ফনেটিক ইউনিজয়
পরিমিত খাবারে সুস্থ থাকুন ঈদে
ডা. জহিরুল আলম

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। এই উৎসব আমাদের কাছে ‘কোরবানি ঈদ’ বলেই পরিচিত। ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খাবার। আর বিভিন্ন ধরনের মাংসের খাবার হলো এ ঈদের অন্যতম প্রধান আয়োজন। এ সময়ে দুই-এক দিন বেশি খেতে যদিও খুব বাধা নেই, তবে সুস্থ থাকতে খেতে হবে রয়ে-সয়ে, পরিমিত।
যাদের পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ আছে, বেশি খেলে তাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরিমিত না খেলে অন্যদেরও হজমে সমস্যা হতে পারে। ঈদের সময় নিজের বাসায় তো বটেই, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় ঘুরে ঘুরে প্রায় সারা দিনই টুকিটাকি, অনেক কিছু খাওয়া হয়। তাই একটু নজর দেওয়া দরকার, আমরা পরিমিত খাচ্ছি কি না।

খাবারের পরিমাণ
এমনিতে ঈদের সময় খাবারের আয়োজন অন্যদিনের তুলনায় বেশি থাকে। তাই এ সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় খাবারের পরিমাণ নিয়ে। অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। তা ছাড়া কোরবানির ঈদে মাংস পরিমাণে একটু বেশিই খাওয়া হয়। এর ফলে পেট ফাঁপা, জ্বালাপোড়া করা, ব্যথা, অথবা বারবার পায়খানা হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যদিও বিশেষ কোনো রোগ না থাকলে সাধারণভাবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে মানা নেই, কিন্তু পরিমাণ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে সকাল থেকেই পরিকল্পনা থাকা উচিত। পাশাপাশি শুধু মাংস নয়, বরং বেশি বেশি নজর দিতে হবে সবজির প্রতি। যতটা সম্ভব খাবারের টেবিলে মাংসের বিকল্প হিসেবে অন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবারকে প্রাধ্যন্য দিতে হবে।

সকালে হবে হালকা নাশতা
কোরবানির ঈদে আনন্দের শুরুটা সকাল থেকে হলেও ব্যস্ততা বাড়তে থাকে দুপুরের পর থেকে। যেহেতু কোরবানির মাংস ঘরে উঠে একটু দেরিতে, তাই বিকেলে বেশি বেশি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে ঈদের দিন সকালে হালকা খাবার গ্রহণই ভালো। অল্প করে সেমাই বা পায়েস খাওয়া যেতে পারে। এর সঙ্গে কিশমিশ, বাদাম ইত্যাদি খেতে পারেন। আবার চাইলে ফলের জুস, ডাবের পানি ইত্যাদিও খাওয়া যেতে পারে।

অল্প তেলে দুপুরের খাবার
ঈদের দিন পোলাও, বিরিয়ানি ও আমিষ-জাতীয় বিভিন্ন খাবার যেমন : মুরগি, খাসি বা গরুর মাংস, কাবাব, রেজালা ইত্যাদি ছাড়া যেন চলেই না। তবে এই জাতীয় খাদ্য দুপুরে কম খাওয়াই ভালো। আর খেলেও তা হতে হবে অল্প তেলে রান্না করা। এ ছাড়া আছে চটপটি, দইবড়া কিংবা বোরহানির মতো টক খাবারও। দুপুরেই মাংস রান্নার একাংশ সম্পন্ন হয়ে যায়। তাই সকালে অল্প আর দুপুরে পরিমিত খেতে হবে।
যাদের বয়স কম এবং শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, তারা নিজের পছন্দমতো সবই খেতে পারে এবং তবে হজমের সমস্যা এড়াতে অতিরিক্ত না হলেই হলো। বিশেষ করে চর্বি-জাতীয় খাদ্য। বেশি মাংস খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যায়। যাদের অ্যানাল ফিসার ও পাইলস-জাতীয় রোগ আছে, তাদের পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি বাড়তে পারে, এমনকি পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে। এ সময় প্রচুর পানি পান করতে হবে। পেটে গ্যাস হলে ডমপেরিডন, অ্যান্টাসিড, রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল-জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।

আগে আগে খেয়ে নিন রাতের খাবার
সাধারণত কোরবানির ঈদে রাতের খাবারই যেন মূল আয়োজন কারণ এ সময় সবার চুলায় থাকে কোরবানির মাংস। রাতের খাবারে কাবাব, গ্রিল জাতীয় খাবার যোগ করতে পারেন। সঙ্গে দুটো রুটি রাখা যায়। তবে রাতের খাবার অবশ্যই ঘুমানোর বেশ আগেই খেয়ে নিতে হবে, যেন হাঁটাহাঁটিতে খাবার অনেকটা হজম হয়ে যায়। এতে রক্তে বা শরীরে চর্বি জমে থাকার আশঙ্কা কমে।
চর্বিকে না বলুন
যেকোনো ধরনের চর্বি খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।  অনেক সময় রান্না সুস্বাদু করতে গিয়ে মাংসের তরকারিতে বাড়তি চর্বি যোগ করা হয়, এর ফলাফল হতে পারে ভয়ংকর। তাই মাংস থেকে চর্বি বাদ দিতে হবে। মাংসের সঙ্গে সবজি মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। টাটকা সবজি পাকস্থলীকে সাবলীল রাখে। মাংসের তরকারিতে তেল বা ঘির পরিমাণ কমিয়ে ফেলতে হবে। এমনকি ভুনা মাংসের বদলে শুকনা কাবাব খাওয়া শরীরের জন্য শ্রেয়। কোমল পানীয় ও মিষ্টি একেবারেই বাদ দিলে ঈদের সময়ও শরীর সুস্থ রাখা যায়। সেই সঙ্গে হালকা ব্যায়াম বা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি কমে যায়। এতে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকবে।

লেখক : চিকিৎসক, মেডিসিন বিভাগ

Disconnect