ফনেটিক ইউনিজয়
আমি যে সমস্ত কাজ করি, সেটা আমি নিজের ভেতরের তাগিদে করি : বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমরের জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৩১ খ্রি. পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক, ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম তাঁর পিতা। ভাষা আন্দোলনের গবেষণার পথিকৃৎ বদরুদ্দীন উমর মার্ক্সীয় তত্ত্বের অনুসারী ও ভাষ্যকার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সুপরিচিত। আন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপনার সময় (১৯৫৭-৬৮) তিনি অক্সফোর্ডে গিয়ে দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি বিষয়ে ডিগ্রি (১৯৬১) অর্জন করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা। ষাটের দশকে তাঁর তিনটি গ্রন্থ- সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশিত হলে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিদ্বেষদৃষ্টিতে পড়েন। সরকারের সঙ্গে বিরোধ তীব্র হওয়ায় তিনি অধ্যাপনা থেকে ইস্তফা (১৯৬৮) দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) যোগ দেন এবং পার্টির মুখপত্র গণশক্তি সম্পাদনা করেন। কিন্তু পার্টি ক্রমাগত ভুলের দিকে এগিয়ে গেলে তিনি পার্টির লাইনের বিরোধিতা করে পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন। তখন থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পুনর্গঠন ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত আছেন। বদরুদ্দীন উমর রাজনীতি, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ক শ’খানেক গ্রন্থ এবং অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বর্তমানে তিনি সাম্প্রতিক দেশকালে ধারাবাহিকভাবে তাঁর আত্মজীবনীর পঞ্চম খণ্ড লিখছেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারটিতে নানা বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলতাফ পারভেজ, মাসুদ রানা ও আবিদুল ইসলাম

বর্ধমানে আপনার জন্ম। তো সেই সময়কার আপনার মূল্যবান শৈশবের স্মৃতি যেগুলো এখনও আপনার মনে পড়ে...
শৈশবের কোনো স্মৃতি আমার মনে নেই। কারও মনে থাকে কিনা আমার সন্দেহ।

শৈশব বলতে বাল্যকালের কথা। যেগুলো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, মূল্যবান মনে হয়।
শৈশবের কতো স্মৃতি তার ঠিক নেই। আমি ‘আমার জীবন’ প্রথম খণ্ডে লিখেছি। এত স্মৃতি!

রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো স্মৃতি আছে কি, যেগুলো মনে আছে?
আমাদের পরিবারটাই তো রাজনৈতিক পরিবার। এ পরিবারে কংগ্রেস ছিল, মুসলিম লীগ ছিল, কমিউনিস্ট ছিল। বর্ধমান জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির ফাউন্ডার মেম্বার ছিলেন আমার দুই কাজিন। ছোটবেলা থেকেই কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট এসব রাজনীতির সাথে আমরা পরিচিত ছিলাম- সব আলোচনায় আমরা থাকতাম। ২ নম্বর পার্কার্স রোডে আমাদের দাদির যে বাড়ি ছিল, সেখানে আমি জন্মেছিলাম। সব দলের বড় বড় নেতারা সেখানে আসতেন। আগে থেকেই এটা ছিল ঐতিহাসিক বাড়ি। এটাকে এখন ভেঙে ফেলা হয়েছে। সিপিএম সেটা ভেঙে ফেলে। এটা আরও ঐতিহাসিক এজন্যে যে, এখানে বিদ্যাসাগর হাসপাতাল করেছিলেন। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ছিল তখন, তাই চিকিৎসার জন্য এ বাড়িতে হাসপাতাল করেছিলেন।
যা-ই হোক, রাজনীতির সাথে তো ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিচয়। আমাদের ফ্যামিলিটা এমন ছিল, একজন কংগ্রেস করলে তার ছেলেকে কংগ্রেস করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, মুসলিম লীগ করলে মুসলিম লীগই করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তো কেউ কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ করলে তার ছেলে কমিউনিস্ট পার্টি যোগাযোগ রাখতে বা করতে পারবে না, এমন কোনো কথা নেই। আমরা ছোটবেলায় মিটিংয়ে যেতাম। কমিউনিস্ট পার্টির জায়গাতেও যেতাম। কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে ক্লাস হতো। হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরী, সৈয়দ শাহেদুল্লাহ সাহেবের মতো রাজনীতিকরা কখনওসখনও যেতেন। আমাদের বাড়ি ছিল লিবারেল একটা স্পেস। সেই বাড়িতে গান, আবৃত্তি, নাটকের চর্চা হতো। আমাদের ফ্যামিলিতে এত কাজিন ছিল, বাইরের লোকদের দরকার হতো না। আমরা নিজেরাই সব করতাম। গানের আসর, নাটক করতাম। ছোটবেলায় ১৯৪৫ সালে যখন নিখিল বঙ্গ কিষাণ সভার বিখ্যাত সম্মেলন হয়েছিল, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস নেতা, অন্যদেরও আমন্ত্রণ করেছিল। আমরা কাজিনরাসহ সেখানে গিয়েছিলাম, অন্যরাও ছিল। আমরা বিরাট দল বেঁধে গিয়েছিলাম। মনে আছে, সেখানে আমরা লম্বা একটা ঘরে ছিলাম। জমিদার বাড়ি, সেখানে ছিলেন বঙ্কিম মুখার্জী। বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা। খুব লম্বাচওড়া ছিলেন। উনি ছেলেদের সাথে খুব গল্প করতেন। ওইখানে তখন ভারত যোশী, পিসি যোশীসহ আরও অনেককে দেখেছিলাম। সর্বভারতীয় নেতা, বাংলাদেশের নেতা অনেকেই ছিলেন। ওখানে নবান্ন বলে একটা নাটক হয়েছিল। সেই সময়কার বিখ্যাত ওই নাটক লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবীর প্রথম স্বামী বিজন ভট্টাচার্য। আরেকটা রাজনৈতিক সম্মেলনের কথা বলতে পারি, সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল। আমার বয়স হবে ১২ বছর। সে সময় করাচিতে মুসলিম লীগের ৩১তম সম্মেলন হচ্ছিল, সেখানে আব্বার সাথে গেলাম ৫দিনের লম্বা জার্নি করে।

সম্ভবত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীও ট্রেনে আপনাদের সাথে ছিলেন।
না, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ট্রেনে ছিলেন না। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী যখন লাহোরে নামলেন সেখানে একদফা মারামারি হলো। আমার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে এগুলো আছে। আবার আশ্চর্য ব্যাপার, যখন ফিরছি তখনও কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে নিয়ে আরেকদফা মারামারি। যা-ই হোক, করাচির ওই সম্মেলনে জিন্নাহ সাহেবসহ আরও নেতারা ছিলেন। সেই সময় চলছিল তেতাল্লিশ সালের দুর্ভিক্ষ। ওই সময় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ জয়েন্টলি রিলিফ কমিটি হয়েছিল। সে রিলিফ কমিটি চাঁদা তুলত। আমরা চাঁদার রসিদ বই নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে আছে, সে সময় আমরা ডায়াসের উপর উঠেও চাঁদা তুলেছি। সবাই বসে আছে ডায়াসের ওপর। সেখানে গিয়ে চাঁদা তুলছি। সেখানে কে যেন আমাকে বলল যে, ডায়াসের ওপর ওঠা নিষেধ, নিচে গিয়ে চাঁদা তোলো। এরকম অনেকরকম এক্সপেরিয়েন্স। তারপর মুসলিম লীগের আরেক বিখ্যাত সম্মেলনে গিয়েছিলাম। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর সব প্রদেশের বিধানসভা সদস্যদের নিয়ে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতা থেকে একটা স্পেশাল ট্রেন দিল্লি গিয়েছিল। সেই স্পেশাল ট্রেনে গেলাম দিল্লিতে। সম্মেলনটি হয়েছিল দিল্লির অ্যাংলো-অ্যারাবিক (অহমষড়-অৎধনরপ) কলেজে। সেখানে আব্বার সাথে জিন্নাহ সাহেবের স্টেট আর স্টেটস নিয়ে বিখ্যাত বিতর্ক হয়েছিল। জিন্নাহ সাহেবের দর্প, বক্তৃতা ইত্যাদি নিয়ে বেশ আলোচনাও হয়েছিল। সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অনেক নেতাকে তখন দেখেছি। যেমন, সিন্ধু প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী গোলাম হোসেন হেদায়েত উল্লাহ (আগে প্রাইম মিনিস্টার বলত, বর্তমানে যাদের মুখ্যমন্ত্রী বলে), আসামের প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ সাদউল্লাহ, বিরাট লম্বাচওড়া খান আবদুল কাইয়ুম খান, মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, শওকত হায়াত খান। আমরা যে বাড়িতে ছিলাম, সে বাড়িতে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জুবেরির ভাই। তিনি সরকারের আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) ছিলেন। আরও ছিলেন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর জাকির হুসেন। এ রকম আরও অনেক মানুষকে দেখেছিলাম।

সন্তান বড় হোক, এটা সব বাবাই চায়। আপনার বাবা আপনাকে নিয়ে কী প্রত্যাশা করতেন?
ছোটবেলা থেকেই আমার বয়স্কদের আলোচনা শোনার অভ্যাস ছিল। বয়স্ক লোকেরা বসে যখন সিরিয়াস আলোচনা করতেন, রাজনৈতিক আলোচনা করতেন, এসব আমি শুনতাম। এজন্য কেউ কেউ আমাকে বলত ইঁচড়ে পাকা! সবকিছু যে বুঝতাম, তাও নয়। সে সময়ে আব্বার কাছেই প্রথম মার্ক্সের সারপ্লাস ভ্যালুর ওপর আলোচনা আমি শুনেছি। এ ধরনের সিরিয়াস আলোচনার মধ্যে আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম।

উনি কীভাবে চাইতেন যে, আমার ছেলে এভাবে বড় হোক। তার জীবনটা এভাবে...
সেটা ওই রকম কোনো বাঁধাধরা ছিল না। আমাদের ফ্যামিলিতে একটা লিবারেল ব্যাপার ছিল। ছেলেকে যে একভাবেই গড়ে তুলতে হবে, সেরকম না। সব রকম এক্সপোজার আমাদের ছিল। কংগ্রেসের রাজনীতি, লীগের রাজনীতি, কমিউনিস্ট রাজনীতি সবকিছুর এক্সপোজারই আমাদের ছিল। সেখানে চাপাচাপি কিছু ছিল না। কিন্তু পরে আমি যখন কমিউনিস্ট হলাম, তখন উনি আমার ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলেন। আমাকে কিছু বলেননি। চাপাচাপি করার  তো প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু সেটা ওনার পছন্দ হয়নি। উনি চেয়েছিলেন আমি যেন একধরনের ইসলামী চিন্তাই করি। কিন্তু তা নিয়ে আমাকে ইসলামের ওপর কোনো লেকচার দেয়া, কিংবা চাপাচাপি করা, এসব করেননি। আমাদের ফ্যামিলিটাই এরকম।

আপনাদের ফ্যামিলি সম্ভবত ১৯৫০ সালে এদিকে মাইগ্রেট করে চলে এসেছিল...
না, আমাদের তো আসার কোনো কথাই ছিল না। আগে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ওপর আমাদের বাড়ি ছিল। আমাদের তো বর্ধমানে কোনো বাড়ি ছিল না। পার্টিশনের পরে আব্বা ওইখানে একটা একতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন। সেই বাড়ি কমপ্লিট করা যায়নি টাকার অভাবে। কিন্তু ইনকমপ্লিট থাকতেই আমরা বাড়িতে উঠে গিয়েছিলাম। আর বাড়ি ইনকমপ্লিট থাকতেই আমরা চলে এসেছিলাম।

কমিউনাল একটা অ্যাটাক হয়েছিল...
সেটায় পরে আসছি। আমাদের আসার কথাই ছিল না। আসার কথা থাকলে উনি পার্টিশনের পরে সেখানে বাড়ি বানাতেন না। যারা চলে যায়, তারা তো পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করে চলে যায়। উনি ওইখানে একটা বাড়ি বানিয়েছিলেন। কাজেই আসার কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু ১৯৪৯-৫০ সালে রায়টের সময় বাড়িতে আগুন দেয়া হলো। আগুন কেউ সেভাবে দেয়ওনি। আগুন দিয়েছিল কিছু বদমাশ লোকজন। এটা বলা যাবে না যে, বর্ধমানে বিরাট আকারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, বর্ধমানে কোনোদিন কোনো দাঙ্গা হয়নি পঞ্চাশ সালের আগে। পঞ্চাশ সালেই বর্ধমানে দাঙ্গায় লোক মারা গিয়েছিল। কিন্তু যেটা হয়েছিল, সেটা আসলেই সমস্ত পরিবেশটা একধরনের বিষাক্ত করে তুলেছিল। আমি বলব, আমার নিজের যে বন্ধুবান্ধবরা ছিল, তাদের মধ্যে এসব কিছু ছিল না। কিন্তু আব্বার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যারা তার থেকে অনেক সুবিধা নিয়েছিল, সেইসব বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা দেখা গেল। সেই সাথে তারা খারাপ ব্যবহারও করেছিল। এখানে মুসলমানদের সেরকম কোনো অবস্থান ছিল না। কিন্তু বর্ধমানে আমাদের তো সমাজে, অন্যান্য জায়গায় বড় অবস্থান ছিল। সেখানে কেউ যে আমাদের ওপর এরকম অ্যাটাক করবে, বা কেউ আমাদের সাথে এরকম ব্যবহার করবে, এটা চিন্তার বাইরে ছিল। এসব দেখেশুনে উনি খুব ডিস্টার্বড হলেন। আমিও তখন ডিস্টার্বড হলাম। আমার বয়স তো কম ছিলনা, ১৮ বছর ছিল। সবাই ডিস্টার্বড হয়ে গেলাম। তখন ঠিক হলো যে, আমরা চলে আসব। আর উনি তো একটা সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন করতেন। আমাদের বড় প্রপার্টি কিছু ছিল না এবং যা কিছু ছিল সব একেবারে পানির দরে বিক্রি করে দিলেন। আমরা চলে এলাম ১৯৫০ সালের এপ্রিলে। অথচ আমাদের আসার কোনো কথাই ছিল না। কোনো চিন্তাই ছিল না।

