ফনেটিক ইউনিজয়
‘জনগণের বৃহত্তর ঐক্য এখন সময়ের দাবি’

আ স ম আবদুর রব। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির সভাপতি। ছিলেন ডাকসুর ভিপি। ৬০ বছর ধরে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আরপিও সংশোধন, নির্বাচনকালীন সরকার, বৃহত্তর ঐক্যসহ নানা বিষয় নিয়ে উত্তরার বাসভবনে তিনি সাম্প্রতিক দেশকালের মুখোমুখি হন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান সাইদুল

আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা কেমন?
দেশের সার্বিক অবস্থা সংকটাপন্ন। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা, তার মাঝে রোহিঙ্গা সংকট। এ দুটো মিলে দেশ বেশ সংকটগ্রস্ত। গণতন্ত্র-সুশাসন-ন্যায়বিচার যে রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করা হয়, সে রাষ্ট্রে জনগণের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ভোটারবিহীন নির্বাচন করার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ‘সাম্য’, মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’  ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ঘোষিত অঙ্গীকার। এ ত্রয়ী আদর্শকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালেই। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে রাষ্ট্র আলাদা হয়ে আবারও ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ঔনিবেশিক শাসন পদ্ধতি যতদিন থাকবে, ততদিন রাষ্ট্র অনৈক্য-সংঘাত-বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতি-দুর্নীতি-ক্রসফায়ার-গুম অব্যাহত থাকবে। অন্যায়-অনিয়ম-অনৈতিক রাজনীতির বিস্তারে রাষ্ট্র এখন বিপর্যয়ের মুখে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে অনেকেই ক্রান্তিকাল বলছেন। এ থেকে নিস্তারের উপায় কী?
সত্যকে যেভাবে বিতাড়িত করা হচ্ছে, মানবতাকে যেভাবে লুণ্ঠিত করা হচ্ছে, তা শুধু ক্ষমতার পালাবদলে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এজন্য সমাজের রূপান্তর প্রয়োজন। এ রূপান্তরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জেএসডির ১০ দফা ও রাজনৈতিক দার্শনিক সিরাজুল আলম খানের ১৪ দফা প্রণীত হয়েছে। ঔপনিবেশিক রাজনীতির অবসানকল্পে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নতুন সমাজ শক্তির উদ্ভব ঘটবে। এ নবতর শক্তির নবজাগরণ অধঃপতিত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটাবে, উন্নয়ন-উৎপাদনে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে। রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিবর্তন ’৭২-এর সংবিধানের সংশোধন, ঔপনিবেশিক আইনকানুনের পরিবর্তন করে যুগের চাহিদা ও একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক রাজনীতি বিবেচনায় এক নতুন শক্তির উত্থান হবে। এ নতুন শক্তিই জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শাসনপদ্ধতি প্রবর্তন করে এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাবে এবং রাষ্ট্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক, মানবিক ও নৈতিক রাষ্ট্র।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি তুলছেন কেউ কেউ। এ সম্পর্কে আপনাদের মতামত কী?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে বিনির্মাণের প্রশ্নে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদ নয়, আমরা সাংবিধানিক-কাঠামোগত সংস্কারের জন্য প্রস্তাবনা উত্থাপিত করেছি। এ লক্ষ্যে আমাদের প্রস্তাব হলো-
১. যুক্তফ্রন্ট-গণফোরামসহ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসম্প্রদায়িক দল-সংগঠন, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা;
২. বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা;
৩. আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এর ওপর আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের কর্তৃত্বের অবসান করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা;
৪. নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার উপযোগী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা;
৫. (ক) সরকার কর্তৃক অবাধ ক্ষমতাচর্চার মাধ্যমে দুঃশাসন কায়েম বন্ধ করার লক্ষ্যে সরকারের ক্ষমতায় নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা; (খ) সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠন করা; (গ) রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা; (ঘ) রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে বর্তমান সংবিধানের যুগোপযোগী সংস্কার করা; (ঙ) সংবিধানের বিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগের ব্যবস্থা করা; (চ) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা ও নির্বাচনের আগে সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা করা;
৬. এ মুহূর্ত থেকে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার বন্ধ করা, গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি প্রদান নিশ্চিত করা;
৭. কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে দায়েরকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং আন্দোলনকালে পুলিশ ও মাস্তানদের আঘাতে জখম হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা এবং হামলাকারী মাস্তানদের গ্রেফতার ও বিচারের ব্যবস্থা করা;
৮. তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দরসহ জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা;
৯. মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা এবং বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল, ভুটান, চীনের কুনমিং ও মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট গঠন করা।

