ফনেটিক ইউনিজয়
আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে কী হচ্ছে তার খবর আর নিচ্ছি না-হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। লিখে চলেছেন ছয় দশক ধরে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- আত্মজা ও একটি করবী গাছ, নামহীন গোত্রহীন, পাতালে হাসপাতালে, জীবন ঘষে আগুন, আগুন পাখি, সাবিত্রী উপাখ্যান প্রভৃতি। লেখালেখির জন্য রাষ্ট্রীয় বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। তার জীবন-ভাবনা, জীবন-অভিজ্ঞতা, লেখালেখিসহ নানা বিষয়ে কথা হয়। তুলে ধরেছেন হাসান সাইদুল

আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন।
আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। বিষয়টিকে আমি অন্যভাবে দেখি। আমার লেখায় নানাভাবে বিষয়টি এসেছে। এটাকে নস্টালজিয়া না বলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিয়েছি। ভারতবর্ষের রাজনীতি একটু হলেও বোঝার চেষ্টা করেছি। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানরা কীভাবে অংশগ্রহণ করল, স্বাধীনতা লাভের আগেই বহু লোক কেন ছুটে গেল দেশটাকে বিভক্ত করার জন্য। যারা মুক্ত হতে চাইল আবার তারাই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ তুলে বিভক্ত হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হলো কেন।

আপনি প্রায় সারা জীবন রাজধানী থেকে দূরে থেকে গেলেন। কিন্তু খ্যাতি, সুনাম ও সৃজনশীল প্রজ্ঞার অলৌকিক ঐশ্বর্যে বিশ্বময় ছড়িয়ে আছেন...
বিশ্বময় ছড়িয়েছি না মদনভস্ম হয়েছি, তা আমার পক্ষে বলা কঠিন। একা একা যখন ভাবি, তখন মূলত নিজের নানা রকমের সীমাবদ্ধতার কথাই মনে হয়। এটাও ঠিক বিনয়ের কথা নয়। আমি নিজেই বুঝতে পারি যে, আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমার সেই অর্থে উল্লেখযোগ্য কোনো বিশেষ ক্ষমতা কিছুমাত্র নেই। আমি এখনও জানি না, আমি কতটা পাঠকপ্রিয়। পাঠকেরা যখন আমাকে কোনো কিছু জানায়, এটা পড়েছে এবং ভালো লেগেছে, তখন আমার নিজের কাছে খুব ভালো লাগে। ভালো লাগে বলেই যে খুব আত্মগরিমায় ভুগতে থাকি, তা কিন্তু নয়। এটা এক ধরনের ভালো লাগা। মানুষের বহু কাজ করে ভালো লাগে, তৃপ্তি লাগে, খুব ভালো একটা খাওয়া হলে তৃপ্তি লাগে, খুব ভালো একজন প্রেমিকা জুটলে ভালো লাগে, ঠিক তেমনি আর কি। অনেকে কিন্তু এ কথাও বলেছে, ‘হাসান আজিজুল হক ঠিক যতটা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশংসা পান।’ আমার মনে হয়, এ কথা যদি কেউ বলে থাকেন, তিনি যে অশুভ সত্য বলেছেন, তা মনে হয় না। হয়তো সত্যিই বলেছেন। হয়তো সেটা যুক্তিহীন, ভালোবাসা বা প্রীতি আমার কপালে জুটেছে। সেটার কারণ আমিও জানি না।

সাহিত্য সম্পর্কে আপনার সাম্প্রতিক ভাবনা কেমন?
আমার সাম্প্রতিক ভাবনা চিরকালের ভাবনাই। সাহিত্য থেকেই সব হয়। তুমি যদি মনে করো সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়বে, তাহলেও তোমাকে মার্কসের সাহিত্য পড়া উচিত। পড়া ছাড়া মানুষ নিজের চিন্তাটাকে প্রকাশ করবে কোথায়? এসব কথার পেছনে কী ক্ষোভ আছে তা আগে জানতে হবে। ক্ষোভটা কেন, সাহিত্য দিয়ে কী করব? সত্যিই তো। কেন বলছি, সাহিত্য দিয়ে আসলে কেউ কিছু করে না। সাহিত্য দিয়ে আজকে বাংলাদেশে কিছু হয় না। কেউ তোয়াক্কাই করে না। তুমি যে কাগজে কাজ করো, সেখানেও দেখবে আট পাতার সাহিত্য আর ৫০ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন। আমি যে বলেছি, সাহিত্য দিয়ে আপনারা কী করবেন? আমি কি অন্যায্য প্রশ্ন করেছি? তার মানে কি এ সাহিত্য দিয়ে কিছু পাওয়া যাবে না? তা তো নয়।