এখানে এসে অ্যাডজাস্ট করতে আপনাদের কোনো সমস্যা হচ্ছিল? বিশেষ করে আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছিল?
না, অ্যাডজাস্ট করতে কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। আমার বন্ধু ছিল মোস্তফা কামাল। জজ সাহেব। প্রধান বিচারপতি ছিল। তার ওপর একটা প্রবন্ধে আমি এ নিয়ে লিখেছি, এর আগে অন্য কোথাও লিখিনি। আমি যখন পঞ্চাশ সালে চলে এলাম, আমার তো ওখানে একটা বন্ধু সার্কেল ছিল। ফর্চুনেটলি আমার বন্ধুদের মধ্যে ক্লোজ একজনই মারা গেছে। বাকিরা সবাই আছে। গেলে দেখা হয়। আশির ঊর্ধ্বে, যাদের বয়স আশি-চুরাশির মধ্যে। বন্ধু মহল একটা ছিল। সেটা ছেড়ে চলে এলাম। এখানে তো কাউকে চিনি না। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমি মোস্তফা কামালের ওপর সেই লেখার প্রথম প্যারাগ্রাফেই লিখেছি। আমি এখানে চলে এলাম। বন্ধুহীন হয়ে গেলাম। তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমার আবার একটা বন্ধুমহল তৈরি হলো। শীতকালে যেমন পাতা ঝরে যায়। তারপর বসন্তে আবার নতুন পাতা গজায়। সেভাবে ওইখানের বন্ধুত্ব ঝরে গেল। এখানে আবার একটা বন্ধুমহল সৃষ্টি হলো। কিন্তু আমি যেহেতু সোস্যালি খুব অ্যাক্টিভ, মানুষের সাথে মেলামেশা করি। আমার তো বন্ধুমহল তৈরি হতে খুব দেরি হয়নি।

আপনার আব্বা কি খুব ডাউন ছিলেন মানসিকভাবে?
ওনার একটা ভুল চিন্তা ছিল। উনি মনে করেছিলেন যে, ১৯৪৭ সালের আগে সেই আন্দোলনের সময় যখন উনি মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন, ওইখানে যারা তাঁর সাগরেদ ছিল, উনি এখানে আসার পর তারা খুব রেসপেক্ট করবেন। সেরকম কিছুই হয়নি। এটা তাঁর জন্য শকিং ব্যাপার ছিল। আমি অন্যদের দোষ দিই না। এজন্য তাঁকেই দোষ দেই। তিনি যে ইসলামী রাজনীতি করতেন, এখানকার চিন্তা কিন্তু তখন অন্য রকমের ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর ধরনের চিন্তার একটা সেকুলারাইজেশন আরম্ভ হয়ে গেল এবং সে অবস্থায় তাঁর পুরনো লেফট সাগরেদ যারা ছিল, তারা তো রাজনৈতিকভাবে ওনার সাথে থাকার কোনো প্রশ্নই ছিল না। যেমন কমরুদ্দিন সাহেব তার মধ্যে একজন। তাঁর সাথে আব্বার ভালো সম্পর্ক ছিল। কমরুদ্দিন সাহেব আমাদের বাড়িতে আসতেন। তাঁরা তো সোস্যালি যুক্ত ছিলেন। উনি পলিটিক্যালি এলিনিয়েটেড হয়ে গিয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে তাজউদ্দীন আহমদ, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, আতাউর রহমান, অলি আহাদÑ সবাই আসতেন। কিন্তু পলিটিক্যালি ওইটা কিন্তু আর হয়নি। এজন্য আমি অন্যদের দোষ দিই না। তাঁর যে রাজনীতি, সেখানে ওনার মধ্যে খুব একটা কনট্রাডিকশন ছিল। একদিকে লিবারেল র‌্যাডিক্যাল লোক ছিলেন। আবার অন্যদিকে তাঁর কতগুলো অন্য চিন্তা ছিল। ইসলামী চিন্তা। ইসলামী চিন্তাটাই উনার সর্বনাশ করেছে রাজনীতিতে। উনি মুসলিম লীগে ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের কতগুলো ফান্ডামেন্টাল জিনিস উনি অপোজ করতেন পাবলিকলি। যেমন, হি নেভার অ্যাকসেপটেড টু নেশন থিওরি; পাবলিকলি তিনি টু নেশন থিওরি অপোজ করতেন। ওনার ন্যাশনালিটি সম্বন্ধে, নেশন সম্বন্ধে যে আইডিয়া ছিল, ওটা কমিউনিস্টদের থেকেও অনেক প্রগ্রেসিভ ছিল। হি নেভার বিলিভ ইন দি ইউনিটি অব ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ায় ওয়ান ন্যাশন থিওরি, টু ন্যাশন থিওরি- উনি বিশ্বাস করতেন না। উনি বলছেন, ইন্ডিয়া ইজ আ কান্ট্রি অব মাল্টি-ন্যাশনালিটি। এই মাল্টি-ন্যাশনালিটিতে তাঁর একটা বিশ্বাস ছিল। দ্বিতীয়ত, সেপারেট ইলেক্টরেটের বিপক্ষে ছিলেন। মুসলিম লীগ তো সেপারেট ইলেক্টরেটের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। উনি কিন্তু একদম সেপারেট ইলেক্টরেটের বিরুদ্ধে জয়েন্ট ইলেক্টরেটের পক্ষে ছিলেন। হি ওয়াজ অ্যাগেইনস্ট মাদ্রাসা এডুকেশন। উনি চাইতেন মাদ্রাসা শিক্ষার এবোলিশ করে দিতে। এ ধরনের চিন্তা কিন্তু তাঁর ছিল। অন্যদিকে আবার তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। এখানে আসার পর কিন্তু আগেকার ওই ট্রেন্ডটা তার কিন্তু ডমিনেটিং ছিল না। যেটা আগে ডমিনেট করেছিল- ইসলামী রাজনীতি।

মাদ্রাসাশিক্ষাটাকে যে তিনি অপোজ করতেন, এটাকে কি আমরা তাঁর কন্ট্রাডিকশন বলতে পারি?
উনি এটা অপোজ করতেন এজন্য যে, মাদ্রাসার যে কারিকুলাম, দেওবন্দের কারিকুলাম, সে কবেকার কয়েকশ বছর আগেকার কারিকুলাম- এ কারিকুলাম দিয়ে আসলে কারো কোনো শিক্ষা হয় না। মডার্ন এডুকেশন দরকার। সেখানে রিলিজিয়ন একটা আলাদা সাবজেক্ট হিসেবে পড়াতে পারে। অবশ্য কলকাতা মাদ্রাসা অন্যরকম ছিল। কলকাতা মাদ্রাসার শিক্ষার মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে অন্য শিক্ষাও ছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমল থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত কলকাতা মাদ্রাসার সমস্ত প্রিন্সিপাল ছিল ইংরেজ। খ্রিস্টান। কিন্তু বাকি যে মাদ্রাসা ছিল বিশেষত নওয়াব আব্দুল লতিফ এর পর থেকে যে মাদ্রাসা শিক্ষা ইন্ট্রোডিউস করা হয়, তাঁর রিকমেন্ডেশনে  যে সিলেবাস হয়েছিল, সেটাতে যে কারিকুলাম ছিল, সেটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যাকওয়ার্ড।

ওনার (আবুল হাশিম) চিন্তার যে খুবই শক্ত অবস্থান, এখানে সে বাস্তবতা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছিল; আবার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নিশ্চয় আপনিও অন্য রাজনীতির ছোঁয়া পেলেন। ওনার চিন্তার অবস্থান থেকে আপনিও দূরে সরে যাচ্ছিলেন।
আমি এরকম লোক না যে, হঠাৎ আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়। আমি যখন রাজনীতি আরম্ভ করলাম- মেনন ও অন্যরা আমার বিরুদ্ধে যত রকম স্ক্যান্ডাল করা যায়, করত। মেনন, রনো, কাজী জাফর- তাঁরা তো খুব বিষাক্ত চরিত্রের। পরে আমি যখন পার্টিতে যোগ দিলাম, তখনও বলতো আমি নাকি তমুদ্দুন মজলিশ করতাম। কিন্তু আমি ডিনাই করি না যে, আমি তমুদ্দুন মজলিশের সদস্য ছিলাম। আর আমি যখন তমুদ্দুন মজলিশের সদস্য ছিলাম, তখন তমুদ্দুন মজলিশ অনেক প্রগ্রেসিভ কাজের সাথে জড়িত ছিল। ভাষা আন্দোলন তো তারাই করেছিল। যদিও ইসলামিক অর্গানাইজেশন মানেই হচ্ছে, তার মধ্যে একটা রিঅ্যাকশনারি কনটেক্ট আছে। কিন্তু সেটার মধ্যেই আমি ছিলাম। আই ডিড নট ডিনাইড। আমি হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়ে যাইনি। হ্যাঁ, আমি তো আমার বাবার ছত্রছায়ায় ছিলাম, সেখানে তাঁর চিন্তা আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। আমি ইসলামী চিন্তা করতাম। কিন্তু আমার যেটা হয়েছে, যাকে বলে গ্রোথ- আই হ্যাভ কন্টিনিউউয়াজ গ্রোথ। এই গ্রোথটা কলা গাছ বা পেঁপে গাছের মতো না। এটা হচ্ছে বটবৃক্ষের মতো। আমি খুব ধীরে ধীরে শক্তভাবে বড় হয়েছি। চিন্তা করেছি। সেজন্য আমি আজকে একরকম, কালকে একরকম, পরশু আরেকরকম- এসব করি না। একটা গ্রাউন্ডের ওপর থাকি। এই গ্রাউন্ডটা আমার দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়েছে। আমি আব্বার একটা প্রভাবের মধ্যে ছিলাম, যেটা ছিল একটা পাওয়ারফুল ইন্টার‌্যাক্ট। নিজে চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল আমার। আই কুড থিংক আফটার মাইসেল্ফ। আমি নিজেই চিন্তা করতাম।

আপনি যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন, তখন কি প্রলুব্ধ করেছিল আপনাকে? কোন চিন্তাটা প্রলুব্ধ করেছিল?
না, ওসব কোনো চিন্তাই ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার সময় তৈরি হয়নি। আমি যেরকম চিন্তার মধ্যে ছিলাম, সেরকম চিন্তা নিয়েই আমি তমুদ্দুন মজলিশের মেম্বার ছিলাম। আমি একটা প্যামফ্লেটও লিখেছিলাম ইসলামের ওপর সেসময়। সেটা হারিয়ে গেছে। যে সময় আমি কিছু লিখতামও। আমি সৈনিকে লিখতাম। আমি সেসব ‘সংস্কৃতি’তে, ‘সাম্প্রদায়িকতা’র ভূমিকাতেও বলেছি। আমার আগের যে লেখা ছিল, সেগুলো আমি আর স্বীকার করি না। সাম্প্রদায়িকতা যখন লিখলাম, তারপর থেকে সমস্ত আগের লেখা আমি আর ‘ওন’ করি না।

আগের লেখাগুলা কোনোভাবে এখন আর পাওয়া যাবে না?
সেটা পাওয়া যাবে কিনা জানি না। সৈনিকের কোনো সংখ্যায় হয়তো পাওয়া যেতে পারে। যা-ই হোক, তখন ফররুখ আহমদ আমার লেখার খুব প্রশংসা করতেন। উনি ইসলামী লোক ছিলেন। আমি যখন চেঞ্জ করলাম, ফররুখ ভাই আমার ওপর খুব রেগে গেলেন।

চিন্তার এ পরিবর্তনটা কীভাবে হলো?
এই যে আমি নানারকম বই পড়ছি- ছোটবেলায় আমার একটা অভ্যাস ছিলÑ অল্প বয়সেই বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র সব পড়ে ফেলেছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে আসার পর ‘আই বিকেইম অ্যাকুয়েইটেড উইথ ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল লিটারেচার।’ ফিলোসফি পড়তাম। সেখানে ফিলোসফিতে নানারকম আলোচনা, সেগুলো পড়তাম। সিলেবাসেই পড়তাম। আমার আরেকটা অভ্যাস ছিল- তখন তো বইয়ের দোকান বেশি ছিল না। ‘ওয়ার্সী বুক সেন্টার’ নামে বংশাল রোডে একটা বইয়ের দোকান ছিল। আমি বইয়ের দোকানে ঘুরতাম। আর বই কিনতাম। ফিলোসফিটাও ছিল। যে টেক্সট বইগুলো হয়তো আমি পড়ব এমএ ক্লাসে গিয়ে। প্লেটো, এরিস্টটল ইত্যাদি সমস্ত আমি পড়তাম। তাছাড়া গ্রিক লিটারেচার, গ্রিক ট্র্যাজেডি পড়তাম। এখনও পেপারব্যাক অনেক বই আছে। এই যে সক্রেটিস, হোমার, কান্ট, ইউরোপিয়ান লিটারেচার, ফেঞ্চ, ইংলিশ ইত্যাদি পড়তাম ওই ইউনিভার্সিটিতে থাকতে থাকতেই ‘আই বিকেইম মোর অর লেস অ্যাকুয়েইটেড উইথ এনটায়ার ক্ল্যাসিক্যাল লিটারেচার।’ টলস্টয় বলেন, চেকভ বলেন, দস্তয়ভস্কি, গোর্কি রাশিয়ান প্রধান লেখকদের তখন পড়েছি।

