ফনেটিক ইউনিজয়
বিয়ের বাজনা বাজে...

গায়েহলুদ
গায়েহলুদের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। প্রায় ৪ হাজার বছর আগে থেকে মসলার পাশাপাশি প্রসাধনী হিসেবে হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হলুদ সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে এবং ত্বকের পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করে। কাঁচা হলুদ অ্যান্টিসেপটিক হিসেবেও কাজ করে। আর দুটি মানুষের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় বিয়ের মাধ্যমে। বলা যায় বিয়ের অনুষ্ঠানের সূচনাই হচ্ছে গায়েহলুদের মধ্য দিয়ে।
‘গায়েহলুদ’ নামটির সঙ্গে মিল রেখে হলুদ রঙের শাড়ির ব্যবহার করতে পারেন। তবে একরঙা লাল, কাঁচা মেহেদির রং, সবুজ, নীল, বেগুনি এই রংগুলোও ইদানীং প্রধান্য পাচ্ছে। শাড়ির ক্ষেত্রে বেছে নিচ্ছে মসলিন, সিল্ক, কটন, জামদানি। গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ উভয় পক্ষেও লোকজনই একই ধরনের বা রঙের কাপড় পরলেই ভালো মানাবে।
হলুদের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে গয়না তৈরি করে পরতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কাঁচা ফুলের গয়নাই বেশি মানানসই। শুকনো ফুলের সঙ্গে পুঁতি-জরির কাজ, স্টোন দিয়ে তৈরি কৃত্রিম ফুলের মালা কিনতে পাওয়া যায়। যা শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে অর্ডার দিয়ে বানিয়েও নেওয়া যায়। সাজে ভিন্নতা আনতে চাইলে রুপা বা পুঁতির গয়নাও পরতে পারেন। হাতে থাকতে পারে ফুলের গয়না। বাজুতে ফুল এবং হাতভর্তি কাচের চুড়ি।
গায়েহলুদের মেকআপে হালকা মেকআপ করলেই ভালো। হলুদের অনুষ্ঠানে একটা ঘরোয়া ভাব থাকে। গায়েহলুদে যদি হলুদ রঙের শাড়ি বেছে নেওয়া হয়, তবে মেকআপ হবে গোল্ডেন, ব্রাউন, ব্রোঞ্জ শেডের। চেহারায় বাড়তি একটি সোনালি আভা আনার জন্য ব্যবহার করুন গোল্ডেন ব্রাউন শিমার। চুলে লম্বা বেণি করে ফুলের মালা জড়িয়ে দিতে পারেন বেণিতে।

কনের সাজ
কনের সাজে ভিন্নতা আনতে পারেন। পারসোনার রূপ বিশষজ্ঞরা বলেন বিয়েতে শাড়ির রং থেকে শুরু করে মেকআপ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে উজ্জ্বল, গাঢ় রঙের ব্যবহারই বেশি করা হয়। ইদানীং আবার লাল কাতান শাড়ির চল ফিরে এসেছে। বিয়েতে ওড়না পরাতে হয় বলে চুলে খোঁপা করাই ভালো। বিয়েতে কনের বেজ মেকআপ বেশ গাঢ় হয়। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে সোনালি আর গাঢ় বাদামি আইশ্যাডো, লাল ব্লাশন আর গাঢ় লাল লিপস্টিক দেওয়া হয়। গাঢ় মেকআপের মধ্যেও উজ্জ্বলতা আনার জন্য সোনালি রঙের শিমার দেওয়া হয় লাইন আর ব্লাশনের ওপর। হাতে মেহেদি ও শাড়ির সঙ্গে রং মিলিয়ে হ্যান্ডপেইন্ট করতে পারেন। বিয়েতে খোঁপা, পার্শ্বসিঁথি ও খানিকটা কোঁকড়া করে চুলটাকে নানা কায়দায় বাঁধতে পারেন। এ সময়ে বেলি ফুলের সমাহার হয়। বেণি করে বা পুরো খোঁপায় বেলি ফুল ব্যবহার করতে পারেন। লাল বা সাদা শাড়ি পরলে হাতেও পেঁচিয়ে নিতে পারেন বেলি ফুল।
শাড়ির রং হালকা হলে সাজটাও হালকা করতে পারেন কিংবা কোনো একটা অংশ হাইলাইট করে এক নিমেষেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন। বেজ মেকআপটা ভারী করে ফিনিশিং পাউডার দিয়ে মেকআপ সেট করে নিন। চোখে সোনালি বা ডিপ ব্রাউন রঙের আইশ্যাডো ব্যবহার করুন। টেনে আইলাইনার লাগান। বড় ল্যাশের আইল্যাশ লাগিয়ে গাঢ় করে মাশকারা লাগান। শাড়ির রং হালকা হলে গাঢ় রঙের লিপস্টিক ব্যবহার করতে পারেন। আর খোঁপা এই সাজের সঙ্গে ভালো মানাবে।

গয়নার বাক্স
হলুদসন্ধ্যা, বিয়ের দিন, বউভাত সব দিনেই নিজেকে অন্য রকম সাজাতে বিয়ের গয়নার বিকল্প নেই। কনের গয়না হতে পারে ডায়মন্ড, সোনা, রুপা অথবা কয়েক রকম ম্যাটেরিয়ালের মিশালি ডিজাইন। রং, ডিজাইনে এসেছে পরিবর্তন। শুধু তা-ই নয়, গয়নার মিল থাকা চাই পোশাকের সঙ্গে। গয়নার সাজ হওয়া চাই পরিপূর্ণ, যা মেকআপের সঙ্গেও মানানসই।
সাজের খাতিরে কনের গয়নার তালিকা হওয়া চাই পরিপূর্ণ। যেন দূর থেকে দেখেই কনে নিশ্চিত হয়। সাজে থাকতে হবে নেকলেস, কানের দুল, আংটি, চুড়ি-বালা, নূপুর, টায়রা, টিকলি, নোলক। গায়েহলুদ, বিয়ের দিন, বউভাতের দিনের জন্য আলাদা ডিজাইন হতে হবে যেমন, তেমনি বিয়ের দিনের মতো এত গয়না দরকার নেই অন্যান্য দিনের জন্য।

