ফনেটিক ইউনিজয়
নেপথ্যে উগ্র-জাতীয়তাবাদ, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আর কর্তৃত্ববাদ
বিশ্বব্যাপী পপুলিজমের উত্থান
স্বর্ণা চৌধুরী

ইউরোপ থেকে আমেরিকা, কিংবা এশিয়া- বিশ্বব্যাপী উত্থান ঘটছে পপুলিজম বা জনপ্রিয়তাবাদের। এটি সাধারণত জনগণের আবেগ, বঞ্চনা বা হতাশাকে কাজে লাগায়। এসব বিবেচনায় নিয়ে এ ধারার নেতারা জনগণকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাবে কি যাবে না, তা বিচার-বিবেচনা না করেই তারা ঢালাও প্রতিশ্রুতি দেয়। কৌশল হিসেবে প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। তারা কিছু ‘শত্রু’ নির্দিষ্ট করে এবং দেশ বা জনগণের সব সমস্যা, ক্ষতি বা বিপদের জন্য তাদেরই দায়ী করে। অনেক ক্ষেত্রে এজন্য নির্দিষ্ট কোনো বিদেশি শাসক বা শক্তিকে, নির্দিষ্ট দেশীয় জনগোষ্ঠী, বা বিদেশি নাগরিকদের দেশটির সব সমস্যার জন্য দায়ী করা হয়। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে, উগ্র-জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। জনপ্রিয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হচ্ছে- এটি কোনো জটিল প্রশ্নের সহজ সমাধান সামনে তুলে আনে, সমস্যার গভীরতা বা ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, তা বিবেচনায় নেয়া হয় না। রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে এ ধারাটি ডান ও বাম দুই পক্ষকেই নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে বা নিজেদের পক্ষে নিয়ে এসে এক ধরনের বিভ্রমের পরিস্থিতি তৈরি করে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধারাটিকে আশ্রয় করে অনেক দল ক্ষমতায় এসেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও বেশ কয়েকটি দল ক্ষমতায় আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য ‘জনপ্রিয়’ (পপুলার) ও ‘জনপ্রিয়তাবাদ’ (পপুলিজম) শব্দ দু’টির মাঝে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘পপুলিজম’ বলতে বোঝায়- একটি সমাজে যখন জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়, সমাজ যখন ‘প্রকৃত জনগণ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত’- এই পরস্পরবিরোধী দু’টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়, তখনই জন্ম নেয় পপুলিজম। এমনটিই বলছেন ‘পপুলিজম: অ্যা ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’ বইয়ের লেখক কাস মাডে ও রোভিরা কল্টওয়াসার। এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদ্বয়ের মতে, পপুলিজম পুঁজিবাদী উদার গণতন্ত্রের ধারণাকে খারিজ করে এবং নির্বাচনী গণতন্ত্রকে সমর্থন করে। এ ধারাটি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে জনগণের ‘একমাত্র চাওয়া’ বলে স্বীকৃতি দেয় এবং এটাকেই সার্বভৌমত্ব বলে উল্লেখ করে, বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে। এর মধ্যদিয়ে তারা সংখ্যালঘু অধিকার হরণ করে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতার দাপটে সাংবিধানিক আদালতের মতো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই ব্যবস্থা জনগণকে দ্বিখণ্ডিত করে- পপুলিজমের পক্ষে ও বিপক্ষে। ভিন্নমতাবলম্বীদের তারা কার্যত সবকিছু থেকে বাদ দিতে চায়। আরেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মুলার নির্বাচনী গণতন্ত্রকে ‘সংকীর্ণ গণতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তাবাদী সরকার যে রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে, তা প্রকৃতপক্ষে নির্বাচিত সরকারের নামে কর্তৃত্ববাদ বা একক শাসনেরই নমুনা।
তবে ‘পপুলিজম’ শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ‘দ্য গ্লোবাল রাইজ অব পপুলিজম’ বইয়ের লেখক বেঞ্জামিন মফেট বলেন, এই শব্দটি প্রায়ই ভুল ব্যবহার হয়, বিশেষ করে ইউরোপের প্রেক্ষিতে। এ প্রসঙ্গে জন মুলার বলেন, শব্দটার এত যথেচ্ছ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।     
স্যান্ডার্স, করবিন, সিরিজা ও পোডিমসকে ট্রাম্প, ফারাজ বা মোদি, ইমরানদের কাতারে ফেলার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা মানেই পপুলিজম নয়। স্যান্ডার্স, করবিনরা জনগণের মধ্যে থেকেই রাজনীতি করছেন, আর সে অবস্থান থেকেই রাষ্ট্র ও এলিটদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন। তারা পপুলিস্টদের মতো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণের নামে জনগণকে ‘স্বর্গরাজ্যের’ ধারণা প্রদান করছেন না।