এগুলো আপনাকে চেঞ্জ করে ফেলেছে?
আমি পড়ছি, আমার চিন্তাভাবনার মধ্যে পরিবর্তন আসছে না? আমি এগুলো পড়ছি, তার একটা রিঅ্যাকশন হচ্ছে। কিন্তু বই পড়েই আমি একেবারে পাগল হয়ে গেলাম, তা না। আমার ওরকম কোনো পরিবর্তন হয়নি। এটা পড়তে পড়তে স্লোলি- যেটা বললাম গ্রোথ- আমার ভেতরে একটা গ্রোথ হচ্ছে, বিকাশ হচ্ছে চিন্তার। সেই বিকাশ হতে হতে একটা পর্যায়ে যখন আমি ইউনিভার্সিটি ছাড়লাম বাই দ্যাট টাইম আমার মধ্য থেকে ইসলামী চিন্তা বেরিয়ে গেল। ইউনিভার্সিটিতে চার বছর যে ছিলাম, তার মধ্যে আমার যে এক্সপেরিয়েন্স- নানা আন্দোলনে আমি সক্রিয় কর্মী ছিলাম না, কিন্তু সব জায়গায় আমি থাকতাম। বর্ধমানে থাকতে তো ওইরকম পাবলিক মিটিং, অতকিছু দেখিনি। কখনো দেখা গেল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মিটিং হচ্ছে, সেখানে গেলাম। ভালো বক্তা ছিলেন। কমিউনাল বক্তৃতা করতেন। বর্ধমানে তো তখন বড় বড় মিটিং হতো।

ঢাকায় তো তখন...
ঢাকায় তো তখন ভীষণ টারব্যুলেন্ট অবস্থা। মিটিং হতো। তখন আরমানিটোলা ময়দান ছিল মিটিংয়ের মূল জায়গা। ওইসব মিটিংয়ে অ্যাটেন্ড করছি। বইপত্র পড়ছি। এই করতে করতে আমার ভিতরে একটা পরিবর্তন আসছে। পরিবর্তন আসতে আসতে যখন আমি ইউনিভার্সিটি ছাড়লাম, বাই দ্যাট টাইম আমি ইসলামী ভাবাদর্শও ছাড়লাম। মার্ক্সিজমের সাথে আমার পরিচয় ছিল আগেই। কিন্তু আমি রাজশাহীতে যাওয়ার পর ও পরে যখন অক্সফোর্ডে গেলাম, সেখানেও আমি ব্যাপকভাবে মানুষের সাথে মেলামেশা করেছি। অনেক বক্তৃতা শুনেছি, আমার বন্ধুবান্ধব ছিল, ছেলে-মেয়ে আমি তারতম্য করতাম না। কত মেয়ের সাথে যে আমার বন্ধুত্ব ছিল। খারাপ সম্পর্ক কারও সাথে ছিল না। কিন্তু আমি ব্যাপকভাবে মিশতাম। ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিল। ইন্ডিয়ান মেয়েরা ছিল। যেমন দুজন মেয়ে তো সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল। কেতকী কুশারী আর সারা যোশেফ নামে আরেকজন।

আপনি তো সুদর্শন। সাথে পারিবারিক পরিচিতি। ঘনিষ্ঠ হওয়াটা তো স্বাভাবিক। না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।
সারা যোশেফ নামে একটা মেয়ে ছিল, যার নামে আমি আমার মেয়ের নাম রেখেছি। তার সাথে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তার ব্যাপারে আমার বইতে লিখেছি। কেতকী কুশারী। ইন্ডিয়ান মেয়েদের মধ্যে এ দুজনের সাথেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপরে ইংরেজ, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, চাইনিজ মেয়ে ছিল। চাইনিজ মেয়েটা ভীষণভাবে আমার প্রেমে পড়ে গেল। কিন্তু সে তো দেখতেও ভালো ছিল। তার গল্পও আমার বইয়ে আছে। আমি কোনো কিছু লুকাইনি। কতো দেশের ছেলেদের সাথে আমার পরিচয় ছিল। তাদের সাথে কথা বলছি, বিভিন্ন পার্টিতে যাচ্ছি, শরাব খাচ্ছি। শরাব খেয়ে মাতাল-ফাতাল হওয়া, এসব ছিল না। সেখানে ছেলেরা পার্টি দিত। পার্টিতে লিখে দিত- ‘ব্রিং আ বটল।’ মানে সে একটা পার্টি দিচ্ছে, কিন্তু সবাইকে মদ খাওয়ানোর পয়সা তার নেই। সে তখন সবাইকে বলছে, মদ খাওয়ার একটা বোতল সাথে করে নিয়ে আসতে। আবার অনেক জায়গায় লেখা থাকত ‘ইন আ বটল অ্যান্ড আ বাড’।  ‘বাড’ মানে হচ্ছে ‘মেয়ে বন্ধু’। আমার তো ওইরকম কোনো মেয়ে বন্ধু ছিল না। নেভার টু আ বাড। এই মেলামেশা ইত্যাদি যে চেঞ্জ হচ্ছে। ইমিন্যান্ট সব লোকদের বক্তৃতা শুনছি। কতরকম যে লোক ছিল। অক্সফোর্ডে তো এমনি কিছু লোক ছিল, যারা পড়তে যেত না। এমনিতেই যেত। অক্সফোর্ডে বাতাস খেতে যেত। কত যে স্কলারলি আলোচনা হতো। অক্সফোর্ডের এসব লেকচারগুলো ছিল সব পাবলিক লেকচার। ওখানেই, ‘আই অ্যাকচুয়ালি বিকেইম আ কমিউনিস্ট ইন অক্সফোর্ড’। যে পরিবর্তন হচ্ছে আমার- মার্ক্সিস্ট লিটারেচার পড়ছি, তখন আস্তে আস্তে ফাইনালি অক্সফোর্ডে থাকার সময়েই ‘আই বিকেইম আ কমিউনিস্ট’।  

আপনি যে চার বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটালেন, ওইখানে যারা আপনাকে ইনফ্লুয়েন্স করেছেন- শিক্ষক, বন্ধু বা অন্য কেউ- কাদের কথা মনে পড়ে?
শোনেন, অনেকেই বলে না যে, অমুকের দ্বারা আমি ইন্সপায়ারড হয়েছি। আমার এসব কিছু না। আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি কার প্রভাব আছে? তা আমি বলতে পারব না।

কাদের ফ্রেন্ডশিপটা আপনার বেশি মনে পড়ে? যাদের সাথে মেলামেশা করে ভালো লাগত। কিছু স্মৃতি...
ভালো লাগত মানে যারা আমার বন্ধু ছিল, তাদের সাথে মিশতে আমার ভালো লাগত।

নামগুলো বলেন।
বন্ধু ছিল। হাবিবুর রহমান ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার বন্ধু ছিল না। ওরা সব রাজশাহী ইউনিভার্সিটির বন্ধু ছিল। ওখানে ছিল আনিসুজ্জামান বলে একজন। পরে সিএসপি হয়েছিল। উত্তরা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিল। গভর্নমেন্টের অনেক সেক্রেটারি ছিল। এখনও আছে। তারপরে ইশতিয়াক ছিল, ওবায়দুল্লাহ ছিল, প্রদীপ ছিল, গোপাল ছিল। তারপর তমুদ্দুন মজলিশের যে ছেলেরা চিটাগং থেকে এসেছিল, তারা আমার বন্ধু ছিল। তমুদ্দুন মজলিশে কয়েকজন বন্ধু ছিল। তারপরেও ধীরে ধীরে আমি তমুদ্দুন মজলিশ থেকে সরে এলাম, কিন্তু তাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। নানা রকমের মানে ও ‘এক্সপোজ মাইসেল্ফ ইনটু মেনি আইডিয়াজ’। আর সেজন্য যেটা হচ্ছে, কোনটা রাখতে হবে, কোনটা বাতিল করতে হবে, এটা আমি একধরনের লোকের সাথে মিশলাম, আর তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গেলাম- এরকম কোনো ব্যাপার আমার ছিল না। আমি বলব একদিক থেকে ‘মাই মাইন্ড এক্সপেরিয়েন্সড, আই কুড থিংক আফটার মাইসেলফ’। সেজন্য এটা খুব ধীরে ধীরে হয়েছে। শক্তভাবে তৈরি হয়েছে। আমার বুনিয়াদ শক্ত হয়েছে।

একটু সামনের দিকে আসি। বিশেষ করে স্বাধীনতার পরের ঘটনায়- ১৯৭৪ সালে মৌলিক অধিকার ও সংরক্ষণ আইন সাহায্য কমিটি গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটটা এবং কমিটি যে কাজগুলো করেছিল, সে বিষয়টা যদি বলতেন।
সেটা ছিল ১৯৭৪ সালের মার্চ। তখন প্রেস ক্লাবের পেছনে পুরনো লাল রঙের যে বিল্ডিংটা ছিল, তার পেছনে শামিয়ানা টানিয়ে জায়গা করা হয়েছিল। এটা প্রাকটিক্যালি আমি ইনিশিয়েট করেছিলাম। যদিও আমি এর কোনো পদাধিকারী ছিলাম না। ইচ্ছে করেই থাকিনি। এ কারণে যে, তখন মুজিব সরকারের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছিল। জাসদ ছিল, লেফটিস্ট ছিল। তার যত রকম অপজিশনস ছিল- ‘দে মার্ডার্ড অ্যাবাউট টোয়েন্টি ফাইভ টু থার্টি থাউজ্যান্ড’। তার মধ্যে জাসদের লোকই বেশি ছিল। সেই সময় এত অত্যাচার ছিল যে, আমরা ঠিক করলাম, কিছু একটা করতে হবে। আমি এটা আলোচনা করলাম সিকান্দার আবু জাফরের সঙ্গে, মওদুদের সঙ্গে, এনায়েত উল্লাহও ছিল, পরের দিকে শরীফ সাহেবকেও নেয়া হয়েছিল। আরও অনেকেই ছিল। আমরা ঠিক করলাম যে, একটা কমিটি করা দরকার। প্রথমে লিগাল ডিফেন্স কমিটি হয়েছিল।

আহমদ ছফা কী ছিলেন?
ছফা ওইভাবে ছিল না। ছফার কথা বলব আমি। সেটা ‘আমার জীবন’ বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে আছে। আমরা ঠিক করলাম যে একটা কমিটি করা হবে। প্রথমে শরীফ সাহেবকে সভাপতি করা হবে। আর সেক্রেটারি হবে মওদুদ। এনায়েত উল্লাহ প্রিজাইড করবে। এসব আলোচনা করে আমরা প্রেস ক্লাবের পেছনে কনফারেন্স করলাম। তখনকার দিনে ঢাকার যত প্রমিনেন্ট লোক ছিলেন, অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। ৩১ মার্চ হলিডেতে আমার একটা লেখা বেরিয়েছিল তখন- ‘হু উইল সেভ দি আওয়ামী লীগ’। তখন প্রেস ক্লাবের গেটে সিঁড়ির সামনেই এক সাংবাদিক (এখন নাম মনে করতে পারছি না) আমাকে বলছে উমর ভাই, ‘আই উইল সেভ দি আওয়ামী লীগ’ (সহাস্যে)। তখন জসীমউদ্‌দীন সাহেব ছিলেন। এখন সব নাম মনে পড়ছে না। যা-ই হোক, সেখানে সভা যখন আরম্ভ হলো, তখন আহমদ ছফা উঠে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘আপনারা যে মওদুদ আহমদ, এনায়েত উল্লাহ খান, এদের এখানে রেখেছেন, এই তো মওদুদ আহমদ (মওদুদ আহমদ সেখানে ছিলেন) কদিন পরই তো সে এসব ভাঙিয়ে মন্ত্রী হবে। আর এনায়েত উল্লাহ, সে তো প্রতিক্রিয়াশীল সাংবাদিক।’ এসব বলল। এসব লোককে যে নেয়া হয়েছে, এসব লোককে নিয়ে কাজ করতে যাওয়া হচ্ছে। এসব হবে না! আমি করেছিলাম কি, আহমদ শরীফকে একটা ডামি হিসেবে বসিয়ে রেখে কন্ট্রোল দ্য হোল অর্গানাইজেশন। আমিই তো মূল অর্গানাইজার ছিলাম। আমি সেখানে তখন ছফাকে বললাম, ‘ছফা, আমরা যেটা করতে যাচ্ছি এটা কমিউনিস্ট পার্টি না। এটা কোনো ফেরেশতাদের পার্টিও না। এখানে বহু রকম লোক থাকবে, যাদের দিয়ে কাজ হবে। মওদুদ আহমেদ আছে, যার একটা ল’ ফার্ম আছে। আমরা মামলা করব। সেই ল’ ফার্ম অন্য কারুর তো নেই। আরেকটা নাম বলেন। কাকে দিয়ে করা যেত?’

