ফনেটিক ইউনিজয়
লেখালেখি মূলত আমার মানসিক প্রেরণা জোগায়-হাসনাত আবদুল হাই

শিল্প-সাহিত্যের বহুমাত্রিক শাখায় বিচরণ করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। মে মাসে এ লেখকের ৮১ বছর হলো। লেখালেখিতে এখনও তিনি দারুণ সক্রিয়। কথা বলেছেন নিজের যাবতীয় বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান সাইদুল

আপনার লেখালেখির শুরুর কথা জানতে চাই।
আমার সাহিত্যচর্চা শুরু ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন থেকে শুরু করে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বেশকিছু ছোটগল্প, দুটো উপন্যাস বেরিয়েছিল পত্রিকায়। কিন্তু কোনো বই বের হয়নি। তখন প্রকাশকরা সাহিত্যের বই বের করতেন খুব কম। মাঝখানে অবশ্য চার-পাঁচ বছর বিদেশে ছিলাম। এ সময় কিছুই লিখিনি। আবার যখন আমি সরকারি চাকরিতে ঢুকে ১৯৬৫-৭০ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানে দায়িত্বরত ছিলাম, তখনও কিছু লেখা হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর থেকে আমি নিয়মিত লিখছি। ১৯৭৮ সালে প্রথম উপন্যাস ‘আমার আততায়ী’ বের হয়। এর পরের বছর বের হয় দুটো গল্পের বই। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ ২৪ বছর অপেক্ষার পর আমার প্রথম বই বের হয়, যা আজকালকার লেখকরা কল্পনাই করতে পারে না।

লেখালেখি কেন করেন?
উপন্যাস-গল্প-কবিতা লিখে আমি তেমন কোনো সম্মানী পাই না; কিন্তু লেখা মানসিকভাবে বাঁচতে সহায়তা করে। লেখালেখি মূলত আমার মানসিকভাবে প্রেরণা জোগায়, কথাশিল্পের মাধ্যমে সমাজের কাছে আমার যে দায়বদ্ধতা, তা পালন করতে পারি। স্বাধীনতার পর থেকে আমি সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরার জন্য, তাদের আশা-নিরাশার কথা বলার জন্য, তাদের শোষণ-বঞ্চনা তুলে ধরার জন্য লিখেছি। যারা দেশ পরিচালনায় আছেন, দেশের শীর্ষস্থানে বিভিন্ন পেশায় আছেন, তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে চেয়েছি।

আপনি গল্প-উপন্যাস ও চিত্রকলা সম্পর্কে লিখেছেন, চলচ্চিত্র নিয়েও আপনার বই আছে। এসব বিচিত্র বিষয় নিয়ে আপনার আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?
ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস ছিল। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, কবিতা, সমালোচনা নির্বিচারে সবই পড়তাম। মনে হয়, এভাবেই নানা বিষয়ে আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বই কেনা ও বই পড়া এ দুইয়ের সমন্বয়ে নানা বিষয়ে লেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে আমার ভেতরে।

আপনার প্রথম বই ‘একা এবং একসঙ্গে’ কিন্তু তার আগেও তো লিখেছেন?
ঠিক বলেছ, আমি প্রথম উপন্যাস যেটা লিখেছিলাম, সেটা হারিয়ে গেছে। ওটা বের হয়েছিল পদক্ষেপ নামের এক অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকায়। নাম ছিল ‘অরণ্যনগর’। সম্ভবত ১৯৫৯ সালে লিখেছিলাম।
‘একা এবং একসঙ্গে’ প্রকাশ করার গল্পটা জানতে চাই।
‘একা এবং একসঙ্গে’ এক তরুণ দম্পতির কাহিনী। ‘একা এবং কায়েকজন’ নামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাসের নামের সঙ্গে মিল ছিল। তবুও নামকরণে কিছুটা তফাৎ ছিলই। তার জন্য দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগিনি হুবহু একই নাম তো আর না। নাম দুটির অর্থের মধ্যেও পার্থক্য ছিল। মুর্তজা বশীর তার আঁকা পুরনো একটা তৈলচিত্রকে বইয়ের প্রচ্ছদ হিসেবে তৈরি করে দিলেন। বেশ উৎফুল্ল এবং কিছুটা উত্তেজিত হয়েছিলাম বইটা বের হওয়ার পর, যা সব লেখকের বেলায়ই হয়ে থাকে। ১৯৭৬ সালে লেখক হিসেবে আমি তেমন প্রতিষ্ঠিত হইনি। বইটি বেরোনোর পর আমার লেখক চাহিদা কিছুটা বাড়ল। এরপর আমাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথম প্রেমের মতো বইটি আমার কাছে অবিস্মরণীয়।

