ফনেটিক ইউনিজয়
‘নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি ও গণতান্ত্রিক বাম জোটের অন্যতম নেতা। ডাকসু’র সাবেক সহ-সভাপতি। সম্প্রতি চলমান রাজনীতি, ঐক্য প্রক্রিয়া এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মুখোমুখি হন সাম্প্রতিক দেশকালের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান সাইদুল

দেশে চলমান রাজনৈতিক ঐক্য প্রক্রিয়াকে কীভাবে দেখছেন?
বর্তমানে যে ঐক্য হয়েছে তা আসলে বিদ্যমান দ্বিদলীয় কাঠামোর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা বামপন্থীরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র বাইরে গিয়ে বিকল্প শক্তি গড়তে চাই। সে লক্ষ্য নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। বিএনপি ও তাদের সঙ্গে থাকা ২০ দল একটি সরকারবিরোধী জোট গঠন করছে। সেটা তারা করুক। কিন্তু আমরা মনে করি, এক দুঃশাসন নামিয়ে আরেক দুঃশাসন ক্ষমতায় বসিয়ে আসল সমস্যার সমাধান হবে না।

গণতান্ত্রিক দিক থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থাকে কিভাবে দেখছেন?
দেশ বাঁচাতে হলে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিরোধী দল থাকতে হবে। যে স্বপ্ন নিয়ে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তা থেকে দেশ অনেক দূরে সরে গেছে। একদিকে গণতন্ত্রহীনতা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে চরম রুগ্ণতা এবং নৈরাজ্যে নিপতিত করে রেখেছে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও দেশ এখন সাম্রাজ্যবাদসহ বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল পার করছে বলে অনেকে বলছেন। আপনার কি মনে হয়?
বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে বলে হিসাব দেখানো হচ্ছে। উন্নয়নের মডেল বলে দাবি করা হচ্ছে। অথচ বৈষ্যমের হারও বাড়ছে। কতিপয় লুটেরা ব্যক্তি উন্নয়নের সুফল প্রায় সবটাই নিয়ে নিচ্ছে। বিদেশি এবং দেশি করপোরেট শক্তি এবং তাদের ক্যাডার বাহিনীর কাছে দেশ আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করেছে। লুটপাটের অর্থনীতি লুটপাটের রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা হয়ে উঠেছে লুটপাটের সুযোগ করে নেয়ার উৎকৃষ্ট সোপান। তাদের মধ্যে খুনোখুনি, হানাহানি এবং গদি দখলের জন্য গলাকাটা দ্বন্দ¦ দেশকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে যে সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
‘ভিশন মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে দেশকে বর্তমান অবস্থার বিকল্প ধারায় পরিচালনা করাই সংকট থেকে মুক্তির পথ হতে পারে। সেটাই জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় পুনর্জাগরণের নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। এজন্য দ্বিদলীয় মেরুকরণ ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর বেড়াজাল ভেঙে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে।

আগামী নির্বাচন নিয়ে আপনার কোনো ফর্মুলা আছে?
এরশাদের বিরুদ্ধে যখন আমরা লড়াই করি, তখন তিন জোটের রূপরেখা প্রণীত হয়। সেটা ড্রাফট করার দায়িত্ব আমার ওপরই ছিল। আমরা চেয়েছিলাম নির্বাচনের ওপর মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু এখন পর্যন্তও মানুষ বিশ্বাস করে, দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব না। আজ্ঞাবহ কমিশনকে সরিয়ে দিতে হবে। সংসদ বহাল রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনেক জটিলতা সৃষ্টি করবে। আমরা বলেছি, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, তত শতাংশ সিট পাবে। ‘না’ ভোট দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনের খরচ রাষ্ট্র চালাবে। নির্বাচন কমিশন সব তদারকি করবে। সব সরকারি খরচে হবে। অনেক দেশেই এ সিস্টেম আছে।