ব্যারিস্টার ইশতিয়াক কি তখন ছিলেন না?
না, ইশতিয়াক তখন অতখানি সক্রিয় ছিল না। শেলী ছিল। হাবিবুর রহমান শেলী উপস্থিত ছিল। রাজশাহী থেকে এসেছিল। আমি বললাম, ‘এটা তো ফেরেশতাদের অর্গানাইজেশন না। শুধু ফেরেশতাদের নিয়েই অর্গানাইজশন করা হবে, এরকম কোনো অর্গানাইজশন হলে, কমিউনিস্ট পার্টি হলে তো এ আন্দোলন হবে না। ব্যাপক লোকদেরকে যাতে অরগানাইজ করা যায়, তা-ই করতে হবে।’ এনায়েত উল্লাহ খান, যার একটা কাগজ আছে। সেই কাগজ খুব হেল্পফুল। তাতে আমি লিখছিলাম প্রথম দিকের সংখ্যাগুলোয়। একাগজে যেভাবে লেখা হয় অন্য কোনো কাগজে এভাবে লেখা হয় না। তখন আমি ছফাকে বললাম, ‘ছফা, এখানে কোনো ফেরেশতা আছে কিনা আমি জানতে চাই। এখানে যদি কোনো ফেরেশতা থাকে, তিনি একটু হাত তুললে আমি খুশি হব।’ কোনো হাত ওঠেনি। তখন আমি ছফাকে বললাম, ‘আমরা যদি কাজ করতে চাই, তাহলে এদের সকলকে নিয়েই কাজ করতে হবে। কে পরে মন্ত্রী হবে না হবে, সেই হিসাব করে এ কাজ করা যাবে না।’ ছফার হিসাব ঠিকই ছিল। পরে মওদুদ সুবিধাবাদী হয়ে, মন্ত্রী ঠিকই হয়েছিল। কিন্তু তখন যে কাজ মওদুদ করেছিল, অন্য কেউ এগিয়ে আসেনি এটা করতে।
তখন ছফা বসল। আমরা মামলা করেছিলাম। অরুণা সেনের মামলা করেছিলাম। শাহজাহান বলে জাসদের একজনকে শেখ মুজিবের লোকেরা খুন করেছিল। তার মামলা করেছিলাম, সে মামলায় আমরা জিতেছিলাম। অরুণা সেনের মামলায়ও আমরা জিতেছিলাম।

সরকারের দিক থেকে কখনও চাপের মুখে পড়েননি আপনি?
না, ওই রকম কোনো চাপ সরকার থেকে আসেনি। মুজিবুর রহমান খুব রেগে ছিলেন আমার ওপর। কিন্তু চাপটাপ কিছু করেননি। রেগে ছিলেন অনেক আগে থেকেই। যখন তিয়াত্তর সালে বাংলা একাডেমির প্রাইজ নিলাম না, তখন তিনি বাংলা একাডেমিকে খুব গালাগালি করছিলেন, ‘কে বলেছিল উমরকে প্রাইজ দিতে?’ এমনিতে দেখা হলে খুব স্নেহ করতেন। ছোটবেলা থেকেই জানি তো তাকে। আমাদের কলকাতার বাড়িতে প্রায়ই আসত। বর্ধমানের বাড়ি যেত। গ্রামের বাড়ি যেত। কোথায় না গেছে। যা-ই হোক।
এ অবস্থায় দেখা গেল যে, শরীফ সাহেবকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। তখন আমরা শরীফ সাহেবকে পরিবর্তন করে সিকান্দার আবু জাফরকে সভাপতি করলাম। তিনি ছিলেন সৎ। আমরা কাজ করতে থাকলাম। তারপরে সেই চুয়াত্তর সালের দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষে ঢাকায় মরে পরে থাকছে লোকজন। সমস্ত জায়গায়। রংপুরে প্রায় এক লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। তখন আমরা এ কমিটি থেকে মন্বন্তর প্রতিরোধ কমিটি করি এবং সেই কমিটির একটা মিটিং আমরা করলাম বায়তুল মোকাররমের সামনে। সে সময় বায়তুল মোকাররমের সামনে মিটিং করতে দিত। উঁচু মঞ্চ করে সেখানে মিটিং করলাম। বিস্তর লোক হয়েছিল। বিদেশি সাংবাদিকও এসেছিল। লন্ডন টাইমস, লরেন্স লিফশুলজ, অন্য পত্রিকার লোক ছিল। মন্বন্তর প্রতিরোধ কমিটিতে তখন লরেন্স লিফশুলজ এসেছিল। সে প্রায়ই আমার বাড়িতে আসতো। পরে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল অন্য কারণে। সে তো রংপুর থেকে ঘুরে এসে আমাকে মন্বন্তরের বর্ণনা দিয়েছিল।  

আপনি কি তখন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত?
না না, কোনো দল না। একটাই দল আমি করেছি কমিউনিস্ট পার্টি। আমাকে মওলানা সাহেব অনেক করে ন্যাপে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। আমি বলেছি, ‘না, আমি এরকম একটা চাকরি ছেড়ে দিয়েছি এখানে এসে ন্যাপট্যাপ করার জন্য না। আমি কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোনো দল করবো না।’ যা-ই হোক, তখন কোনো পার্টিতেই যোগ দিলাম না। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার কথা আমাকে নেপাল নাগ লন্ডনে বলেছিল। পরে খোকা রায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। মেম্বার হতে গেলে যেসব কাজ করতে হবে আমি রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময় সেসব কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি যথাসময়ে মেম্বার হয়েছি।

এ যে কাজগুলো করেছেন...
না, চুয়াত্তর সালে যখন কমিটি হয়েছে, তখন তো আমি পার্টি ছেড়ে দিয়েছি। একাত্তরেই ছেড়ে দিয়েছি। তখন আমি পার্টিতে ছিলাম না। কিন্তু আমরা একটা পার্টি তৈরির চেষ্টা করছিলাম।

পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টিতে আরও পরে জয়েন করেছেন?
পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি না। এটা মতিনদের পার্টি ছিল। আমি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিলাম, ইপিসিপি (এমএল)।

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি তো ছেড়েছেন একাত্তরে। তারপর কি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন?
না না। তখন পূর্ব বাংলা মানে কি? তখন তো বাংলাদেশ হয়ে গেছে। পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিলাম না। ১৯৭৪ সালে আমি কোনো পার্টিতে ছিলাম না।

এই কাজগুলো যে করেছেন, শুধু একটা অটোক্রেটিক গভর্নমেন্টকে প্রতিরোধ করা- এ চেতনা থেকে করেছেন?
সেটাই তখন সামনের উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে মেনিফেস্টো তৈরি করে নেয়া হয়। একটা রিপ্রেশন হচ্ছে, সেটারই একটা প্রতিরোধ- রেজিস্ট্যান্স। সে সময় কোনো জায়গাতেই কোনো রেজিস্টেন্স ছিল না। কোনো পার্টি ছিল না। কিছুই না। এসময় এ কমিটিই কিন্তু একমাত্র রেজিস্ট্যান্স ফোর্স ছিল। এজন্য যখন চুয়াত্তর সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা জারি হলো আমি তো সঙ্গে সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম। এনায়েত উল্লাহকে ধরা হলো। মওদুদকেও বোধ হয় ধরেছিল।

১৯৮৮ সালে যখন এরশাদ সরকার সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম আইনটা আনলেন, ওই সময় সম্ভবত আবার একটা প্রতিরোধ কমিটি হয়েছিল, আপনি যার প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
এরশাদ যখন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম করল, তখন তো ভীষণ রকম প্রতিরোধ তৈরি হলো। সবাই আলোচনা করে ঠিক হলো যে, এটার একটা প্রতিরোধ কমিটি তৈরি করতে হবে। একটা প্রতিরোধ কমিটি হলো। তাতে অনেক মেম্বার ছিল। কিন্তু সেই কমিটির একটা প্রেসিডিয়াম তৈরি হয়েছিল ১৫ জনকে নিয়ে। আমি সেই প্রেসিডিয়ামের একজন মেম্বার ছিলাম। আমরা একটা মামলাও করতে চেয়েছিলাম। ইশতিয়াক সেই কমিটিতে ছিল। ইশতিয়াক, কামালরা বলল, ‘যদি হাইকোর্টে কাউন্টার মামলা করো, তাহলে তো আন্দোলনের অসুবিধা হয়ে যাবে। কাজেই মামলাটা আপাতত স্থগিত থাক।’ সেই মামলাটাই পরে সুব্রত চৌধুরীকে দিয়ে শাহরিয়ার কবীররা করেছিল। আমার তো মনে হয় সেখানে ইন্ডিয়ার ইনস্টিগেশন ছিল।

আপনি বলেছেন এটার সঙ্গে (শাহরিয়ার কবীরদের মামলা) কোনো সম্পর্ক নেই...
না, সম্পর্ক নেই। কারণ আমি দেখলাম যে, সে অবস্থায় আওয়ামী লীগও অপোজ করেছিল, বিএনপি অপোজ করেছিল, জামাতও অপোজ করেছিল। জামাতের অপোজ করার কারণ হচ্ছে- ‘তুমি একটা বিধর্মী, তুমি একটা বদমাশ। তুমি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করবে আমরা থাকতে, এটা তো হতে দেব না।’  
পরে আওয়ামী লীগ যখন সংশোধনী করে রাষ্ট্রধর্মকে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছে, বিএনপিও অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছে। কাজেই এ সময়ে এটাকে চেঞ্জ করা যাবে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আর এ সময়ে এটাকে ইস্যু করে লড়াই করারও রাজনৈতিক কোনো ফায়দা নেই। কিছুই নেই। এটা করলে একমাত্র লাভ হবে তাদের, যেসব বদমাশ ধর্মকে ব্যবহার করছে, আর ধর্মকে ব্যবহার করে তারা রাস্তায় নেমে যাবে। নেমেছেও। আমি বললাম না, যদি হাইকোর্ট এটা খারিজ না করতেন, তাহলে দেখতেন তারা রাস্তায় নেমে রাস্তা মাতাতে থাকত। এটাই তখন প্রিন্সিপাল ইস্যু হয়ে দাঁড়াত।

২০১৩ সালে সম্ভবত আপনার একটা নিবন্ধ বেরিয়েছিল ‘রাষ্ট্রধর্ম আইন বাতিল করতে হবে’ এরকম নামে। সমকালে। এখন যখন আবার বলছেন, এ আইনের সাথে সম্পর্ক নেই। এটা কিন্তু অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং যারা আপনার রাজনৈতিক অবস্থানকে অপোজ করে, তাদের একটা অংশ আপনার বিরুদ্ধে এটাকে কিন্তু কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
আমি আগে যখন বলেছি যে আমি এ মামলার মধ্যে নেই, তার মানে এটা তো না যে, আমি রাষ্ট্রধর্ম সমর্থন করছি। অনেকের তো বুদ্ধি কম আছে। তারা তো বোঝেও না। অনেকের তো বুঝতে অসুবিধাও হয়। অনেকে সবকিছু বুঝে কি? বুঝলে তো দেশে বিপ্লব হয়ে যেত।

আপনি একটা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, এ সময়ে ইস্যুটা রিভাইভ করার একটা রাজনীতি আছে।
এ সময়ে ইস্যুটাকে এভাবে রিভাইভ করতে যাওয়া- সবকিছু ছেড়ে দিয়ে শাহরিয়ার কবিরের মতো একটা লোক যখন এটা ইনিশিয়েট করছে- তার মানে বুঝতে হবে, এর পেছনে কোনো অন্য উদ্দেশ্য আছে। আমার ধারণা অন্য কারও ইনস্টিগেশনে সে এ কাজটি করেছে। এমনটা হলে এখানে একটা সাম্প্রদায়িক আবহাওয়া তৈরি হয়ে যেত। এটা হতে দেব কেন? কোনো কাজও হবে না, রাষ্ট্রধর্ম আইন বাতিলও হবে না। এদিকে দেশে সাম্প্রদায়িকতার নতুন একটা আবহাওয়া শক্তিশালী হবে। এটা তো আমরা বুঝি। এই পার্থক্যগুলো তো বুঝতে হবে।

সুব্রত চৌধুরী তো আছেন এটার সাথে। তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলতে শুনেছি যে, আপনি এটা অপোজ করায় তারা বেকায়দায় পরে গেছেন।
বেকায়দায় তো পড়বেই। জজ সাহেবরা যে জাজমেন্ট দিয়েছিলেন, আমার প্রভাব কি তাদের ওপর পড়েনি? আমি এটা অপোজ করায়, তারা হয়তো সেটা আমলে নিয়েছিল। কারণ ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন মরে গেছে। পাঁচজন আছে। তারমধ্যে সিআর দত্ত তো প্রায় প্যারালাইজড হয়ে গেছে। চার জন। আমি একজন পার্টনার। আমাকে শাহরিয়ার কবির মামলা করার পর ফোন করে বলেছে, ‘কামাল হোসেন সাহেব বললেন, যেহেতু মামলা আপনাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, আপনাকে একটা খবর দিতে যে, মামলা করা হয়েছে।’ আমি আর কিছু বললাম না, শুধু শুনলাম। শাহরিয়ার কবিরের সাথে কথা বলার পরে আমি তখন চিন্তা করলাম যে, সর্বনাশ! এটা যদি এখন করে থাকে, তাহলে সমস্যা হবে। কামাল আমাকে বলল, ‘সুব্রত চৌধুরীকে ফোন করো।’ সুব্রত চৌধুরীকে ফোন করলাম। সে বলতে থাকল, ‘আমি অনেকদিন থেকে এটা রিভাইভ করার চেষ্টা করছি।’ আমি তাকে বললাম, ‘রিভাইভ যে করছেন, এটার তো এ ফল হবে।’ সুব্রত চৌধুরী বলল, ‘আপনি তো আমার শিক্ষক, রাজশাহী ইউনিভার্সিটির টিচার।’ আমার ডিরেক্ট ছাত্র না। সে সময় রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিল। তা যা-ই হোক, সে কথা গেল। তারপর আমি তাকে বললাম, ‘এ ক্ষতিটা হবে আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?’ বলে, ‘হ্যাঁ সেটা তো একটা অ্যাসপেক্ট বটে।’ এ সিচুয়েশন সম্পর্কে তাকে আমি বললাম। তারপর রাতে স্টেটমেন্ট দিলাম যে, আমি পাঁচজনের একজন, চারজনের একজন বলতে পারব না। যদিও একজন তো বেহাল অবস্থার মধ্যে আছে। এই সিআর দত্ত আমাদের কমিটিতে ছিল। পনের জনের মধ্যে একজন। সম্ভবত আট-দশ বছর আগে কানাডায় গিয়ে সে এক মিটিংয়ে বলেছে, ‘যখন এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম আইন করল, কাগজে এটার এফেক্ট বেরিয়েছিল। তখন কোনো মুসলমান এটা অপোজ করেনি।’ সিআর দত্তই এটা বলেছে। আমি তখন কর্নেল নুরুজামানকে বললাম, ‘দেখেন, সিআর দত্ত লোকটা কী বলছে! আমরা সবাই একই প্রেসিডিয়ামের মেম্বার ছিলাম এবং এখানে কত বড় রেজিস্ট্যান্স সে সময় হয়েছিল। আর সে ওখানে কানাডায় বলল যে, কোনো মুসলমান এটা অপোজ করেনি। আপনি ফোন করেন তো তাকে।’ উনি আর ফোন করেননি তাকে।

কমিউনাল দিক থেকে?
চরম কমিউনাল। আন্দোলন যখন হচ্ছে, তখন শহীদ মিনারে মিটিং হয়েছিল একটা। বেশি সময় ছিল না। আমি তিন মিনিটের একটা বক্তব্য দিয়েছিলাম। আমার আগে সিআর দত্ত কমিউনাল বক্তব্য দিয়েছিল। ওই তিন মিনিটে আমি তাকে একবারে পেড়ে ফেলা যাকে বলে, ছিঁড়ে ফেলেছি। আব্দুল মতিন খান বলে একজন আছেন। একসময় লেখক শিবিরের সভাপতি ছিলেন। উনি আমাকে বললেন, ‘সর্বনাশ! তিন মিনিটের বক্তৃতা শেষ করলেন এভাবে?’

