জনশূন্য।  এ চিত্র পুরো ইরাক জুড়ে।
তাই কৃষকরা চাষবাস ছেড়ে এখন কাজের সন্ধানে নগরের দিকে ছুটছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৯৯১ সালে ইরাকের ৩৪ শতাংশ মানুষ কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে যা নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে।
ইরাকের পানিমন্ত্রী হাসান আল-জানাবি মিডল ইস্ট আই-কে জানান, সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরান ও কুয়েত যুদ্ধের সময় থেকেই আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি ইরাক। এরপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের আগ্রাসন, ২০০৬ সাল থেকে চলমান গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধ- এসবের মধ্য দিয়ে ইরাকের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ে।
বসরায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সরবরাহ করা খাবার পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি নগরীর কয়েক হাজার অধিবাসী অসুস্থ হয়ে পড়ে। গত জুলাই থেকে দুর্নীতি ও অবকাঠামো ধ্বসের ফলে সৃষ্ট পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে বসরা ও অন্যান্য নগরীর অধিবাসীরা আন্দোলন করছেন। আগস্টে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন আন্দোলনকারী নিহত হলে বিক্ষুব্ধ জনতা কয়েকটি সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। একটা সময় ইরাক ছিল প্রাকৃতিকভাবে পানির উৎসভূমি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইরাকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে ইরাকের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ১৯৭০-এর দশক থেকে যৌথ নদীগুলোতে পার্শ্ববর্তী দেশ তুরস্ক ও ইরানের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে। নগরীর চারদিকে খাল-বিলের কারণে বসরাকে একসময় ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভেনিস’ বলা হলেও, আজ সে অস্তিত্ব সংকটে।
হাসান আল-জানাবি জানান, কৃষি, গৃহস্থালী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য ইরাকে প্রতিবছর অন্তত ৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি দরকার। যেখানে বর্তমানে পানির প্রাপ্যতা মাত্র ৩০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। তিনি আরও জানান, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী থেকেই মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পানি পেত ইরাক। গত জুনে টাইগ্রিস নদীতে তুরস্ক ইলিসু বাঁধ প্রকল্প শুরু করেছে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে দেশটি। এর ফলে ইরাকে পানি সংকট আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে টাইগ্রিস নদীতে ইরাক মসুল বাঁধ নির্মাণ করে, যা দেশটির সবচেয়ে বড় বাঁধ। এর ফলে নদীতে পানির প্রবাহ কমে আসে এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ‘ইরাক সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে’ বলে জানিয়েছেন ভূ-তাত্ত্বিক ও রাডার টেকনোলজিস ইন্টারন্যাশনাল এক্সপ্লোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন গ্যাশে। ইরাকের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বিভিন্ন জায়গায় ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে তিনি বলেন, ইরাকে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।
তবে টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর দেখাও দিয়েছেন গ্যাশে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে চালানো পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে তিনি জানিয়েছেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় আনবার প্রদেশের মরুভূমিতে ৭০০ থেক ২০০০ মিটার গভীরে পানির তিনটি স্তর রয়েছে। যেখানে হাজার হাজার বিলিয়ন কিউবিক মিটার সুপেয় পানি মজুত রয়েছে। গ্যাশে বলেন, ‘ভবিষ্যতে ভূ-গর্ভস্থ পানি তেলের চেয়েও দামি হয়ে উঠবে। ইরাকে শেষ বিচারে তেলের মতোই পানিও খুবই রাজনৈতিক।’
গ্যাশের অনুসন্ধান সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেছে পানিমন্ত্রী আল-জানাবি। মন্ত্রণালয় থেকে এ সম্পর্কে কোনো পরিকল্পনাও নেয়া হয়নি। এখানেই নিহিত পানির রাজনীতি। আনবার প্রদেশটি সুন্নি অধ্যুষিত। ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পরও সুন্নি যোদ্ধারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এ প্রদেশে। পরবর্তীতে এটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা ও আইএস’র ঘাঁটিতে পরিণত হয়। গত নভেম্বরে সরকারি বাহিনী আনবার দখল করে। কিন্তু সুন্নি অধ্যুষিত বলে এ প্রদেশের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা নেয়নি ইরাকি সরকার।
এদিকে, গত মে মাসের নির্বাচনে ইরাকের কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য উদার গণতন্ত্রীদের সঙ্গে জোট গঠন করে শিয়া গণতান্ত্রিক নেতা মুক্তাদা আল সদর জয় পান। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ২ অক্টোবর নতুন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান নিয়োগ দিয়েছে ইরাকি পার্লামেন্ট। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কুর্দি নেতা বারহাম সালিহ। প্রধানমন্ত্রী শিয়া নেতা আদেল আব্দুল মাহদি। গত সেপ্টেম্বরে স্পিকার হিসেবে মোহাম্মদ আল-হালবুসির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে, ইরাক শাসনের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয় দেশটির সবচেয়ে বড় তিন গোষ্ঠী। যার আওতায়, প্রধানমন্ত্রীর পদটি রয়েছে শিয়াদের দখলে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে কুর্দি এবং স্পিকার পদে বসতে পারেন সুন্নি নেতারা। আর ইরাকের কৃষকরা স্বভাবতই দেশটির নতুন সরকারের কাছে তাদের স্বাভাবিক জীবনের দাবিটুকুই পাওয়ার আশা রাখবে।

Disconnect