ফনেটিক ইউনিজয়
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ উইঘুর
আহমেদ শরীফ
চীনের ভৌগোলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি উইঘুর
----

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ শিনজিয়াং বা উইঘুর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চলে চীন সরকারের ব্যাপক নির্যাতন এবং ধরপাকড়ের খবর প্রকাশিত হলে সেগুলো ঠিক নয় বলে দাবি করে আসছিল দেশটির সরকার। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়ার চাপে চীনা সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, তারা উইঘুরের অনেক নাগরিককে আটক করে ‘শিক্ষা’ দিচ্ছেন, যাতে তারা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ইউনাইটেড ওয়ার্ক ফ্রন্ট বিভাগের প্রধান ইউ কুয়ানের বরাত দিয়ে চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ‘সিনহুয়া’ বলছে, জঙ্গিবাদ ঠেকাতে ধর্মীয় কর্মকা-ের উপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ থাকতেই হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের কথাতে পরিষ্কার যে, এই কাজ সম্পাদনে চীনা সরকার বিশাল ক্যাম্প পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে এই ক্যাম্পের বিশালতার চিত্র পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলছেন, ক্যাম্পগুলোতে ১০ লাখের মতো মানুষকে আটকে রাখা হতে পারে।  পশ্চিমারা এই সুযোগে মানবাধিকারের ব্যাপারে কথা বলে চীনের উপর চাপ সৃষ্টি করলেও তা উইঘুরের জনগণের কোনো কাজে আসেনি। কিন্তু চীন তার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এই কর্মকাণ্ড কেন পরিচালনা করছে? এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বই বা কতটুকু?
শিনজিয়াং উইঘুর অটোনমাস রিজিয়ন নামের এই অঞ্চলের আয়তন ১৬ লাখ বর্গ কিলোমিটার যা চীনের মোট আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ। আশপাশের ৮টি দেশের সঙ্গে এর সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। দুই কোটি দশ লাখ মানুষের উইঘুরের ১৩টি জাতির মধ্যে উইঘুর মুসলিমরাই সবচেয়ে বড়। মধ্যযুগের সিল্ক রুটের ওপর অবস্থিত হওয়ায় পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে বাণিজ্য ও সংস্কৃতির যোগাযোগ বন্ধন রক্ষাকারী হিসেবে উইঘুরের গুরুত্ব ছিল অনেক। উনিশ শতকে মধ্য এশিয়ায় রুশ সাম্রাজ্যের আগ্রাসী ভূমিকা মোকাবিলায় চীনের চিং রাজবংশ ১৮৮৪ সালে শিনজিয়াং রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে উইঘুরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে ব্রিটিশদের সঙ্গে আফিম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ কলহের কারণে চীন সরকার উইঘুরে শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এ সময় উইঘুর নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা দিলেও ১৯৪৯ সালে মাও সে-তুং-এর  নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা নেয়ার পর চীন সরকার আবারও উইঘুরকে নিয়ন্ত্রণে নেয়। মাও-এর নীতি অনুযায়ী উইঘুরের মুসলিমদের জোরপূর্বক অন্যত্র পাঠিয়ে  সেখানে চীনের পূর্ব উপকূল থেকে হান জাতির লোকদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে ২০০৯ সালে ব্যাপক জাতিগত দাঙ্গার সূচনা হয়।
চীনের বেশির ভাগ মানুষ থাকে পূর্ব উপকূলের কাছে ইয়াংজি ও পীত নদীর তীর ঘেঁষে অত্যধিক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। পশ্চিম ও উত্তরের শিনজিয়াং, তিব্বত, ইনার মঙ্গোলিয়া এবং মাঞ্চুরিয়াতে কম বৃষ্টিপাতের কারণে জনসংখ্যা অনেক কম। এই চারটি অঞ্চলকে চীনা শাসকরা বহিঃশত্রু থেকে বাঁচতে বাফার রাজ্য হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। সরকার শক্তিশালী থাকার সময় তারা এটা পেরেছে; কিন্তু সরকার যখন দুর্বল ছিল, তখন পারেনি।
চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি চালিকাশক্তি হলো জ¦ালানি। ‘পাওয়ার ম্যাগাজিন’এর এক প্রতিবেদন বলছে, চীনের মোট জ¦ালানি খণিজের ২০ শতাংশই রয়েছে উইঘুরে। কারামায় তেলখনি চীনের সর্ববৃহৎ খনিগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়াও সেখানে রয়েছে কয়লা, রুপা, তামা, সীসা, নাইট্রেট, সোনা এবং দস্তার মতো বিভিন্ন খণিজ। মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাসের পাইপলাইন চীনের পূর্বাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিতে গেলে উইঘুরের উপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। ২০০৬ সালে সাইনো-কাজাখ অয়েল পাইপলাইন যাত্রা শুরু করে। তবে উইঘুরের উপর দিয়ে চীনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবাহিত হলেও সেখানে চীনের অন্য অংশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিন্দুমাত্রও পরিলক্ষিত হয়নি।
চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সমুদ্রের তীরে হওয়ায় সেগুলো সমুদ্রপথের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তিশালী নৌবহরকে ব্যবহার করে চীনের সমুদ্র বাণিজ্যের রুটগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাই চীন এই সমুদ্রপথের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে উইঘুর, মধ্য-এশিয়া, পাকিস্তানের মাধ্যমে স্থলপথে একটা আলাদা বাণিজ্যপথ গড়তে চাইছে। মধ্যযুগের সিল্ক রুট এক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে উদাহরণ। আরব সাগরে গোয়াদর বন্দর তৈরি করে পাকিস্তান এবং উইঘুরের মাধ্যমে চীন বিকল্প রাস্তা তৈরি করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসেব মতে, ইউ এবং চীনের মাঝে বাণিজ্য ২০১৭ সালে ছিল ৫শ’ ৭২ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্যের বেশির ভাগটাই এখন হচ্ছে সমুদ্রপথে, যা চীনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে ‘চায়না ডেইলি’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলছে, চংকিং-শিনজিয়াং-ইউরোপ ইন্টারন্যাশনাল রেলওয়ে ব্যবহার করে চীন থেকে মাত্র ১৬ দিনে পণ্য জার্মানি যেতে পারে কিন্তু সমুদ্রপথে লাগে ৩৬ দিন। তাও আবার সেই জাহাজকে যেতে হয় দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালী, কলম্বো, বাব-এল মান্দেব প্রণালী, সুয়েজ খাল এবং জিব্রাল্টার পার হয়ে, যেগুলো নিয়ে বহু রাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। 
শিনজিয়াং বা উইঘুর চীনের জ¦ালানি এবং বাণিজ্যপথের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। উইঘুর এখনও চীনের ভৌগোলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলের মানুষদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে চীন সরকার। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো চীনের মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের খবর ফলাও করে প্রচার করলেও সকলেরই জানা, পশ্চিমা দেশগুলোও তাদের দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যকলাপ চালাচ্ছে। তবে এখন চীনের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উইঘুরের মুসলিমদের উপর, যারা দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে এক শতকেরও বেশি সময় ধরে।

Disconnect