সরকারের বর্তমান অবস্থান থেকে কি মনে হয় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো সুযোগ আছে?
জনসমর্থন না থাকার পরও আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় যাওয়ার সব আয়োজন এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে। এ অবস্থায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি।

নির্বাচন বয়কটের বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
নির্বাচন করতেও পারি বা বয়কটও করতে পারি, সেটা আন্দোলনের কৌশল হিসেবে। এখন কাজ হলো অবাধ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী আন্দোলন করা। আমরা এবং বিএনপি উভয়ে আওয়ামী শাসনের বিরোধী। তবে মৌলিক পার্থক্য হলো বিএনপি দক্ষিণপন্থী ও আমরা বামপন্থী অবস্থান থেকে বিরোধিতা করি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নীতি, আদর্শ ও সামাজিক মর্যাদাগত দিক থেকে সমমনা দল, বলা যায় যে বিএনপি ‘দুই নম্বরি’ বিরোধী দল। আমরা একটিকে আপৎ, অন্যটিকে বিপদ বলি।

সরকারে থাকা আপনার বাম বন্ধুরা কেমন করছেন? তারা তো সরকারি উন্নয়নের সারথী?
তারা বামপন্থা পরিত্যাগ করেছেন। তারা বলেছিলেন, সরকারকে একটু ‘মানুষ করতে’ তারা যাচ্ছেন। গত এক দশকে তারা আওয়ামী লীগকে আরও অমানুষ করেছে, সরকার আরও বেশি অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক ও বিদেশনির্ভর হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে, সেই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। সমাজব্যবস্থায় মৌলিক কিছু গলদ না থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয়- যে সমাজে সম্পদ বাড়ে কিন্তু মানুষের দুর্দশা কমে না। এ রকম সমাজের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি।

বর্তমান ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
ছাত্র রাজনীতি আসলে অবদমিত। মিছিল না করলে, নেতার পেছন পেছন না ঘুরলে হলে সিট দেয়া হবে না- এসব চলছে। ছাত্র রাজনীতির নামে টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি, লোকজনকে ধরে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। ছাত্র নির্বাচন হলে তো এসব হবে না। তাই নির্বাচনও হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটা অশুভ অংশ। দুুঃখের বিষয় শিক্ষকদের একটা অংশও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। দেশে সব নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু ছাত্র নির্বাচন হচ্ছে না। সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নেই ২৮ বছর।

এক দশক আগের প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৫ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানিও ছয় গুণ বেড়েছে, বিদ্যুৎ তিনগুণের বেশি। এই উন্নয়নকর্মকে কী অস্বীকার করবেন?
বিরাট সাফল্য। কিন্তু তা কার স্বার্থে? এই সম্পদ বৃদ্ধি ধনীকে আরও ধনী করেছে। আপনি কার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাফল্য বিবেচনা করছেন, সেটা দেখতে হবে। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের যা গৌরবের, তাই পাকিস্তানিদের জন্য ছিল লজ্জার। কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, সেই প্রশ্নের মীমাংসা করেছিলাম একাত্তরে অস্ত্র হাতে। এখনকার বাংলাদেশে কিছু লোক অঢেল খাবে, আর অন্যরা খাবে না। তারা পুঁজিবাদের নিকৃষ্ট রূপ, নয়া-উদারবাদী নীতিতে দেশকে নিয়ে গেছে।

অনেকের সমালোচনা, বাম দলগুলো জনবিচ্ছিন্ন- এই সমালোচনা কীভাবে খণ্ডাবেন?
বামেরা জনবিচ্ছিন্ন- এটা সম্পূর্ণ অসত্য। জাতীয় সম্পদ রক্ষা, সুন্দরবন, যৌন নির্যাতন, গার্মেন্টস, গণজাগরণ মঞ্চ- এ রকম আরও অনেক ইস্যুতে, সব আন্দোলনে সামনে রয়েছে বামপন্থীরা এবং সবাই বিশ্বাস করে যে, আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ শক্তি আমাদের আছে। এরশাদের পতনের পর শাসকশ্রেণির কৌশল হলো- সরকার ও বিরোধী দল দু’টোকেই তারা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুকরণ এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে এর বাইরে আর কোনো শক্তি না আসতে পারে। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন, সেটা ক্ষুদিরামকেও শুনতে হয়েছে- ‘খামোখা জীবন দাও’।  

