ফনেটিক ইউনিজয়
কোন পথে এগোবে ব্রাজিলের নতুন সরকার?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ব্রাজিলের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারো
----

ব্রাজিলের নির্বাচনে ডানপন্থী রাজনীতিক জেয়ার বোলসোনারোর জয়লাভের পর দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। তিনি আগেই উগ্রপন্থী কথা বলার জন্য সংবাদমাধ্যমে এসেছেন। নারী, আদিবাসী ও সমকামীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এখন তারাই বোলসোনারোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। ব্রাজিলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতির হাত থেকে জনগণকে মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে ক্ষমতায় আরোহণ করবেন বোলসোনারো। কিন্তু প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবেন এবং কোন্ পথে দেশকে এগিয়ে নিবেন এখন সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদমাধ্যম পিবিএস’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ব্রাজিল ব্যুরোর প্রধান আর্নেস্তো লন্ডনো বলেন, সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ক্যাপ্টেন জেয়ার বোলসোনারো কংগ্রেসে রয়েছেন তিন দশক ধরে। মূলধারার রাজনীতিবিদ নয়, তাকে সবাই চিনতো উগ্রপন্থী মতবাদের জন্য। গত বছর ব্রাজিলে ৬৩ হাজার মানুষকে হত্যা দেশের মানুষকে ভাবিয়েছে। এছাড়াও বর্তমান সময়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও কর্পোরেট দুনিয়ার ব্যাপক দুর্নীতিও জনগণের চিন্তার কারণ হয়েছে। এ সময়ে বোলসোনারো জনগণের কাছে নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে জানিয়ে আস্থা অর্জন করতে চেয়েছেন।
এদিকে, অপরাধ দমনে ব্রাজিলের নিরাপত্তা বাহিনী বড় শহরগুলোতে আক্রমণাত্মক ভূমিকা রখেছে। চলতি বছরেই সহিংসতায় নিহতদের চার ভাগের এক ভাগ তাদের হাতে নিহত হয়েছে। জানা যায়, বোলসোনারো অপরাধ দমনে আরও কঠোর হতে চান। এমনকি আইনশৃংখলা বাহিনীকে বিচারের বাইরে রাখতে চান, যা সহিংসতা আরও বাড়াতে পারে। অপরাধের দায়িত্ব নেয়ার বয়স ১৮ থেকে ১৬ বছরে নামিয়ে আনতে চান তিনি। একইসাথে ভূমিদস্যুদের দখল কর্মকা-কে সন্ত্রাসবাদের মাঝে ফেলতে চান। তবে বোলসোনারোর এই চেষ্টাগুলোর সাথে আইন পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে; যেখানে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বামপন্থীদের আইনি বাধার মুখে পড়তে পারেন।
ভূ-রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা স্ট্রাটফর বলছে, বোলসোনারোর পরিবর্তনের চেষ্টাগুলো বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যেমন ব্রাজিলের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বোলসোনারো দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতাগুলো সরানোর চেষ্টা করবেন। দক্ষিণ আমেরিকার কমন মার্কেট অব দ্য সাউথ বা মারকোসুরের বাণিজ্য চার্টারে পরিবর্তন আনতে হলে এর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিলের সঙ্গে একমত হতে হবে। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে কতটুকু রাজি করানো সম্ভব হবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ দেশটির বর্তমান অর্থনীতিতে আশেপাশের দেশগুলোকে বাণিজ্যে ছাড় দিয়ে ভোটের রাজনীতি করা কঠিন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে আর্জেন্টিনার নির্বাচন আসন্ন। এর আগে দেশটির নেতৃবৃন্দ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ছাড় না-ও দিতে পারে।
বোলসোনারোর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর বোলসোনারো কাছাকাছি চিন্তা পোষণ করেন। বিশেষ করে আমেরিকাতে চীনের কর্মকা- ও বাণিজ্যের ব্যাপারে দু’জনের চিন্তাই একরকম। ব্রাজিলের বিদ্যুৎ, পরিবহন অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রকল্পে সাম্প্রতিককালে বিনিয়োগ করেছে চীন। এই বিনিয়োগের ব্যাপারে বোলসোনারো কিছুটা রক্ষণশীল ভূমিকা রাখতে পারেন। বোলসোনারো কিছুদিন আগেই তাইওয়ান ঘুরে এসেছেন; তবে চীনে যাননি। তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় চীনবিরোধী বক্তব্যের কারণে চীনা কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে বোলসোনারো চীনের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর হতে পারবেন, তা নির্ভর করছে ব্রাজিলের ব্যবসায়ীদের সমর্থনের উপর। কারণ চীনের বিনিয়োগের উপরে নজরদারি বাড়ালে লালফিতার দৌরাত্ম্য আরও বাড়বে, যা সেখানকার ব্যবসায়ীরা চাইবেন না।
ব্রাজিলের নতুন সরকার প্রতিবেশী ভেনিজুয়েলাকেও প্রভাবিত করবে। ঐতিহাসিকভাবে দেশটির সঙ্গে ব্রাজিলের সখ্য ছিল। কিন্তু নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে বোলসোনারোর ব্যবহার কেমন হবে, সেটি এখনও বলা যাচ্ছে না। তবে এ স¤পর্কে ঘাটতি পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। স্ট্রাটফরের মতে, দেশটিতে ব্রাজিলের সামরিক হস্তক্ষেপের আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে ভেনিজুয়েলাতে যদি সরকার পরিবর্তিত হয়, সেক্ষেত্রে সেদেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে জড়িত হওয়ার একটা প্রশ্ন চলে আসতে পারে।
মূলত, জনগণের ভোট আদায়ের জন্য বোলসোনারো অনেক প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন যা আগের সরকাররা বিভিন্ন পিছুটানের কারণে দিতে পারেননি। তবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। তবে বোলসোনারো ব্রাজিলকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পথেই হাঁটবেন এবং সেই সুবাদেই দক্ষিণ আমেরিকায় চীনের প্রভাবকে কমাবার চেষ্টা করবেন।

Disconnect