আপনি শাহরিয়ার কবিরের কথা বলছিলেন। উনি তো আপনার স্নেহধন্য ছিলেন। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি।
স্নেহধন্য মানে একসময় স্নেহ করতাম। কিন্তু ‘আই হেট হিম। আই হেট হিম ফ্রম দ্য বটম অব মাই হার্ট’। স্নেহ থেকে ঘৃণা কীভাবে আসে আমি বলি। ছেচল্লিশে লন্ডনে একটা কনফারেন্স চলছিল। জিন্নাহ সাহেব এয়ারপোর্টে যখন নেমেছেন কোনো কোনো সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘মি. জিন্নাহ, ইউ আর ওয়ানস ইন দ্য কংগ্রেস, হোয়াই ডিড ইউ লিভ ইট?’ জিন্নাহ সাহেব বললেন, ‘আই অলসো হ্যাভ... বাট আই হ্যাভ টু লিভ ইট।’ তো একজন লোকের সাথে পরিচয়, আলাপ, কাজকর্ম ইত্যাদি ছিল। স্নেহ করতাম। আমার সাথে যারা কাজ করে, আমি সবাইকেই স্নেহ করি, ভালোবাসি। তো সে একসময় ওইরকম ছিল। আমার কাছে আসতো। প্রত্যেকদিন অফিসে যাওয়ার আগে শান্তিনগর আমার বাড়ি হয়ে যেত। সে সেসময় খুব ভালো কাজ করেছিল। আমার অভ্যাস এরকম না যে, একজন খারাপ হয়ে গেছে বলে আগে ভালো কাজ করেনি, তা বলব। আমি আমার এই ‘ইমার্জেন্স অব বাংলাদেশ’-এ শেখ মুজিবকে যা তাঁর ডিউ, সব দিয়েছি। তখন সে (শাহরিয়ার কবির) ভালো কাজ করত। তার সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল। তারপরে ঊনআশি-আশিতে এসে তার মধ্যে কেন এই পরিবর্তন এলো আমার নিজের একটা ব্যাখ্যা আছে তার ব্যাপারে। সে ইউটার্ন নিলো। সে আমাদের পার্টির অসংখ্য ক্ষতি করেছিল। কৃষক ফেডারেশনের অর্গানাইজেশনটাকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছিল। তারপর সে অন্য লোকজনদের সাথে, পার্টিতে যারা পরস্পর বিরোধী ছিল, তারাও সবাই আমার বিরুদ্ধে একাত্ম হয়ে গেল। এটা আমি ‘আমার জীবন’ পঞ্চম খণ্ডে ভালোভাবে লিখব। তবু সে মাঝে সাঝে ফোন-টোন করে, আসে। বাড়িতে সে আসতে পারে। কিছুদিনে আগেও এসেছিল।

একটা সময় তিনি ‘ওদের জানিয়ে দাও’ বা ‘বাঁশবনে ঝড়’-এর মতো বই লিখেছিলেন...
‘ওদের জানিয়ে দাও’ যখন লিখেছিল তখন আমার সাথে তার কোনো পরিচয় ছিল না।

জামাতবিরোধী জাহানারা ইমামের আন্দোলনে কি আপনারা একসাথে ছিলেন?
এটা তো আমরাই আরম্ভ করেছিলাম। তখন তো একসাথেই ছিলাম। কিন্তু বাই দ্যাট টাইম সে তো আওয়ামী লীগের লোক হয়ে গেছে। তাদের চেষ্টা ছিল আমি যাতে কোনো ভূমিকা পালন করতে না পারি। তারা জাহানারা ইমামকেও ইনফ্লুয়েন্স করেছিল। জাহানারা ইমামের সঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক ছিল না। বাই দ্যাট টাইম আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিজামীর একটা বৈঠক হয়েছিল ইলেকশনের ব্যাপারে। তারা জামায়াতে ইসলামীর সাহায্যেই তো মেজরিটি পেয়েছিল। ওই বৈঠকের ছবি ইত্তেফাক ছাপল। জাহানারা ইমাম সেসময় আমাকে ফোনে বলেছেন, ‘জানেন, আওয়ামী লীগ যদি এরপরে ক্ষমতায় আসে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও আমাদেরকে এ আন্দোলন করতে হবে।’ বললাম, ‘আমি এটা আপনাকে অনেকবার বলেছি।’ কিন্তু ওরা করতেন কি! আমাকে তাঁরা দাঁড়াতে দিতেন না, তারমধ্যে জাহানারা ইমাম নিজেও ছিলেন। আমাকে বেশিক্ষণ বক্তৃতা করতে দিতো না। দুই মিনিট, তিন মিনিট, চার মিনিট পরেই আমাকে ডিস্টার্ব করতো। অথচ অন্য লোকরা, আমার ভাগ্নে হাসান ইমাম, যে কোনো রাজনীতি করছিল না, উত্তর গেটে যেখানে মিটিং হচ্ছিল, সেখানে তাকে দাঁড় করিয়ে হাফ অ্যান আওয়ার বক্তৃতা করতে দিলো। অথচ যখন আমি বক্তৃতা করছি, তখন তিন মিনিটের মাথায় একজন বলছে, আপনাকে শেষ করতে বলেছে। পায়ে চিমটি কাটছে। আমি শেষ করে দিলাম। মায়াকে বললাম, ‘তুমি কি আমাকে পিছনে ট্যাগ করছিলে নাকি?’ বলে, ‘হ্যাঁ।’ ‘কেন?’ কিছু বলল না। তারপর ইঞ্জিনিয়ার’স ইনস্টিটিউটের সামনে আরেক মিটিংয়ে- হাসিনার সাথে একমাত্র মিটিং- যেখানে একটা বিরাট মঞ্চ তৈরি করে আমরা সেখানে বসে আছি। জাহানারা ইমামও ওখানে আছেন। মায়া বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।’ আমি বলি, ‘আপনার কথা বলতে হবে না। আমি তিন মিনিটের বেশি বলব না। আপনাকে ওই কথা আর বলতে হবে না।’ এই যে আমাকে বিগত দিনগুলোতে বলতে দিতো না, তার কারণ  আমি বলতাম, শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কিংবা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে কথা বললেই হবে না। দেশে যে সমস্যা রয়েছে, সে সমস্যা সম্পর্কেও কথা বলতে হবে। দেশে কারা এ সমস্যা তৈরি করেছে? কারা কী করেছে? এখানে ধর্মকে কীভাবে ব্যবহার করেছে? এসব কথা। আজকে জনগণের কাছে, যারা মজুরি করে তাদের মধ্যে এটা নিয়ে যেতে হবে। এসব কথা বললে তাদের গায়ে লাগতো। ওনারা তো খালি ‘জামায়াতে ইসলামী’ ‘জামায়াতে ইসলামী’ করতেন।

এখানে আপনি যে ব্যাপারটা প্রায়ই বলেন, আমরাও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে দেখি, আমাদের দেশে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা আছে। দেখা যায় যে, আপনি যে বইগুলো প্রথম দিকে লিখেছেন- ‘সংস্কৃতি’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’ তারপর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও রাজনীতি এসব নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা বা সমৃদ্ধ কোনো বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি দেখাই যায় না। এখানে বুদ্ধিজীবী নামে অনেক লোকজন আছেন। অনেক রকম পুরস্কার পেয়ে, অনেক সংস্থার প্রধান হয়ে আছেন অনেকেই। তাদের মধ্যেও এরকম গুরুগম্ভীর আলোচনা দেখা যায় না। এ বিষয়টা সম্পর্কে যদি বলেন।
এই বিষয়টা খুব সহজ। বিষয়টা হচ্ছে- দে বিলং টু ওয়ান ক্লাস, আই বিলং টু অ্যানাদার ক্লাস। তাদের সেই অনেস্টি নেই। তাদের তো প্রথমে রাগ হচ্ছে যে, আমি কেন এসব কাজ করছি। আমার একজন বন্ধু, আমি নাম বলতে চাই না যে, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি করত। তার একটা রাগ ছিল যে, কেন আমি ভাষা আন্দোলনের ওপর বই লিখলাম। আমি তাকে ইন্টারভিউর কথা বলেছিলাম। সে আমাকে কোনো সহযোগিতা করেনি। এরকম অনেকেই আছে। কারণ লেখার মধ্যে তো একটা এক্সপোজার হয়। এক্সপোজারের একটা দাম আছে।
তারা আমাকে বলে, আমার কাছে যে লোকজন আসে, আমাকে নাকি তারা ভয় করে। অথচ আমি কারও সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করি না। কাউকে মাঝে মাঝে ধমক দিতে পারি কোনো কালে। সেটার অধিকার আমার আছে। যেহেতু আমি কাজ করছি এখানে। আমি কাউকে হয়তো ধমক দিলাম কোনো সময়, সে কিন্তু অন্য ব্যবহারটা মনে রাখল না, ধমকটাই মনে রাখল। আমাকে নাকি ভয় করে সবাই! বাইরে যে পিএইচডি করা লোকজন- ইন্ডিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা থেকে আসা লোকজন- তাঁরাও এসে আমাকে বলে যে, ‘আমি শুনেছিলাম, আপনার অনেক রাগ আছে, কিন্তু কথাবার্তা বলে তো সেরকম মনে হলো না।’ এটা আমার নামে একটা প্রপাগান্ডা।
ভাষা আন্দোলনের বইয়ের ওপরেও সেরকম কোনো আলোচনা হলো না। ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম খণ্ড যখন বের হলো, তখন ড. ইউনূসের ভাই মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর কাজ করতো তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তানে। আমাকে বলল, ‘আপনি বইটা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দিলে উনি একটা আলোচনা করে দিবেন। আপনার একটা ছবি দরকার।’ আমি বললাম, ‘আমার ছবি দরকার নেই, বইয়ের ছবি দাও।’ বইয়ের ছবি দিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমালোচনা ঠিক না, কিন্তু একটা বেশ সুন্দর বক্তব্য দিলেন। এখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে বললে সে আর তা করবে না। কিন্তু তখন সেটা করেছিল। কোনো একটা বইয়ের মধ্যে লিখেছিল। এরপরে আরেকটা ছেলে সাতক্ষীরার। তার নামটা আনফরচুনেটলি আমার মনে পড়ছে না। আমার মনে হয় আশির দিকে কোনো সময় হবে। সে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিল বিচিত্রায়। শাহরিয়ার কবির তখন ছিল বিচিত্রায়। শাহরিয়ার কবির বা শাহাদাৎ চৌধুরী ছিল। যা-ই হোক, যদিও শাহরিয়ার কবিরের সাথে তখন আমার আর সম্পর্ক ছিল না। ওরা লেখাটা ছেপেছিল। সেটার নাম ছিল ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের স্থপতি বদরুদ্দীন উমর’। আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আরম্ভ করে...। আমার মনে হয় সেটাই বোধ হয় লাস্ট।
অনেকদিন তো বাংলা একাডেমি যাইনি। বাংলা একাডেমি থেকে আমি বেরিয়ে আসছি, দেখছি ওইদিক থেকে আসছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আর জাফর বলে একজন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, বেঁটে মতো, বাংলা ডিপার্টমেন্টের লেকচারার। আবু জাফর না। সে বোধ হয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ট্যান্ডেল টাইপের ছিল। আমার সাথে দেখা হতেই একটা প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করে হাসছে। বলছে, ‘নবাব আব্দুল জব্বার লিখেছিল...।’ আমি বলি, নবাব আব্দুল জব্বার, কোনো রাজা বা কিছু ছিলেন নাকি? একসময় ইংরেজরা কিছু হলেই তো ‘নবাব’ টাইটেল দিতো। তিনি একসময় ভুপালের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই লেখাটা সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠাট্টা করছে আর বলছে, ‘কী লিখেছে এই লোক!’ এমনভাবে হাসছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যে হাসি তাঁর থামছেই না। একবার আমার মনে হলো জিজ্ঞেস করব যে, সিদ্ধিটিদ্ধি কিছু খেয়ে আসছে কিনা! আমি বললাম যে, আমার ওপর একটা প্রবন্ধ লিখেছে, এত হাসাহাসির কি আছে? এতো হাসির তো কিছু নেই। নবাব আব্দুল জব্বার একজন ইম্পর্ট্যান্ট লোক ছিলেন। যখন সাউথ আফ্রিকায় র‌্যাসিয়াল ওয়ার হচ্ছিল, তখন কলকাতা টাউন হলে সেটার প্রতিবাদে মিটিং হয়েছে। হি ওয়াজ প্রিজাইডিং দ্য মিটিং। রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা করেছেন সেখানে। নবাব টবাব তো কাগুজে নবাব, সবাই তা জানে। উনি তো আর অযোধ্যার নবাব ছিলেন না। সে সময় নবাব আব্দুল লতিফ ছিলেন। এরা তো সমাজের নেতা ছিলেন। তা নিয়ে সে (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) ঠাট্টা মশকরা করছে।