আপনি শিক্ষকতা না করে ঢুকলেন সিভিল সার্ভিসে, যা লেখালেখির সাথে সম্পর্কযুক্ত পেশা নয়...
এ কথা ঠিক যে, শিক্ষকতা করলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, বইয়ের জগতেই থাকা যায়। তা জেনেও পাবলিক সার্ভিসে এসেছিলাম মূলত মা-বাবার আগ্রহের জন্য। ওই সময়ে আমার বড় দুই ভাই-ই ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের, আরেকজন কলেজ শিক্ষক। আমিও যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিলাম, বাবা মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতেন, ‘আমাদের সব ছেলেই মাস্টার হয়ে গেল!’ তখন বুঝলাম যে, তাদের খুব ইচ্ছা, আমি যেন সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। সরকারি চাকরি পাওয়া ছিল সে সময় বিরাট মর্যাদার ব্যাপার। ফলে মা-বাবার আগ্রহের কারণে সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে পাবলিক সার্ভিসে যোগ দিই।

অবসর পেলে কী করেন?
আমার অবসর বলে কিছু নেই। ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান, ইতালিয়ান, বাংলাসহ প্রচুর ডিভিডি, সিডি আমার সংগ্রহে। ইংরেজি ক্লাসিক, রবীন্দ্র, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান, গজল, বাউল, ব্যান্ড সবই শুনি। পড়াশোনা করি। দোকানে কফি খেতে যাই।

আপনার লেখালেখি নিয়ে পাঠককে কী বলবেন?
আমি আমার শ্রেষ্ঠ লেখাটি এখনও লিখতে পারিনি। এ অতৃপ্তি মনে হয় সব শিল্পী-সাহিত্যিকেরই থাকে। আর তৃপ্তির জায়গা যদি বলি, আমার ১০০-এর মতো বই বেরিয়েছে। যদি আমার পাঠক না থাকত, তবে এত বই প্রকাশক ছাপত না। এটি আমাকে সত্যিই তৃপ্তি দেয়।

জীবনে কখনও প্রেমে পড়েছিলেন?
দেখো আমরা যখন পড়ালেখা করতাম, তখন ছাত্রছাত্রীরা এমন ছিল যে, একজন ছাত্রীর সাথে দেখা করতে হলে চিঠি লিখে স্কুলের দপ্তরির কাছে পাঠাতে হতো। প্রধানশিক্ষকের অনুমতিক্রমে কথা বলতে দিত। তখন প্রেম করা দূরের কথা ছিল।

জীবনের কিছু শূন্যতার কথা জানতে চাই।
আমি যা কিছু করতে চেয়েছিলাম, তা সম্পূর্ণ করতে পারিনি। এ পর্যন্ত বাংলাতেই বেশি লিখেছি; ইংরেজিতেও কিছু লিখেছি; যেমন তিন খণ্ডে স্মৃতিকথা, একটি ভ্রমণকাহিনী, হাইকু কবিতা। আমি চাই ইংরেজিতে আরও বেশি লিখতে যেন বাংলাদেশের কথা বাইরের পৃথিবীতে জানাতে পারি। এ শূন্যতায় আমি ভুগছি। যত কিছুই করি সবসময় মনে সেই প্রশ্ন জাগে, ‘জীবন এত ছোট ক্যানে।’

ধন্যবাদ।
তোমাকেও ধন্যবাদ।

Disconnect