ফনেটিক ইউনিজয়
তিউনিসিয়ার সমস্যা মেটানোর তাগিদ

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বিশ্বব্যাপী মুখে মুখে উচ্চারিত একটি নাম। আফগানিস্তান আর ইরাক যুদ্ধের সময়কার আড়াই লাখ গোপন কূটনৈতিক দলিল ফাঁস করার ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। তথ্য ফাঁসের দুনিয়া নাড়া দেওয়া এমন সব ঘটনা নিয়ে গার্ডিয়ান পত্রিকার দুই সাংবাদিক ডেভিড লেই ও লুক হার্ডিংয়ের বই গোপনীয়তার বিরুদ্ধে অ্যাসাঞ্জের যুদ্ধ। এ নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর ধারাবাহিক অনুবাদের ৬৫তম পর্ব ছাপা হলো। এবারের পর্বে আসছে দ্য গার্ডিয়ান-এ উইকিলিকসের তথ্য ফাঁসের পর তিউনিসিয়ার কী অবস্থা দাঁড়ালো তাঁর কিছু ইঙ্গিত।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সস্ত্রীক মোহাম্মদ সাখের এল মাতেরি ও তাঁর স্ত্রী নাসরিন বেন আলি এল মাতেরির সঙ্গে নৈশভোজ করেছেন। মাতেরির বাসভবনে ১৭ জুলাই তিনি এ নৈশভোজে অংশ নেন। বিলাবহুল এই ভোজনে এল মাতেরি বলেন, তিনি বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে রাষ্ট্রদূতের বিদায়ের আগে আমেরিকান কো-অপারেটিভ স্কুল অব তিউনিসের সমস্যা মেটাতে চান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নীতির প্রশংসা করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে দুই রাষ্ট্রনীতির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি তিউনিসিয়ায় ম্যাকডোনাল্ডসের শাখা খোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এ-সংক্রান্ত আইন পাস করতে সরকারের বিলম্বের ব্যাপারে অভিযোগ তোলেন। সেই সন্ধ্যায় তাঁকে একসময় কঠিন মনে হয়েছে, আরেকবার দয়ালু মনে হয়েছে। বলা যায়, তিনি পালাক্রমে এই দুই মনোভাব ব্যক্ত করেন। আবার কখনো কখনো মনে হয়েছে, তিনি অনুমোদন প্রত্যাশা করছেন। তিনি ব্যাপক ধন-সম্পত্তির মালিক, যা তাঁর প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তুষ্টির একটি কারণ।