এটা কি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট?
হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি আপনাকে আরেকবার বলি। মারুফ রায়হান ‘কবিতা’ বলে একটা পত্রিকা বের করতো। তাতে মঞ্জু সরকার আমার একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ ছেপেছিল। ভালো ইন্টারভিউ। তাতে অনেকগুলো ছবিটবি দিয়েছিলাম। সে সময় আমাকে দাওয়াত করলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির সমাজ বিজ্ঞানের প্রফেসর বদরুদ্দোজা সাহেব। পরে তিনি ইউনেস্কোয় চাকরি করতেন। তিনি ড. মোশারফ হোসেনের বেয়াইও হন। সেখানে গেলাম। অধ্যাপক রাজ্জাক সাহেব ছিলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ছেলে রাশেদসহ আরও দুই তিনজন ছিলেন। আনিসুজ্জামানও ছিল। আনিসুজ্জামান আমার একজন বন্ধুর মতো। সে ঢুকেই আমাকে বলল, ‘কবিতায় মঞ্জু সরকারের করা আপনার ইন্টারভিউটা দেখলাম। ওটাতে আপনার ছবি ছাড়া তো আর দেখার কিছুই নেই।’ আমার কতগুলো সুন্দর সুন্দর ছবি উঠেছিল। আমি পরে মঞ্জু সরকারকে বললাম, ‘কি ইন্টারভিউ নিলেন আপনি যে, আনিস এরকম বলল?’ ও বলল, ‘আর বলবেন না! এসব ঈর্ষা ছাড়া কিছু না।’ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনই যে, আমার সম্পর্কে কিছু লিখবে না, বলবে না। এই যে আমার বই ‘ভাষা আন্দোলন’, এতে জিনিস আছে অনেক, এটা কোথায় পাবে তারা। আমি পড়েই বুঝতে পারি, এখান থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু কোনো রেফারেন্স নেই, কোনো উদ্ধৃতি নেই, কিছু নেই। কাজেই এখানে যে পুরো হোস্টাইলিটি- এখানে আমার একটা অবস্থান অবশ্যই আছে। যেসব ছাত্র বই পড়ে, যাদের কোনো আর্টিকুলেশন নেই, সেই একটা সার্কেলে কিন্তু আমার বইপত্র পড়ে। যারা ওপরতলার তাদের কাছে দেখা যাবে যে, আমার সম্বন্ধে কোনো লেখা বা কথা কোনো জায়গায় নেই।
হাসান আজিজুল হক আমার ছাত্র। এমনি দেখা হলে আমার সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে। আমাকে বলে, আপনি ছাড়া তো আমার কোনো শিক্ষক নেই। অথচ একটা লাইন কোনোদিন আমায় নিয়ে লেখেনি। আমার আত্মজীবনী যখন একেকটা খণ্ড করে বেরুচ্ছিল, তখন সে বলে যে, এক্সট্রা-অর্ডিনারি জিনিস সব। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর আত্মজীবনীর ওপর সে লিখেছে। কিন্তু আমার আত্মজীবনী সে স্পর্শ করেনি। কেউ আমাকে কোনো একটা বইয়ের ভেতরে, কোনো আলোচনায় রাখেনি। একটা লোক ধরেন আশি-নব্বইটি বই লিখেছে। একটা বইয়েরও কোনো রিভিউ নেই। একটা বই একবার বোধ হয় আবুল হাসনাত সাহেব রিভিউ করেছিলেন, আমার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডের। এতো বই লিখেছি আমি। সামাজের এমন কোনো অ্যাসপেক্ট নেই, যা আমি চিন্তা করি নেই, লিখি নেই। কোনো জায়গায় কোনো রিভিউ নেই, কোনো রেফারেন্স নেই। এখান থেকে সমানে মেরে দিচ্ছে (কপি করা)। এখনও আমার মনে পড়ে যে, রবীন্দ্রনাথের ক্যামেলিয়া বলে একটা কবিতা আছে, সেখানে একদম শেষের দিকে, যখন সে বিহারে বেড়াতে গেছে, হাওয়া বদলে গেছে, সেখানে মাঠে বসে মেয়েটা তার প্রেমিকের সাথে কথা বলছে এবং ছেলেটার দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না। সেখানে রবীন্দ্রনাথ কবিতার মধ্যে বলছেন, মেয়েটি যে আমাকে চিনেছে এটা বুঝলাম, সে আমাকে লক্ষ করে না বলে। (সহাস্যে) তো, এখানে এই হচ্ছে অবস্থা। যে মেরে দিচ্ছে আমার লেখা থেকে, সে কিন্তু আমার লেখা নিয়ে কোনোরকম কথাও বলছে না। এ লোকগুলোকে কোনো জায়গায় আমাকে নিয়ে কিছু লিখতে দেখবেন না!
অন্যদিকে ইন্ডিয়ায় আমার বইয়ের অনেক রিভিউ হয়েছে। কাজী আব্দুল ওদুদের মতো লোক ‘সাম্প্রদায়িকতা’র ওউপর দীর্ঘ রিভিউ করেছিলেন। মৈত্রেয়ী দেবী, আবু সায়ীদ আইয়ুব, নারায়ণ চৌধুরী, অন্নদা শংকর রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, ড. অশোক মিত্র, হীরেন মুখার্জী, এ লেভেলের লোকেরা আমার বইয়ের ওপর আলোচনা করেছেন। এখানে ওই লেভেলের লোকই তো পাওয়া মুশকিল। কিন্তু একজনও এরকম কাজ করবে না।

আপনার মধ্যে দুটো সত্তা। একটা হলো রাজনীতিবিদ সত্তা, অন্যটি গবেষক-লেখক সত্তা।
রাজনীতিবিদ আর লেখক-গবেষক দুটো সত্তা নাকি? এটা একটাই সত্তা। আমি পরিষ্কার লিখেছি যে, আমি যা কিছু লিখি, রাজনীতিবিদ হিসেবেই লিখি।

কিন্তু বাইরে থেকে আমরা যেভাবে দেখি, আমি সেটা বলছি।
না, এভাবে দেখাটা তো ঠিক না। সেটাই তো ভুল।

আপনি কি মনে করেন? কেউ যদি আপনাকে রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখে, আবার আপনার মাঝে লেখক সত্তাও আছে- দুটোই খুব শক্তিশালী। দুটোতেই আপনি ইম্পর্ট্যান্ট। লেখক হিসেবে যে যা-ই বলুক, আলোচনা না হলেও আপনি বাংলাদেশে অন্যতম একজন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন, এটায় আপনি সফল। কিন্তু রাজনীতিবিদ হিসেবে তো মনে হয় আপনি সফল না।
প্রথম কথা হচ্ছে, আমার লেখক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে যে পরিচিতি, এটা পশ্চিম বাংলায় ব্যাপক। পশ্চিম বাংলায় তো আমাকে চেনে না এরকম লেফট মহলে কেউ নেই।

সেখানে চেনে। বাংলাদেশেও চেনে।
না চেনে না। বাংলাদেশে চেনে, কিন্তু রিকগনাইজ করে না। ওখানে চেনে এবং রিকগনাইজ করে।

রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার যে সত্তা...
আমার ফেইলিওরের কথা বলছিলাম। আমি মনে করি না যে, এটা আমার ফেইলিওর। কারণ আমি যদি সর্বাত্মক চেষ্টা না করতাম তাহলে আমি বুঝতাম যে, আমি ফেইলিওর। যেহেতু আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি, ফেইলিওরটা এক হিসেবে যে, রেজাল্ট সেভাবে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ফেইলিওর এই হিসাবে নয় যে, আমি কোনো চেষ্টা করিনি। আমি চেষ্টা করেছি। শরিফ সাহেব মাঝে মাঝে বলতেন আমার জন্যে, ‘ও খুব চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।’ এটা বলে মনে একটা আনন্দ পেতেন আর কি! চেষ্টা করছি যে, এটা উনি স্বীকার করতেন। এখন দেশের যে অবস্থা। আনফরচুনেটলি আমি যে সময় রাজনীতি আরম্ভ করেছি, সে সময় লেফট পলিটিক্স ধ্বসে গেছে। সমস্ত অর্গানাইজেশন ভেঙে গেছে। এখানে একটা ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ফ্যাসিস্ট শাসনটা ক্রিমিনাল বিজনেস অ্যান্ড কমার্শিয়াল ক্লাসের ওপরে তৈরি হয়েছে। এটা একটা দিক। তারপরে দ্বিতীয়টা হচ্ছে- বাংলাদেশ হওয়ার পরে এখানে যে অপরচুনিটি ওপেন হয়েছে, এটা তো আমি লিখেছি একটা বইয়ে- কেন এ জিনিসটা হলো। আমি কেন, লেনিন থাকলেও এটা হতো। লেনিনেরও ক্ষমতা ছিল না এখানে ওই পরিস্থিতিতে কাজ করার। লেনিন তো ম্যাজিক করতে পারত না। একটা অবজেকটিভ সিচুয়েশন আছে তো! এই সিচুয়েশনে শুধু আমাকে বলছেন কেন, এখানে বাংলাদেশ আমলে কোনো প্রগ্রেসিভ স্টুডেন্ট মুভমেন্ট হয়েছে সে রকম? আশির দিকে খালি এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। তাছাড়া ছাত্র আন্দোলন বলেনÑ কিছু ছোট ছোট অর্গানাইজেশন এখন করছে। কিছু কিছু আন্দোলন করছে। এখানে কোনো বড় ছাত্র আন্দোলন দেখেছেন? এখানে কোনো বড় লেবার মুভমেন্ট দেখেছেন?

হচ্ছে না কেন?
সেটাই তো বলছি আমি। এটা হলো না কেন? আমার দাদো আবুল কাসেম সাহেব নাইন্টিন ফাইভে (১৯০৫ সাল) যে পার্টিশন (বঙ্গভঙ্গ), সেটা তিনি অপোজ করেছিলেন। আমার গ্র্যান্ডফাদার মুসলমানদের মধ্যে লিডিং লোক ছিলেন। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীসহ আরও অনেকেই ছিলেন। এখন আমি কিন্তু মনে করি, নাইন্টিন ফাইভে পার্টিশনটা যদি থেকে যেত, তাহলে ভারতও ভাগ হতো না এবং এখানে লোকজনের যে অবস্থা হয়েছিল, সেটা হতো না। তার কারণ, আলাদা প্রভিন্স হিসেবে ইংরেজ আমলে একটা মিডল ক্লাসের গ্রোথ হয়েছিল। যে গ্রোথটা শুরু হয়েছিল বলেই হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে লেগে গেল, তারা বাংলা পার্টিশন করতে চাইত না। এই যে মুসলমান মিডল ক্লাসটা নাইন্টিন ফাইভ থেকে ফোর্টিসেভেন পর্যন্ত ইংরেজ আমলে যদি ধীরে ধীরে গ্রো করত তাহলে এখানে একটা ভালো অবস্থানে আসত। সেটা তো হলো না।
নাইন্টিন ফর্টিসেভেনে এসে পার্টিশন হলো। তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা যতই নির্যাতন করুক আর যাই করুক, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ফর্টিসেভেনের আগে যে অবস্থা ছিল, তার থেকে তো ভালো অবস্থানে ছিল। এখানে অনেক উন্নত চিন্তা দেখা গিয়েছিল। মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। এখানে ওই সময়েও একটা মিডল ক্লাসের গ্রোথ হয়েছিল। নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ানে এসে হঠাৎ করে এমন অপরচুনিটি বাঙালিদের সামনে চলে এল যে, এটা অচিন্তনীয় ছিল। কিন্তু এ সুযোগ চলে এল তাদের সামনে। মানে আকাশ পেয়ে গেল তারা সম্পূর্ণ। এটার একটা মারাত্মক পরিণতি কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মোচন হলো। এতো সুযোগ-সুবিধা সামনে। তার ওপর রিপ্রেশন। যেখানে একদিকে সুযোগ সুবিধা রয়েছে, আরেক দিকে রিপ্রেশন রয়েছে। কেউ তো আর ওই চিন্তা করবে না। সেখানে দেখা গেল সত্তরের দশকটা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের যুগ। তারপরে এখনও পর্যন্ত এই বাংলাদেশিদের জন্যই যে অপরচুনিটি, সেই অপরচুনিটিÑ চুরির অপরচুনিটি বলুন, ব্যবসা-বাণিজ্য বলুন, চাকরি বলুন সবকিছুই। যারা কোনোদিন কলকাতাও যায়নি একাত্তর সালের আগে, বাংলাদেশ হওয়ার পরে দেখেন লুটপাট করে এমন অবস্থা হয়ে গেল, তারা কথায় কথায় বাইরে চলে যাচ্ছে। আর অনেক দিনের জন্য যাচ্ছে- পড়তে যাচ্ছে বা অন্য কোনো কারণে যাচ্ছে, ব্যবসার জন্য যাচ্ছে, বা বেড়াতেও যাচ্ছে। সাত দিনের জন্য ঘুরে আসছে আমেরিকা থেকে, ইংল্যান্ড থেকে। আগে তা অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। সেসময় আমাকে একজন বলেছিলেন, চট্টগ্রামে একটা দোকানে এক মহিলা গেছেন সেখানে থেকে একটা ফ্রেঞ্চ পারফিউম কিনতে। দাম কত? বলছে, ১২০০ টাকা। কুছ পরোয়া নেই। ১২০০ টাকা দিয়ে ফ্রেঞ্চ পারফিউম কিনে নিল। এই যে অবস্থাটা- সমস্ত সমাজে অপরচুনিটি ছেয়ে গেছে। ইট কমপ্লিটলি ডেস্ট্রয়েডÑ যাকে দেশাত্মবোধ বলেন বা সামাজিক যে সচেতনতা আমাদের চিন্তার- এটা শেষ করে দিলো। অথর্ব করে দিলো। আগে, ধরেন ব্রিটিশ আমলে, এমন কি পাকিস্তান আমলেও আমার বন্ধুরা একভাবে তো কমিউনিস্ট পার্টির সাথেই যুক্ত ছিল। হাসান হাফিজুর রহমান, আনিসুজ্জামান এখন যা-ই হোক; আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলনের সময় ভালো কাজ করেছিল। যা অস্বীকার করা যাবে না। ঠিক হবে না অস্বীকার করা। তারপর ধরেন এনায়েতউল্লাহ খান, ওবায়দুল্লাহসহ অন্যরা; প্রোগ্রেসিভ ছেলেরা তো ছিল কমিউনিস্ট মুভমেন্টের সাথে। ভালো ছাত্র ছিল তারা। এখন একটা করে ভালো ছাত্রকে আপনি যদি বলেন রাজনীতিতে আসতে, আসবে কি? না, সে চিন্তা করবে- ভালো চাকরি করবে, বড় লোকের মেয়ে বিয়ে করবে, সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবে, সে দেশের বাইরে পড়বে। এই তো অবস্থা। আমাকে অনেকে বলে, ‘আপনি তো অ্যাট্রাক্ট করতে পারলেন না লোককে।’ আমি বলি,  এটা সায়েন্টিফিক ব্যাপার। অ্যাট্রাকশন ইজ আ বোথ ওয়ে ম্যাটার। লোহা কাঠকে অ্যাট্রাক্ট করতে পারবে না। ম্যাগনেট কাঠকে অ্যাট্রাক্ট করতে পারবে না। সমাজের অবস্থান যদি কাষ্ঠের মতো হয়, তাহলে আমরা যে কথা বলছি, এটা লেনিনও যদি বলতেন, কেউ শুনত না। কে শুনবে এই কথা? কাজেই সমাজের অবজেক্টিভ যে অবস্থা, শুধু একজন কি বলছে বা করছে, এটা দিয়ে বিচার করলে হবে না। যে পরিস্থিতিতে, যে সামাজিক অবস্থায় এটা হচ্ছে, সেটা আপনাকে বিচার করতে হবে। অ্যানালাইসিস করতে হবে, রিসার্চ করতে হবে। আমি সেদিন লিখেছিলাম কোন কাগজে যেন, এখানে যে রাইজ হলো, এ রাইজ কেন হলো, ব্যাখ্যা করতে হবে না? বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, ২৪ বছর পাকিস্তানে এটার বিরুদ্ধে লড়াই করলাম আমরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তার জায়গায় এখানে পাকিস্তানের থেকে বাজে অবস্থা সামনে এল। পাকিস্তানের ব্যাটারা যেসব জিনিস সাহসই করত না, এখন তো সেসব জিনিসে ছেয়ে গেছে একদম। চরম একটা অবস্থা। এটা কেন হলো? এটার ব্যাখ্যা করতে হবে না? এটার ব্যাখ্যা হচ্ছে- আওয়ামী লীগাররা বলছে, এটা পাকিস্তানিরা করেছে। আমি লিখেছি, পাকিস্তানিরা যখন এখানে ছিল, তখন তাদেরকে এখান থেকে আমরা তাড়িয়ে দিলাম লড়াই করে। তারা লেজ গুটিয়ে পালাল। সারেন্ডার করল। তখন তারা ছিল জমিনের ওপর। এখন হাজার মাইল দূর থেকে বাংলাদেশের জনগণকে এভাবে বিভ্রান্ত করে পাকিস্তানিরা যদি এ জিনিসটা তৈরি করতে পারে, তাহলে যারা একথা বলছে তাদের উচিত পাকিস্তানিদের সালাম করা। কুর্নিশ করা। এই যে অ্যাবসার্ড কথা তারা বলছে, এখানে কেন এটা হয়েছে, এর কোনো অ্যানালাইসিস আমি ছাড়া কেউ করেছে? কেন এটা হয়েছে? কেন এই ঘটনা ঘটেছে? রুলিং ক্লাসের ক্যারেক্টারটা কী? কীভাবে এ দেশ শাসিত হলো? শোষিত হলো? এ ফ্যাসিজম কি এখানে হওয়ার কথা ছিল, যে ফ্যাসিজম এখানে হচ্ছে?

