ফনেটিক ইউনিজয়
শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক-সাংবিধানিক সংকট
নেপথ্যে ভারত-চীন আধিপত্যের সংঘাত
অনির্বাণ গুহ, কলকাতা

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্নে ভারত ও চীন সেখানে নিজেদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় রাখতে চায়। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে তার নেপথ্যেও এ দুই আঞ্চলিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের আধিপত্যের লড়াই ইন্ধন যুগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ২৬ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনা তাকে হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যদিয়ে রাজাপক্ষে আবারও দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হলেন। আর নিশ্চিতভাবেই এর প্রতিফলন দেখা যাবে অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে। সাবেক এ প্রেসিডেন্টের প্রত্যাবর্তনে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ সামনে এসেছে। শ্রীলঙ্কা ক্রমেই ভারত থেকে সরে চীনের ঘনিষ্ঠ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট
বরখাস্ত করা হলেও বিক্রমাসিংহের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী তিনি এখনো দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ত্যাগ করবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রত্যুষ রাও বলেন, এ মুহূর্তে শ্রীলঙ্কায় দু’টি ক্ষমতা কেন্দ্র রয়েছে। যা দেশটিতে সাংবিধানিক সংকট ঘনীভূত করেছে। সিংহলী বৌদ্ধদের মধ্যে এখনো রাজাপক্ষের অনেক সমর্থন রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি অলটারনেটিভস জানায়, এটি সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। তারা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। তারা মনে করছে, ২০১৫ সালের সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারেন না প্রেসিডেন্ট। কেবল পার্লামেন্টের আস্থা ভোটের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীকে সরানো সম্ভব। তবে আরেক পক্ষ বলছে, সংবিধানের ৪২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট এমন কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন, যাকে তার মনে হবে যে, তিনি পার্লামেন্টের আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারবেন। আবার অনেকে এ ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক অভ্যুত্থান’ হিসেবেও অভিহিত করেছে।
শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট হলেন দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী তার ডেপুটি হিসেবে মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব দেন। ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে রাজাপক্ষে ও সিরিসেনার ৯৫টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে বিক্রমাসিংহের দলের আসন ১০৬টি। এদিকে, বিক্রমাসিংহের দল ইউএনপি’র জোটে থাকা পাঁচজন সদস্য রাজাপক্ষের দল ইউনাইটেড পিপল্স ফ্রিডম অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়ে মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। এখন বিক্রমাসিংহের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারেন মুসলিম দলগুলো- অল সিলন মাক্কাল কংগ্রেস (৫ জন এমপি), শ্রীলঙ্কা মুসলিম কংগ্রেস (৭ জন এমপি)। তারা বর্তমানে ইউএনপি’র সঙ্গে জোটবদ্ধ রয়েছে। মার্ক্সবাদী জনতা বিমুক্তি পেরামুনার পার্লামেন্টে ছয়জন সদস্য রয়েছে। উভয় পক্ষেরই বিরোধিতা করে তারা কোনো পক্ষেই যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে। তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের (টিএনএ) রয়েছে ১৬ জন এমপি। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তামিল সমস্যার সমাধান যারা করবে, তারা তাদের সঙ্গে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাথিউ সারকস্টা বলেন, রাজাপক্ষেকে যেভাবে ক্ষমতায় আনা হলো- এতে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেইসঙ্গে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিশ্চিতভাবেই দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, গৃহযুদ্ধ অবসানের কৃতিত্বের জন্যই শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে জনপ্রিয়। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে দমন করা হয়। ক্ষমতাসীন রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠে। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র সামনে আসে। তবে চীনের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকায় ওই হত্যাযজ্ঞের পরও এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

চীনের জয়
প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ায় রাজাপক্ষেকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। শ্রীলঙ্কায় চীনের রাষ্ট্রদূত চেং জুইয়ান কলম্বোয় রাজাপক্ষের বাসভবনে গিয়ে শ্রীলঙ্কায় আগামীদিনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের ব্যাপক সমর্থন থাকবে বলে আশ্বাস দেন। এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রীলঙ্কায় তারা উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তবে পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউরেশিয়া গ্রুপের পরিচালক শৈলেশ কুমার বলেন, সিরিসেনা তার রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে রাজাপক্ষেকে এনেছেন। এ পটপরিবর্তনে আবারও ফিরে আসবে চীনা প্রভাব। কারণ চীন একজন বন্ধুকে ক্ষমতাসীন অবস্থায় পাবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রাজস্ব আয়ের ৮০ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। আর এ অর্থের বেশির ভাগটাই যায় চীনের ঘরে। রাজাপক্ষে ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় (২০০৫-১৫ সাল) অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে বাছবিচার ছাড়াই ঋণ নেয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। এ অভিযোগ তুলেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং রনিল বিক্রমাসিংহের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
ভারতপন্থী বলে পরিচিত বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। কয়েকটি নীতিগত বিষয় ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহের মতবিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বদলে ওই প্রকল্পগুলো শ্রীলঙ্কাকে ঋণের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ২০১০ সালে তাদের বিদেশি ঋণের পরিমাণ জিডিপি’র ৩৯ শতাংশ ছিল। ২০১৫ সালে সেটা জিডিপি’র ৯৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। ফলে ২০১৬ সালে তাদেরকে আইএমএফ থেকে ঋণ সহায়তা নিতে হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কা মাগামপুরা মাহিন্দা রাজাপক্ষে বন্দরকে চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়। ঋণ পরিশোধের জন্যই তাদেরকে এটা দিতে হয়েছে।
ক্ষমতার দ্বন্দে¦র জেরে গত মার্চে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ন্যাশনাল অপারেশনস রুমসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে নেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। সম্প্রতি কলম্বো বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রিসভার আলোচনায় দু’জনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে বলেও সিরিসেনা অভিযোগ করেন। এরপরই হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তিনি বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করেন।
এ বরখাস্তের রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছিল বিক্রমাসিংহের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে। বিক্রমাসিংহ সরকারের ব্যাপক করারোপ জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। কলম্বো ব্রোকারেজ হাউজ সিটি সিএলএস-এর স্ট্র্যাটেজিস্ট সঞ্জিবা ফার্নান্দো বলেন, চীনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে সরে বিক্রমাসিংহে ভারত ও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চেয়েছেন। তবে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মানুষ ভাবছিল কিছুই ঠিক চলছে না। সব মিলিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে একটা আবহ গড়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ভারত চাইছে নিজের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাববলয় গড়ে তুলতে। অপরদিকে চীন চায় এ অঞ্চল নিজের অধীনে রেখে ভারতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ দূরে রাখতে। আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের দ্বৈরথে একমাস আগে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীনা বন্ধুভাবাপন্ন আবদুল্লাহ ইয়ামিনের পরাজয় ছিল চীনের জন্য এক ধাক্কা। যাকে ভারতের জয় বলে মনে করা হচ্ছিল। শ্রীলঙ্কায় এবারের পটপরিবর্তনে ঘটে এর বিপরীত সমীকরণ।
নয়াদিল্লিভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো মনোজ যোশী বলেন, শ্রীলঙ্কায় ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, চীনও তাদের অবস্থান তৈরি করেছে। তাই প্রতিযোগিতাটা অনিবার্য। কিন্তু এটা নির্ভর করবে শ্রীলঙ্কান শাসকদের উপর, কিভাবে তারা নিজেদের উপকারের জন্য এ দুই শক্তিকে কাজে লাগাবে।

Disconnect