পপুলিস্ট নেতারা মূলত ‘জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছা’র প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেন। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তারা জনগণের দুর্ভোগের জন্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতাসীনদের দায়ী করে থাকেন। তবে তারা রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলাতে চান না, এতে গণমুখী সংস্কারও আনতে চান না। বরং তারা আরও কর্তৃত্ববাদী, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের চেষ্টা করে থাকেন। প্রফেসর মফেট বলেন, এখন সবচেয়ে সফল পপুলিস্টরা বিশেষত উগ্র ডান ঘরানার। তিনি বলেন, ফ্রান্সে মেরিন ল্য পেন, হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওরবান ও যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প পপুলিজমের সঙ্গে অভিবাসন বিরোধিতা, উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান কনসোর্টিয়াম অব পলিটিক্যাল রিসার্চের পরিচালক মার্টিন বুল বলেন, ইউরোপে পপুলিস্ট দলগুলোর উত্থান হয়েছে এই শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে। তবে তারা ফুলে ফেঁপে উঠে ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়ে। বিশেষ করে ২০১১ সাল থেকে এই উত্থান প্রকট আকার ধারণ করে। তখন ইউরোপের ব্যাংকিং সংকট ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার সময়েই পপুলিস্ট, বা ফ্যাসিস্ট শাসকদের উত্থান হয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক পর্যালোচনায় জানা যায়, বর্তমানে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ইউরোপীয় পপুলিজমকে সমর্থন করে। যেখানে ১৯৯৮ সালে মাত্র সাত শতাংশ ইউরোপীয় পপুলিজমের সমর্থক ছিল। তখন দু’টি ছোট ইউরোপীয় দেশ- সুইজারল্যান্ড ও স্লোভাকিয়ায় পপুলিস্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। এখন ইউরোপের নয়টি দেশে পপুলিস্ট সরকার ক্ষমতাসীন।
এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাতটি ‘নির্বাচনী গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের পাঁচটিতেই ক্ষমতায় রয়েছে পপুলিস্টরা। ভারতে নরেন্দ্র মোদি উগ্র-হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে ভিত্তি করে মুসলিম বিদ্বেষ ও দুর্নীতিবিরোধিতাকে ইস্যু করে ২০১৪ সালের ভোটে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেন। ভিন্নমত দমন, মুসলিম-দলিতদের হত্যা, অর্থপাচার, চীন ও পাকিস্তানবিরোধী বুলি আর হাজারো প্রতিশ্রুতিই মোদির গত চারবছরের ফলাফল। ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতের্তে জনগণকে মাদক থেকে মুক্ত রাখা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বিকাশ এবং মার্কিন বিরোধিতাকে ইস্যু করে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দাভাও শহরের মেয়র থাকাকালে তিনি মাদকবিরোধী অভিযানের নামে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেন। দরকারে এ সংখ্যা এক লাখে পৌঁছানোর কথাও তিনি জনসমক্ষে উল্লেখ করেছেন। গত দুইবছরে জনগণের কোনো উন্নতি না হলেও মাদকমুক্ত করার নামে এরই মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্য, বেকারত্ব, অভিবাসন-বিরোধিতা এবং মুসলিম বিদ্বেষকে ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন। এর বিপরীতে, মেক্সিকোতে লোপেজ ওবরাডর ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানকে প্রধান ইস্যু হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে ভোটে জয়লাভ করেছেন। তিনি ১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এদিকে জেইর বলসোনারো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ব্রাজিলে সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে যেভাবে রাজনৈতিক নেতারা ধরা পড়ছিলেন, তার বিপরীতে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণ আস্থা হারাচ্ছিলেন, এর ফলে উত্থান ঘটে এই উগ্র-জাতীয়তাবাদী চেতনার ডানপন্থী নেতা বলসোনারোর। আগামী ১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথগ্রহণ করার কথা এ পপুলিস্ট নেতার। পাকিস্তানে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান ওই পপুলিজমের পায়ে ভর দিয়েই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আর ক্ষমতায় যেতে সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় উগ্রবাদের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রেও মুখে প্রতিশ্রুতির খই ফোটাতে হয়েছে তাকে। দিতে হয়েছে যুদ্ধের অবাস্তব আস্ফালন। এ সবই পপুলিজমের চেতনা। যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী।

Disconnect