সাতচল্লিশে যে পশ্চিমবঙ্গকে রেখে আসা হয়েছে, ধরা হয় পরবর্তীকালে তাদের মননশীলতার বিকাশ আমাদের চেয়ে বেটার ছিল। এটা সাধারণ মানের ধারণা। সেখানে আজকে যদি ধরি, সিপিএমের অবস্থা হলো থার্ড। পশ্চিমবঙ্গের এ অবস্থাটা আপনি কীভাবে দেখেন? ওইখানের সমস্যা কী?
ওটা তো আলাদা। এটা নিয়ে আমি আলাদা একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। ‘সংস্কৃতি’তে ‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন’ বলে একটা লেখা আছে।
চৌত্রিশ বছর তারা (সিপিএম) ‘বদমায়েশি’ করেছে। মুসলমান ভোটে হেরেছে তারা। সিপিএম হেরেছে মুসলমানদের ‘না’ ভোট দেয়ার জন্যে। পশ্চিম বাংলায় ৩০ শতাংশ মুসলমান। মমতা ব্যানার্জী জিতেছে ওই মুসলমানদের ভোটে। মুসলমানরা কংগ্রেসকে ভোট দেয়নি, সিপিএমকেও ভোট দেয়নি। কংগ্রেস ১৯৪৭-এর সাল থেকে পশ্চিম বাংলার মুসলমানদের মার্জিনালাইজ করে ফেলেছে। সাচার রিপোর্টে বলেছে এদের অবস্থা দলিতদের চেয়েও খারাপ। চৌত্রিশ বছর সিপিএম শাসন করার ফলে সেখানে মুসলমান পপুলেশন হয়েছে ৩০ শতাংশ আর এমপ্লয়মেন্ট ২ শতাংশেরও নিচে। এখন ২ শতাংশ হয়েছে বোধ হয়। আমি একবার জ্যোতি বসুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, এটা কেন হয়েছে? জ্যোতি বসুর কথা হচ্ছে- মুসলমানরা পারে না। আমি বললাম, তাই নাকি? মুসলমানরা দারোয়ানের চাকরি পায় না, প্রাইমারি স্কুলে, মাধ্যমিক স্কুলে পায় না কেরানীর চাকরি পায় না। কম্পিটিশনে যদি না পারে, তাহলে ইস্ট বেঙ্গলে পারছে কী করে তারা? ওরা চোর, বদমায়েশ, দুর্নীতিবাজ সব কিছুতে আছে। কিন্তু তারা তো লেখাপড়া করছে, তারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সবকিছু তারা করছে। এটা কি করে তারা করছে? তাহলে জিন্নাহ সাহেবই কারেক্ট ছিলেন। তাহলে তাদের ব্যাকওয়ার্ডনেসের জন্য রিজার্ভেশন করুন। উনি জানেন যে, ওটা কমিউনাল হবে। উনি মুসলমানদের চাকরি দিচ্ছেন না, সেটা কমিউনাল না। কিন্তু রিজার্ভেশন চাইলে সেটা হচ্ছে কমিউনাল। এই যে চৌত্রিশ বছরে কংগ্রেসের সময়ে অবস্থা যা ছিল, তা থেকে এক পিনও সিপিএম নেতারা পরিবর্তন করেনি। আর মুসলমানরাও যেহেতু কমিউনিস্টদের ভোট দিত, সিপিএমকে ভোট দিত। সিঙ্গুরে যে কাজ করেছে, নন্দীগ্রামে যে কাজ করেছে, সেটা হচ্ছে অ্যান্টি-কৃষক ঘটনা, আর ওই দুই জায়গায় মুসলমান ভোটার বেশি। মুসলমানদের জন্য কিছুই করেনি। এখন মমতা ব্যানার্জী ধাপ্পা দিয়ে ওখানে অনেক কিছু করেছে। সে জানে, কোন সুর উঠলে মুসলমান ভোট আসবে। সেজন্য আসলে মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষারও তেমন কোনো উন্নতি করেনি। যেটা করেছে, মাদ্রাসায় টাকা দিয়েছে। যাতে মুসলমানরা শিক্ষিত হয়ে কিছু না করতে পারে। মসজিদের ইমামের ভাতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিপিআই, সিপিএম, বামফ্রন্ট- এখানে আমাদের দেশের বন্ধু সংগঠন হলো সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি। তাদের রাজনীতি তো আপনি দেখেছেন। আপনার জীবদ্দশায় দীর্ঘ সময় ধরে তাদের রাজনীতি আপনি দেখেছেন, কমব্যাট করেছেন, তাদের রাজনীতির পাশে নিজেও রাজনীতি করেছেন। এ রাজনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
মূল্যায়ন হচ্ছে- এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির ধারে কাছেও নেই। এগুলো শুধু কমিউনিজমের সর্বনাশ করেছে। আর সিপিবির কথা যদি বলি, আগে থেকেই তো তাদের এ অবস্থা। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের লেজুড় ছিল তারা। একাত্তরে আওয়ামী লীগের লেজুড় হিসেবেই থেকেছে। পরে পঁচাত্তর সালে তারা নিজেদের পার্টিকে লিকুইডেট করে বাকশালে যোগ দিয়েছে। পরে জিয়াউর রহমানের সময় সেই বাকশালের গর্ভ থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগ ও সিপিবি হচ্ছে সহোদর ভাই। এ হচ্ছে তার ক্যারেক্টার। আর পিকিংপন্থী যারা, তাদের কোনো সুস্থ চিন্তা করার ক্ষমতা নেই। বাস্তবের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। একাত্তর সালেও বাস্তবের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সিপিবির মধ্যে যেমন একটা ভেস্টেড ইন্টারেস্ট ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, টাকা পয়সা দিত। তাদের (পিকিংপন্থী) মধ্যে চীন কিন্তু এখানে কোনো টাকাপয়সা দিত না। কাজেই সেটা নিয়ে যে এক জায়গায় টাকাপয়সা ভাগাভাগি হচ্ছে, তাই ওই জায়গায় আছি, এমনটাও ছিল না। এখানে যখন মস্কোপন্থী, পিকিংপন্থী ভাগাভাগি হলো, তার পরদিন থেকেই পিকিংপন্থীদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে গেল। একদিকে সুখেন্দু দস্তিদার, তোয়াহা; অন্যদিকে মতিন, আলাউদ্দিন, দেবেন শিকদার ভাগ হয়ে গেল। পরে আবার দেবেন শিকদার, বাশার আর মতিন, আলাউদ্দিন আলাদা হয়ে গেল। পিকিংপন্থীদের মধ্যে তেমন লেখাপড়া জানা লোক ছিল না। আব্দুল হক সাহেব ছিলেন, যিনি ক্যাপিটাল পড়েছিলেন। বলে দিতে পারতেন যে, কোনো জায়গায় কি আছে! আন্ডারস্ট্যান্ডিং বলে কিছু ছিল না। আমাদের মতিন সাহেব তো মহা মূর্খ ছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই। পরে টিপু বিশ্বাস বলেছিল, ওনাকে জেলের মধ্যে এক ইন্ডিয়ান কমিউনিস্ট ছিল তার সাথে, সুব্রত বল। সে ওনার চুল ধরে পিটিয়েছিল। মতিন সাহেব জেলে নাকি ক্যাপিটাল পড়েছিলেন একবার। তারপরে ভালো করে নাকি বুঝতে পারেননি দ্বিতীয়বার ক্যাপিটাল পড়ে আরও গুলিয়ে গেছে মাথা। তো সুব্রত বলকে এ কথা বলাতে সুব্রত বল বলেছিল যে, ওনার ক্যাপিটাল পড়তে যাওয়াই উচিত হয়নি। যারা ছিল তার মধ্যে আলাউদ্দিন সামান্য কিছু লেখাপড়া করতো। তোয়াহা সাহেব ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ পাশ করেছিলেন। আগেকার দিনে তোয়াহা সাহেবের অল্প বয়সে ছিল, যেটা বোঝার চিন্তা আছে। পরেরদিকে তোয়াহা সাহেব এমন কি একাত্তর সালে পার্টি থেকে যখন লাইনও আলাদা হয়নি, তখন যে কাজ করেছিলেন, আমি সেটার প্রশংসা করেছি। আমি ওরকম লোক না যে, একটা লোক আমার সম্বন্ধে অনেক বাজে কথা বলেছে, আমি তার বিরুদ্ধে অযথা কিছু বলবো। আমাকে সিআইএর এজেন্টও বলেছেন কোনো একসময়। কিন্তু তাঁর যে লেখাপড়া, আন্ডারস্ট্যান্ডিং যাকে বলে, তার ওপর কাউকে দেখিনি। একজনও নেই। একাত্তর সালে আব্দুল হক পার্টিতে দুই নম্বর থিসিস দিয়েছিলেন, যেটা তাঁর লেখা ছিল, তা আলোচনা করতে গিয়ে ধৈর্যসহকারে তাদের বোঝানোটা শুনলাম। ২ নম্বর দলিল শোনার পর (আমি আমার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছি) আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এ দলিল লেখার মতো কোনো উন্মাদ কি আমাদের পার্টিতে আছে? আব্দুল হক সাহেব কথাটা শোনার পর কয়েক সেকেন্ড কিছু ভাবলেন, কিছু বললেন না। বললেন, ‘হ্যাঁ আছে।’ কোনোরকম আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই। রাস্তার লোক যেটা বুঝতে পারছে সেটা তারা বুঝতে পারছে না, আব্দুল হকরা পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত নিজেদের পার্টিকে ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ বলে কীভাবে চিন্তা করতে পারেন? এগুলো কমনসেন্সের অভাব। কাণ্ডজ্ঞানহীন। ব্যাপারটা এমন যে, কমিউনিস্ট মানে হচ্ছে যার কাণ্ডজ্ঞান নেই।

কোথায় দেখেন আশার জায়গা?
আশার জায়গা আছে। মানুষের ওপর একটা বিশ্বাস আছে। মানুষ আজ না হয় কালকে বুঝবে। এখন আমি যদি ছেড়ে দেই কাজটা, তাহলে তো আরও খারাপ হবে। কিছু লেখালেখি, কিছু কাজকর্ম তো হচ্ছেই এখন। হচ্ছে না একদম, তা না। আমি যদি ছেড়ে দিই, আমি না থাকলে যে দুনিয়ায় কিছু হবে না, এরকম তো না। দুনিয়া তো চলবে। দুনিয়ার পরিবর্তন হবেই। দুনিয়ায় অপরিবর্তিত বলে কিছু নেই। কাজেই সেখানে যতটুকু কন্ট্রিবিউশন করা যায়, ততটুকু করছি। ভবিষ্যতে এ অবস্থা চলতে পারে না। এ অবস্থার পরিবর্তন হতেই হবে। মানুষ লড়বে।  