এল মাতেরির ব্যক্তিগত ও গৃহস্থ জীবন
তাঁর বাড়িটি সুপরিসর, যেটা ঠিক হামামেত সমুদ্রসৈকতের ঠিক ওপরেই। বাড়ির প্লটটি যথেষ্ট বড়। সরকারি রক্ষীরা বাড়িটি সর্বক্ষণ পাহারা দিচ্ছেন। ওখান থেকে দুর্গ ও শহরের দক্ষিণাঞ্চল দেখা যায়। সম্প্রতি বাড়িটির সংস্কার করা হয়েছে, যেখানে একটি ইনফিনিটি পুল ও ৫০ মিটারের চত্বর আছে। সাদা রঙের বাড়িটি মূলত আধুনিক কেতায় নির্মিত হলেও সেখানে প্রাচীন নানা সামগ্রী, ফ্রেসকো, এমনকি সিংহের মাথাও আছে, যার ভেতর থেকে পুলে পানি পড়ছে। এল মাতেরি চেয়েছিলেন, এই জিনিসগুলো যেন সত্যিকারের হয়, যদিও তিনি পরবর্তী আট থেকে ১০ মাসের মধ্যে সিদি বাউ সাইদের প্রাসাদসম বাড়িতে চলে যাবেন।
এবার উল্লিখিত নৈশভোজের পদ প্রসঙ্গে। সেদিন অন্তত কয়েক ডজন পদ ছিল। যার মধ্যে মাছ, স্টেক, টার্কি, অক্টোপাসসহ আরও অনেক কিছু ছিল। যে পরিমাণ খাবার ছিল, তাতে বহু মানুষ খেতে পারত। আবার ভোজের আগেও বেশ কটি ছোট পদ পরিবেশন করা হয়েছিল, যার মধ্যে কয়েক পদের জুসও ছিল। খাবারের পর তাঁদের আইসক্রিম ও জমাট বাঁধা টকদই দেওয়া হয়, যা তাঁরা সেন্ট টোপাজ থেকে ব্যক্তিগত জেট বিমানে করে এনেছিলেন।
এখানেই শেষ নয়, এল মাতেরির প্রাসাদে ‘পাশা’ নামের একটি বড় খাঁচাবন্দি বাঘও ছিল। বাঘটির বয়স যখন কয়েক সপ্তাহ ছিল, তখন তিনি এটিকে সংগ্রহ করেছিলেন। বাঘটি দিনে চারটি করে মুরগি খায়। এ দৃশ্য দেখে রাষ্ট্রদূতের মনে পড়ে যায়, তিনি বাগদাদে সিংহের বড় একটি খাঁচা দেখেছিলেন, যেটি ছিল উদয় হুসেনের। বাড়ির সব জায়গাতেই এল মাতেরির কর্মী ছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি খানসামা ও দক্ষিণ আফ্রিকার আয়াও ছিলেন। উল্লেখ্য, তিউনিসিয়ায় এই ব্যাপারটা খুবই বিরল ও ব্যয়বহুল ছিল।
মাতেরি দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। লায়লার বয়স চার বছর, আর ছোট মেয়েটির বয়স ১০ মাস। ছেলেটিকে তাঁরা দত্তক নিয়েছেন, যার বয়স দুই বছর। ছোট মেয়েটির জš§ কানাডায় বলে জন্মসূত্রে সে কানাডীয় নাগরিক। তবে ছুটি কাটাতে তাঁরা মালদ্বীপে যান। কারণ, এটাই তাঁদের প্রিয় জায়গা।

মন্তব্য
সেই সন্ধ্যায় এল মাতেরিকে মনে হলো, তিনি নিজের সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যাপারে সচেতন। তবে তিনি যে খুব সূক্ষ্ম কৌশলী মানুষ, তা মনে হয়নি। তিনি বারবার বলছিলেন, সেই বাড়ি থেকে খুব সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। পরিচারকদের ধমকও যেমন দিচ্ছিলেন, তেমনি তাঁদের পুরস্কারও দিচ্ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এল মাতেরি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন। পরিষ্কারভাবইে বোঝা যাচ্ছে, তিনি সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসগুলোর মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতে চান। ২৩ বছর বয়সী নাসরিনকে বন্ধুসুলভ মনে হয়েছে, তবে তিনি অতটা বুদ্ধিমান নন। কী করা দরকার, সেটাও তিনি বোঝেন না।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, নাসরিন ও এল মাতেরির বিত্ত-বৈভব, যার মধ্যে তাঁদের বসবাস। হামামেতে তাঁদের এই বাড়িটি আকর্ষণীয়, একটি পোষা বাঘ থাকার কারণে তাতে আভিজাত্যের ছোঁয়া লেগেছে। ওদিকে সিদি বাই সাইদে তাঁদের যে বাড়িটি নির্মীয়মাণ, সেটির জৌলুশ নাকি আরও বেশি হবে। এই বাড়িটি বাইরে থেকে দেখতে প্রসাদের মতো মনে হবে। জায়গাটির আকাশরেখায় এই বাড়িটি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, যাকে নিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে নানা সমালোচনা হয়। বিলাসি জীবন ও আচার-আচরণের কারণে তাঁরা যে মানুষের অপছন্দ ও ঘৃণার পাত্র হয়েছেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বরং এটা পরিষ্কার, এসব কারণেই মানুষ তাঁদের ঘৃৃণা করে। তাঁদের এই বিলাস-ব্যসনের মাত্রা যেন দিনকে দিন বাড়ছে। (চলবে)

আরো খবর

Disconnect