একজন কথাশিল্পীকে নিজস্ব একটি গদ্যশৈলী নির্মাণ করতে হয় আবার তার নির্মিত শৈলী ভেঙে আবার নতুন শৈলী তৈরি করতে হয়। আপনার ভাঙাগড়ার বিষয় জানতে চাই।
বলা মুশকিল। বড় উদাহরণ হলো, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটি। গল্প অনেকটা অংশ লেখার পরে দেখি, আরে, এ তো সমরেশ বসুর গল্প হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিলাম। অনেক দিন পর কোনো এক শরৎকালে একদিন গল্পটা লিখতে বসি। আমাদের গ্রামের বাড়ির ছাদের সিঁড়িঘরের পাশে একটা আমগাছ আছে, আম ধরে আছে আমার নাকের সামনে; ছোট্ট গোল একটা বেতের চেয়ার ছিল আমার, আর একটা টেবিল ছিল; টেবিলের ওপর মাথা রেখে আমি হঠাৎ লিখলাম যে, এখন নির্দয় শীতকাল। এটার পরই ঘামটা মুছে নিলাম। তারপরে কী করে লিখেছি জানি না, ‘অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়।’ স্রোত শুরু হয়ে গেল। বাক্যগুলো একেবারে যেন মিছিল করে আসছে। একটার পর একটা।

গল্প লেখার সময় চরিত্রের কষ্ট কি আপনাকে আবেগাপ্লুত করে?
নির্মাণের সময় কিছু বোঝা যায় না। সমস্ত মনোযোগ চলে যায় জিনিসটা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, চরিত্র, ভাষা এসব দাঁড়াচ্ছে কিনা। লেখার সময় খুব কষ্ট হয়, সেটা পরে বুঝতে পারি।

দীর্ঘকাল ধরে লিখছেন, কিন্তু গল্প মাত্র ৬৭টি। আপনি যে আড্ডা-সভা-সেমিনারে এত সময় ব্যয় করেন বা করেছেন, জীবনের এ বেলা এসে কী মনে হয়, ঘাটতি রয়ে গেছে কিছু?

কোনো কোনো মুহূর্তে মনে হয়, লেখার পরিমাণ খুবই কম হয়ে গেল। তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়। পরক্ষণেই আমি ভুলে যাই। আজকের দিনটা কিছুই লেখা হলো না। প্রতিদিন মনে হচ্ছে আজকেও লেখা হলো না। আর এখন একটু বেশি হচ্ছে। বয়স হয়েছে, অঢেল সময় আর পাওয়া যাবে না। বহুকাল বহু লোক আমাকে বুঝিয়েছে, বলেছে, হাসান ভাই, সময় নষ্ট করবেন না। একসময় হঠাৎ দেখবেন যে, সময়ের টানাটানি পড়ে গেছে। স্বভাব তো যাবে না। আমার জ্ঞানোদয়ও হবে না। তবে আমার ইচ্ছেটা এই যে, লেখাটা অনেক বাড়িয়ে দিই।

আপনার গল্প বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য, পিএইচডি গবেষণা হয়েছে এবং আরও হচ্ছে, আপনার অনুভূতি কী?
ভালো লাগে। তবে এতকাল যে ধারণা ছিল, একমাত্র মরা লেখকেরই লেখা পাঠ্য হয়, জীবিত লেখকের পাঠ্য হয় না; আমার লেখা তো অনেকদিন থেকেই নানা জায়গায় পাঠ্য। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘ইফ ইউ ওয়ান্ট টু কিল অ্যান অথর, তাকে পাঠ্য করো। যদি তুমি মনে করো কোনো লেখককে মেরে ফেলবে তাহলে তার শ্রেষ্ঠ লেখাটা পাঠ্য করে দাও।’

জীবনে বেশি চেয়েছেন নাকি পেয়েছেন?
আমার কাজ আর আমার কাজের স্বীকৃতি ও প্রাপ্তি দুটোর মধ্যে আনুপাতিক কোনো মিল নেই। আমি দিয়েছি এক পেয়েছি একশ। সেজন্য কেউ যদি বলে, লেখক হিসেবে বড্ড বেশি পেয়ে গেছে এই লোকটা, আমি অন্তত আপত্তি করতে যাব না। যথেষ্ট পেয়েছি।

আপনার জীবনের প্রথম উপাজর্ন কত এবং কীভাবে খরচ করেছিলেন?
১৯৫১-৫২ সালের কথা। খুব ভালো ছাত্র ছিলাম আমি। আমাদের মাঝে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। আমার ক্লাসের বন্ধুরা আমাকে খুব পছন্দ করত। আমর বন্ধুরা আমার কাছে ইংরেজি শিখতে প্রাইভেট পড়ত এবং আমাকে ১০ টাকা করে দিত। ওই টাকাই ছিল আমার প্রথম উপার্জন। বন্ধবান্ধব মিলেই ওই টাকা খেয়েছিলাম।

সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের ধারা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?
আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে, সমগ্র পৃথিবীতে কী হচ্ছে তার খবর আর নিচ্ছি না। মানিক, বিভূতি, রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান পড়েছেন। পড়াশোনা করতে হবে না? বাংলা গল্প সম্বন্ধে অচেতনতা মারাত্মক। গল্প পড়ে মনে হয় যে, ভালো করে মানিক পড়া থাকলে এ গল্পটা সে লিখত না, কিছুতেই লিখত না। তারাশঙ্কর পড়া থাকলে লিখতে পারত না। বললে পরে যুবক লেখকদের মনে লাগবে, এখন কেন এ গল্প লেখা হবে? এতদিন পর কেন এ গল্প লেখা হবে? আমিও তো লিখে গেলাম। আমার পেছন থেকেও হাঁটতে পারে না কেউ, সামনে থেকে হাঁটা ধরছে। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গেও একই অবস্থা। অপরিচয়ের ফলে দম্ভ ও আত্মতৃপ্তি বেড়ে যায়। না জানলেই তখন নিজেকে বড় মনে হয়। প্রতিনিয়ত শেষ অবস্থান জানা থাকতে হবে। আমি সেজন্য সবসময় চেষ্টা করি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতে।

আমাদের বড় লেখক আসার সম্ভাবনা ক্রমশ কমে যাচ্ছে...
নিজের ভেতরে যা আছে তাই নিয়ে লিখব, কিন্তু ভা-ারটা তো পরিপূর্ণ করে নিতে হবে আগে। ভা-ার শূন্য থাকলে বের হবে না কিছু। নিজের ভেতরেই ডবডব করে আওয়াজ ওঠে। সেজন্য হতাশা প্রকাশ করতেই হচ্ছে। হতাশার একটা কথাই হচ্ছে দীর্ঘকাল হতাশাও থাকে না, আশাও থাকে না। আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব চলে চিরকাল। হতাশা হয়তো স্থায়ী হবে না। তবে এখন খুব বিদিশা অবস্থা।

আপনার দীর্ঘ ছয় দশকের লেখালেখির জীবনে উপন্যাস লিখেছেন কেবল দুটি, ‘আগুন পাখি’ ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’। গল্প নিয়েই কাটিয়ে দিলেন অনেকটা সময়। কেন?
উপন্যাস আমি লিখতে চেয়েছি শুরু থেকেই। কিন্তু পারিনি বলেই গল্প লিখেছি। তবে একেবারেই যে চেষ্টা করিনি, তা নয়। ‘তরলা বালা এক বঙ্গ রমণীর কথা’ নামে একটি লেখা শুরু করেছিলাম। লিখেও ছিলাম অনেকটা। তার পরে আর আগ্রহ বোধ করিনি। তাই লিখে শেষ করা হয়নি।

আপনি একবার বলেছিলেন বাস্তবতার চোখে যা দেখি তার বর্ণনা দিয়ে গল্প বানানোর চেষ্টা করি। সেখানে কল্পনা কতটুকু থাকে?
আমার এ কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করো না। গল্প যেটাকে বলে তৈরি করা, তেমন কোনো গল্পই আমার নেই। আমি আসলে বলতে চেয়েছিলাম, আমার কোনো উদ্ভাবনী ক্ষমতা নেই। এটা বিনয় করে বলছি নাকি গূঢ় অর্থে সত্য বলছি, সেটা বিচার করবে পাঠক।

‘আত্মজা ও করবী গাছ’ আপনার বহুল পঠিত ও আলোচিত গল্প। এ গল্পের ঘটনা, ভাষা ও পরিবেশ একটি ফুলগাছের। কিন্তু আবহ ও ইঙ্গিত দেশভাগ তথা ’৪৭-এর দাঙ্গা...
তুমি ঠিকই ধরেছ। গল্পটি লিখেছিলাম ’৬৬Ñএর দিকে। ’৪৭-এর ভারত ভাগ এবং বাংলা ভাগ হওয়ার বিষয়টি গল্পটি পড়লে বোঝা যায়। তখন কোন সম্প্রদায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আমি সেদিকে যাব না। আমি কেবল চেষ্টা করেছি মানুষের উন্মূল হওয়ার বেদনাটি ধরতে।

একটি বিষয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, গল্পে ‘গল্প’ থাকা বিষয় নিয়ে।
আজকাল বিভিন্ন বিষয়ে নানা আলোচনা হয়, যার অনেকটাই অন্তঃসারশূন্য। গল্পে গল্প থাকবে কি থাকবে না, এ আলোচনাও তেমনি। গল্পে গল্প থাকা বা না থাকা কোনো বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত লেখাটি গল্প হয়ে উঠল কিনা, সেটিই আসল।

জীবনের এ অবস্থায় এসে মৃত্যু নিয়ে কী ভাবনা আপনার?
জীবন নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। সময়ের কারণে দেহে হয়তো বার্ধক্য এসে যায়। এটা প্রকৃতির নিয়ম। দৈহিক বার্ধক্য এলেও আমি মনে করি যে, বৃদ্ধ হয়ে যাইনি! আমাদের দেহ নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে এতটা বছর পেরিয়ে এসেছে, কষ্ট সয়েছে, তাই তার একটি সময় বিশ্রামের প্রয়োজন হবেই। তখনই দেখা দেয় বার্ধক্য। তাই বার্ধক্য দোষের কিছু নয়। আর মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। মৃত্যু নিয়ে আমাকে আলাদা করে ভাবতেও হয় না।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ
ভালো থেকো। তোমাকেও ধন্যবাদ।

Disconnect