আপনি আশা করেন?
হ্যাঁ। অফকোর্স।

সম্প্রতি সরকার ইতিহাস বিকৃতি করা রোধে একটা আইন করতে যাচ্ছে। এটার মধ্য দিয়ে আমাদের এখানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগের যে ইতিহাস প্রচলিত আছে, তাকেই একমাত্র ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে; সেই সঙ্গে আরও যে অনেক অজানা বিষয় উদ্ঘাটনের সুযোগ ছিল, বা তরুণরা যে নতুন করে চিন্তা করবে সেটার পথ রুদ্ধ হবে। এর মধ্যে দিয়ে কি আমাদের ইতিহাসচর্চাটা ব্যর্থ হয়ে যাবে? আপনি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন, দেখেন বা আলাপচারিতায় বলেন, সেটা তো আইনগতভাবে বাধাপ্রাপ্ত হবে। এ আইনে তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে।
কারাদণ্ড দিক না। কারাদণ্ড দিক।

শুনেছেন কি আইনটির কথা?
হ্যাঁ। আমি লিখেছি তো, এটার বিরুদ্ধে লিখেছিও আমি। কারাদণ্ড দিক।

এ আইন কি ইতিহাসচর্চা বন্ধ করে দেবে না?
আমি লিখেছি যে, সত্যের একটা অভ্যাস হচ্ছে উঁকি মারা। ইংরেজিতে যাকে বলে- ‘ট্রুথ হ্যাজ দ্য হ্যাবিট অব কিপিং আউট।’ সত্য এমন এক জিনিস, যেটাকে কেউ ইচ্ছেমতো ধামাচাপা দিতে পারে, কিন্তু ধামার ভেতরে চাপা থাকে না। আর এখানে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তুমি এটা ইমপোজ করছো। কিন্তু ভারতে যারা ইতিহাস লিখছে, আমেরিকায় লিখছে, বিলেতে যারা লিখছে, তারা কি তোমার ওই ধামার নিচে থাকবে? ইতিহাস এমন কোনো জিনিস না যে, তুমি আইন করে দিলেই আর সেটা হয়ে যাবে। তুমি করতে পারো আইন। তুমি তোমার টেক্সট বুকে শেখ মুজিবকে জাতির পিতা বলতে পারো। কিন্তু তাই বলে ইতিহাসের ক্ষেত্রে এটা পারবে না। যেমন- ইন্ডিয়ার ইতিহাসে কংগ্রেসের যে ভূমিকা ছিল, এখন ইন্ডিয়াতেও ব্যাপকভাবে সেসব সমালোচনা হচ্ছে। পণ্ডিত নেহেরু, গান্ধী। থাকবে না তো ওভাবে কেউ। আর এখানে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিকৃত করছে ইতিহাসকে, ঘটনাকে যেভাবে বিশ্লেষণ করছে- এটা তো একেবারে ধামাচাপা দেয়ার কোনো ব্যাপার নেই। বিদেশে অলরেডি লেখা হয়েছে। আমি যেটা লিখেছি ‘ইমার্জেন্স অব বাংলাদেশ’-এ। এটাকে বলা যেতে পারে ‘দ্য শর্ট হিস্টোরি অব ইস্ট পাকিস্তান’। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত। এরকম বই তো আর লেখা হয়নি। এখানে আমি মেথডোলজি থেকে আরম্ভ করে পুরো ডেভেলপমেন্ট যেভাবে হয়েছে- দীর্ঘদিন রাজনীতি করে দেখেছি, এভাবে ইতিহাস লেখা হয়নি এখানে। আমি যেটা লিখেছি, সেটা অক্সফোর্ড (পাবলিশার) করাচি থেকে বের করেছে। দিল্লি থেকে বের করেছে। এগুলো কি এখানে হাসিনা আইন করে বন্ধ করতে পারবে নাকি?

এটার সূত্র ধরেই বলি, আমাদের এখানে তো এখন ইতিহাসচর্চা বোধ হয় আসলেও মূলধারায় কিছু নেই। আমাদের অনেক ইতিহাসবিদ আছে কিন্তু ইতিহাসচর্চা বলে কিছু নেই। আমাদের ইতিহাসের অধ্যাপক আছেন বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য ইতিহাসচর্চাটা এরকম নেই। ভারতে কিন্তু ইতিহাসবিদদের একটা সমৃদ্ধ...
নিশ্চয়ই। ভারতে তো উচ্চমর্যাদাবোধ সম্পন্ন লোক আছে, যাদের ইন্টেগ্রিটি আছে। এখানে প্রাইজের জন্যে মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। এই যে আপনার ‘মহাকবি’ আছে, কি নাম, নির্মলেন্দু গুণ। হাসিনা এবার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়নি বলে সে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নাকি একটা খুব ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। হাসিনা কোনো সময় তার কি বিক্রি করেছিল, দুই টাকাও তাকে দেয়নি ইত্যাদি। সে ওসব কথা লিখেছিল। তারপর ১০ জনকে দেয়ার কথা প্রাইজ, হাসিনা ১১ জনকে দিয়েছে। তাকে প্রাইজ দিয়েছে। এ লোকটার কোনো ইন্টেগ্রিটি নেই। একজন লেখকের, একজন ইন্টেলেকচুয়ালের ইন্টেগ্রিটি বলে, সততা বলে যে জিনিসটা, আত্মসম্মান বলে যে জিনিস থাকে, ওই লোকের কি সেটা আছে? কিন্তু ইন্ডিয়ায় দেখেন, ৪৫ জন সাহিত্য একাডেমি পাওয়া লোক পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন, তার সাথে টাকা এবং সুদের টাকা পর্যন্ত ফেরত দিয়েছেন। আমি যে বললাম, সারা যোসেফ বলে আমার যে বন্ধু, সে শুধু একা এটা করেনি। ৪৫ জন তাছাড়া সাহিত্য একাডেমি ছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার যা আছে, সেসব নিয়ে প্রায় শ’খানেক লোক প্রতিবাদ জানিয়ে পুরস্কার রিটার্ন করেছে। এটা আপনি এখানে চিন্তা করতে পারবেন? একজনও কি আছে, যে প্রাইজ পেয়ে নিজের পুরস্কার ফেরত দেবে? কতো কিছু হয়ে যাচ্ছে। যে ফ্যাসিজম এখানে হচ্ছে। এ তুলনায় তো ইন্ডিয়ায় অনেক কম হচ্ছে। এখানে যে ফ্যাসিজম হচ্ছে। একটা লোকও কি আছে, যে প্রতিবাদ করবে বা তার পুরস্কার ফেরত দেবে? আর ইন্ডিয়াতে পুরস্কার কিন্তু কোনো তদবির করে পাওয়া যায় না। এখানে পুরস্কার তদবির করে পাওয়া যায়। সেখানে অন্তত এ ইন্টেলেকচুয়াল অনেস্টি লেভেল একটা আছে।

ভারতে ইতিহাসচর্চায় অগ্রণী কয়েকজনের নাম যদি বলতেন। আপনার কাদের গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?
ওখানে এখন প্রত্যেক ইউনিভার্সিটিতেই ইতিহাসচর্চা হচ্ছে, সেখানে অনেক হিস্টোরিয়ানই আছে, নিজেদের মতো লেখে। বড় বড় হিস্টরিয়ান আছে, সাংবাদিকরা আছে, তারা লিখছে।  

ইতিহাসবিদ হিসেবে কয়েকজনের নাম বলবেন কী?
ইতিহাসের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকেই আছে। আমি যেমন ফিলোসফি থেকে পলিটিক্যাল তত্ত্ব লিখি, ইতিহাসের বইও লিখি। এরকম তো অনেকে আছে। সাংবাদিকদের মধ্যে আছে। নামটা আমি এখন মনে করতে পারছি না। তাছাড়া ওখানে বড় বড় ঐতিহাসিক আছে। যে মর্যাদা ও উচ্চতায় রয়েছেন রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব- এ মর্যাদার লোকজন তো এখানে নেই। ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হয়ে বসে আছে অমুক তমুক। এই প্রফেসর, সেই প্রফেসর। কিন্তু তাদের মধ্যে কী আছে? তাদের মানসিক বিকাশও ওরকম নেই। তাদের নিজেদের যে সাবজেক্ট আছে, ওইখানেই তারা ঘুরঘুর করে। তারা কিন্তু সমাজের দিকে তাকায় না। আরেকটা জিনিস হচ্ছে- ইতিহাস লেখতে গেলে পুরো সমাজকে যেরকম দেখতে হয়- আমি যে ইতিহাসটা লিখেছি ‘ইমার্জেন্স অব বাংলাদেশ’ বইয়ে- এখানে পলিটিক্যাল ব্যাপার আছে, ইকোনমিক ব্যাপার আছে, কালচারাল ব্যাপার আছে, এখানে ট্রেড ইউনিয়ন আছে, এখানে দেশের যে অবস্থা আছে, পুরো জিনিসটাকে নিয়ে আমি কিন্তু লিখেছি। রোমিলা থাপারের মধ্যে এটা আছে। এরকম লোক তো নেই এখানে। ওই মর্যাদার হিস্টোরিয়ান নেই। চিন্তা করতে পারে না কেউই। পা চাটারও যোগ্য না।

তিয়াত্তর সালে আপনি বাংলা একাডেমি পদক পেয়েছিলেন। অন্যান্য আরও... ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার রয়েছে।
না, এটা আমি গ্রহণ করিনি। আমাকে দুবার একুশে পদক দিতে চেয়েছিল। একবার এরশাদের সময়, আরেকবার বিএনপির সময়। গ্রহণ করিনি।

এটা গ্রহণ করেননি আদর্শগত অবস্থান নাকি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে?
না আদর্শগত অবস্থান না। আমি বড় কথা এখন বলতে চাই না। যারা প্রাইজ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু নেই। প্রাইজ অনেক লোকই নেয়। আমি আমার যে সমস্ত কাজ করি, সেটা আমি নিজের ভেতরের তাগিদে করি। এবং এর জন্য আমাকে কেউ পুরস্কৃত করবে, এটা আমি পছন্দ করি না ব্যক্তিগতভাবে।  

আমরা যেমন দেখি, নোবেল পুরস্কারের সময় সাহিত্যের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বা একটা মতলব থেকে দেয়া হয়।
সেটা হচ্ছে পরে। রবীন্দ্রনাথকে যখন দিয়েছিল, তখন ওরকম কোনো মতলববাজি ছিল না।

কিন্তু এর মধ্যেও দেখা যায় যে, বর্তমান সময়েও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কোনো কোনো ব্যক্তিকে কিন্তু দেয়া হয়।
দেয়া হয় এক্সেপশন করে এ জন্য যে, যাতে তারা বলতে পারে।

তদবির না করে কোনো পুরস্কার যদি কাউকে দেয়া হয় আমাদের এখানে, সেটা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা আছে?
না না, তদবির করার কথা না। আমি তো প্রথমে আমার অ্যাটিচিউডটা বলেছি। তদবিরের কথা না। আমি একটা ভেতরের তাগিদ থেকে কাজ করি। এ কাজের জন্য আমাকে কেউ পুরস্কৃত করবে, এটা আমার ভালো লাগে না। সেজন্য আমি নিই না। অন্য লোকে প্রাইজ নিচ্ছে, নিতেই পারে। তবে যেভাবে কবি নির্মলেন্দু গুণ নিয়েছেন, এটা নিন্দনীয়। যদি এসব তদবির টদবির না করে কাউকে যদি প্রাইজ দেয়, আমি তো তার কোনোদিন বিরোধিতা করি না। অনেক বড় বড় লোক। আবার নেয়ওনি। সার্ত্রের মতো লোক প্রাইজ নেয়নি।

২০১৪ সালের ১৮ মার্চ সমকালে আপনার একটা লেখা বেরিয়েছিল। গার্মেন্টসের ওপর। এটার নাম হচ্ছে ‘বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর অঞ্চলে সমাজ পরিবর্তনের ধারা’। সেখানে আপনি একটা কথা বলেছেন যে, বাংলাদেশে গার্মেন্ট সেক্টরে এ নারী নির্যাতন প্রায় শেষ হওয়ার পথে। এরকম একটা কথা লেখার পর অনলাইনে, ফেসবুকে, ব্লগে এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছিল। অনেকে অনেক কথা বলেছিল। তো এটা একটু জানতে চাচ্ছিলাম যে, কী কারণে আপনি এমনটা লিখেছিলেন?
নারী নির্যাতন মানে, আগে যে সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট হতো, এটা তো এখন হয় না। এটাই আমি বলেছি। নারী নির্যাতন একদম উঠে গিয়েছে, এটা বলেছি আমি? একজন লোক, পরিচিত লোক, আমি কী লিখি না লিখি সব তার জানা কথা। সেখানে যদি লোকে মনে করে যে, আমি নারী নির্যাতন শেষ হওয়ার পথে বলতে এটা মনে করি যে, গার্মেন্টওয়ালারা ফেরেশতা হয়ে গেছে, সেটা নয়। নারীর ওপর নির্যাতন তো আছে। ডিসক্রিমিনেশন আছে না একটা! পুরুষ-নারীর তফাৎ, নিজেদের মধ্যে তফাৎ ইত্যাদি আছে। নারী নির্যাতন আছে সব জায়গায়। গার্মেন্টেসেও আছে। নারী নির্যাতন বলতে আমি স্পেসিফিক্যালি বলেছি যে, নারীর ওপর আগে দারোয়ান থেকে ম্যানেজার পর্যন্ত সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট ছিল।

এখন কি কমে গিয়েছে মনে হয়?
না, এখন তো পারবে না। কমে তো গেছেই। এখন আর পারবেই না। এখন ওই ধরনের কোনো অ্যাসল্টের কথা খবরের কাগজেও দেখা যায় না। ওটা করতে পারবে না।

অনেক সময় কারখানা থেকে বাসায় আসার পথে রাস্তাঘাটে মাস্তানরা করে।
সেটা অন্যরা করে। যেকোনো লোক করছে। যারা করছে তারা কি গার্মেন্ট কারখানার মালিক? মেয়েদের ওপর অ্যাসল্ট ওখানেই হচ্ছে তা না, অন্য জায়গায়ও হচ্ছে। এভাবে বলেছি। এখন তারা যদি বিতর্ক করে, কিন্তু তারপরে তো আমার পক্ষে কেউ লিখল নাকি? কেন আমি ঠিক বলেছি, সেটা কেউ লিখল নাকি? বুঝে লিখল নাকি? বুঝল নাকি? তাও তো না।

Disconnect