স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গঠনে আপনার অবদান কতটুকু ছিল?
নিউক্লিয়াস গঠনের শুরুর দিকেই আমি সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। পরবর্তীতে নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে বহু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিই বা পরিচালনা করি।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বলুন।
বর্তমান ছাত্ররাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করাই নি®প্রয়োজন। আমরা যখন শুরুতে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হই, আমাদের মাঝে মান্যতা ছিল। আমরা সিনিয়রদের কথা শুনতাম। আমাদের মনে-প্রাণে ছিল দেশের স্বাধীনতার কথা। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপট কেমন আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশের মানুষ ও আপনারা সাংবাদিকরা ভালো করেই জানেন।

আরপিও সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আপনাদের অবস্থান কী?
আরপিও সংশোধন হবে জনগণের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকারকে অধিকতর নিশ্চিত করার প্রয়োজনে। সরকারের ইচ্ছা পূরণে ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করে যেকোনো ধরনের সংশোধন হবে আত্মঘাতী, যার ফলে বিদ্যমান নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থাই বাড়বে।

নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন না হলে আপনারা কি নির্বাচনে যাবেন?
জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। আর সে স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণ ভোট দিতে পারবে না, জনগণকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, ভোটবিহীন সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে, এটা ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করবে। সুতরাং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনেই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রয়োজন।

বিএনপি নির্বাচনে না এলে আপনারা কি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন?
জনগণের ভোটে সরকার গঠিত হবে। সুতরাং অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সব রাজনৈতিক দলই অংশগ্রহণ করবে।

নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। তারা যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো উদ্যোগে নেয়, সেক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা কী হবে?
আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও অনৈক্যে এসব তৎপরতা বৃদ্ধির সুযোগ হয়।

একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছেন। ঐক্যের রূপরেখা কী হবে?
রাষ্ট্র এখন আর সবার জন্য নয়, কারও কারও জন্য। সুতরাং রাষ্ট্রকে লুণ্ঠন বা ডাকাতি করার জন্য কারও কারও অসীম ক্ষমতা-ঔদ্ধত্যকে জনগণের প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রতিহত করে দিতে হবে। জনগণের বৃহত্তর ঐক্য এখন সময়ের দাবি। এ দাবি যদি আমরা পূরণ করাতে না পারি দলীয় সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে, তাহলে জাতিকে বড় খেসারত দিতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থেকেও ঐক্য হতে পারে, আবার এক অবস্থানে থেকেও ঐক্য হতে পারে। দেশ-জনগণের স্বার্থ যদি প্রাধান্য পায়- বহু ফর্মুলা উদ্ভাবিত হতে পারে সময়ের নিরিখে, লক্ষ্যের নিরিখে। আর এবারের পরিবর্তন শুধু পরিবর্তনের জন্য নয়, এবারের পরিবর্তন হবে মৌলিক-কাঠামোগত পরিবর্তন।

কেমন বাংলাদেশ দেখে যেতে চান?
শুধু আমার কেন? আমার আপনার সবারই তো একটা স্বপ্ন, সুন্দর একটি বাংলাদেশ। যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে- এটা হয়তো ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু একজন মানুষ একজন মানুষের ওপর নির্দয় হবে, মানুষকে হত্যা করবে- এমন কোনো স্বদেশ চাই না। শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক-মানবিক বাংলাদেশ দেখার স্বপ্নই লালন করেছি চিরকাল।

আরো খবর

Disconnect