আওয়ামী লীগ বনাম বাদবাকি, আপনার জাতীয় ঐক্য কি এমনই?
না। আমি এর পক্ষপাতি নই। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনোটিই থাকার সুযোগ নেই। তারা চার নীতি থেকে দূরে চলে গেছে। আর বাকিরা যদি এই দু’টি দলের নব্য সংস্করণ হয়, তাহলেও চলবে না। বিকল্প নীতি দিতে হবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র বর্তমান অবস্থা কেমন বলে মনে করছেন?
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমমনা দল। ওরা লুটপাট ও সাম্রাজ্যবাদের আনুগত্যের পথ অনুসরণ করছে। রাতারাতি ধনী হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতা পেতে পাগল হয়ে পড়েছে। এরা রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। এদের কাছে ক্ষমতাই প্রধান। নীতি এবং আদর্শ তুচ্ছ বিষয়। অনেকে নিজেদের বিকল্প বলে জাহির করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিকল্প আর ‘নব্য সংস্করণ’ এক জিনিস নয়। আওয়ামী লীগ ‘ভিশন-২০২১’ এবং বিএনপি ‘ভিশন ২০৩০’ ইত্যাদি তুলে ধরছে। কিন্তু তারা ‘ভিশন ১৯৭১’-কে শুধু যে ভুলে বসে আছে তা-ই নয়, বরং এর বিপরীত ধারায় তাদের ভিশনের রূপরেখা রচনা করছে।

বিচার বিভাগ, মিডিয়া, ইসি ও অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলুন।
এর সবটাই আজ পায়ের নিচে পিষ্ট, চরমভাবে আক্রান্ত এবং ধ্বংসের উপক্রম। ভোট গণনার রিপোর্ট কোনটি যাবে, কোনটি যাবে না, সেখানেও এখন একই কৌশল। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এক নয়। সাংবাদিকদের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণটা কখনো আইন, আবার কখনো বড় বড় করপোরেট হাউস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

আগামী নির্বাচনে আপনাদের, মানে বাম দলগুলোর অবস্থান কেমন থাকবে বলে মনে করেন?
পরিস্থিতি বুঝে বামপন্থীরা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা বয়কটও করতে পারে। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি উপাদান। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের গণবিরোধী চরিত্র তুলে ধরা যায়। মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্য গণজাগরণের নতুন অধ্যায় রচনা করতে হবে। এটা একটা কঠিন সংগ্রাম। কঠিন লড়াই। সেই সংগ্রামকে অগ্রসর করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কিংবা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেবে বামপন্থীরা।

কেমন বাংলাদেশ দেখে যেতে চান?
বাংলাদেশে একটি গণমানুষের সরকার দেখতে চাই। যেখানে রাষ্ট্র জনগণের রক্ষক হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, লুটপাট, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধ হবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। উৎপাদন বাড়ছে, রেমিটেন্স বাড়ছে। বাস্তবতা হচ্ছে- এখানে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই, কৃতিত্ব নেই। সব কৃতিত্ব সাধারণ মানুষের। গার্মেন্ট শ্রমিকরা রাত-দিন পরিশ্রম করছে বলেই প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। রাষ্ট্র কেবল লুটপাটকারীদের পাশে থেকেছে। আমরা সত্যিকারের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের বাংলাদেশ দেখতে চাই। এখানে আমাদের কোনো বিশেষ চাওয়া-পাওয়া নেই।

আরো খবর

Disconnect