বিয়ের শাড়ি
লাল শাড়িতে লাল টুকটুকে বউ দেখতেই পছন্দ করেন বাঙালিরা। বিয়ের সাজে তাই লাল শাড়িই বেছে নিতে পারেন। তবে লাল পছন্দ না করলে পরতে পারেন মেরুন, জাম, গাঢ় নীল, বেগুনি বা গোলাপি। তবে যে রঙের শাড়িই পরুন না কেন, বিয়ের দিন বেছে নিন সবচেয়ে জমকালো শাড়িটি। এ ক্ষেত্রে জামদানি, বেনারসি, কাতান, টিস্যু বা মসলিন বেছে নিতে পারেন। এ ছাড়া সিকোয়েন্সের ভারী কাজ, এমব্রয়ডারি, মুক্তা বা কুন্দনের কাজ করা শাড়িও বেছে নিতে পারেন। আপনার গায়ের রং শ্যামলা বা চাপা হলে একটু গাঢ় রঙের শাড়ি বেছে নিন। যেমন ব্লাড রেড, গাঢ় নীল বা গোলাপি। পেঁয়াজি বা বেগুনি রঙের শাড়ি মানিয়ে যাবে সবাইকে। যদি উচ্চতা কম হয়, তাহলে বেছে নিন সরু পাড় বা পাড় ছাড়া শাড়ি। উচ্চতা ভালো হলে চওড়া পাড়ের শাড়ি পরুন।
আপনার গড়ন হালকা শুকনো হলে ভারী শাড়ি বেছে নিন। শাড়িটি হতে পারে টিস্যু বা মসলিনের আর ভারী কাজের। ভারী গড়নের হলে বেছে নিন সফট ম্যাটেরিয়ালের গাঢ় রঙের শাড়ি। যেমন শিফন বা জর্জেট।

বিয়ের মেহেদি
হিন্দু, মুসলমান এমনকি বিভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতিতে হাতে মেহেদি লাগানোর প্রচলন যুগ যুগ ধরে। হাতে-পায়ে নকশা করতে টিউব মেহেদি আজকাল বেশি জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য বলে এর চাহিদাও বেশি। বাটা মেহেদি দেওয়ার ক্ষেত্রে গতানুগতিক রীতিই প্রচলিত। বিয়ের কনের ক্ষেত্রে হাতের কনুই পর্যন্ত জমকালো মেহেদি পরাটাই বর্তমানে প্রচলিত। বর্তমানে মেহেদির ডিজাইনের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় অ্যারাবিয়ান ডিজাইন। অ্যারাবিয়ান ডিজাইনের ক্ষেত্রে কালো মেহেদি এবং সাধারণ মেহেদি- দুটোই ব্যবহার করা হয়।

বউভাত
বিয়ে তো হলো এবার বউভাতের সাজেও আনুন বৈচিত্র্য। ফ্যাশনেবল, ট্রেন্ডি হালকা কাজ ও রঙের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। সোনালি, পেঁয়াজি, সফট পিংক, পিচ এমকি সাদা রঙের শাড়িও পরতে পারেন। তবে সিফন, মসলিন আর হালকা কাজের জামদানি বউভাতে বেশ মানিয়ে যাবে। অবশ্য বিয়ে-বউভাতের শাড়ি হিসেবে জামদানি কাতানের বেশ চল রয়েছে। বউভাতে ছিমছাম ও হালকা-পাতলা গয়নায় সাজিয়ে নিতে পারেন। বিয়ের দিন সবাই সোনার গয়না বেশি পরে বলে আপনি বউভাতের দিন মুক্তার গয়না পরতে পারেন। আর মুক্তার গয়না পরলে অন্য তাহলে কোনো সোনার গয়না না পরাই ভালো।

বিয়ের ছবি
গায়েহলুদ, বিয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে বিয়ের ছবির কোনো বিকল্প নেই। এত আয়োজন করে বিয়ে করলেন অথচ সেই স্মৃতিটাই যদি না থাকে, তাহলে কী করে হবে। তাই বেশ আয়োজন করেই ছবি তুলে রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ওয়েডিং ডায়েরিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিয়ের ছবি তোলার কাজটি করে দিচ্ছে। পারসোনাল ফটোগ্রাফার ডেকেও বিয়ের ছবি তুলে রাখতে পারেন। তবে যা-ই করুন না কেন, ভালো ফটোগ্রাফার বেছে নিন।

বিয়ের শপিংয়ের টিপস
-নিজের চেহারা ও রঙের সঙ্গে মিল রেখে পোশাক ও গয়না নিন।
-পোশাক কেনার পরই পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে গয়না কিনুন।
-পোশাকের সঙ্গেও মিল যেন হয় গয়নার, সেটাও লক্ষ রাখুন।
-খেয়াল রাখুন যুগ যুগের ঐতিহ্য যেন চোখে পড়ে কনের অলংকারে।
-অন্যদের হাতে সব দায়িত্ব না ছেড়ে শপিংয়ের সময় কনে-বরের একসঙ্গে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
-এমন অলংকার কিনুন, যা বিয়ের ফটোগ্রাফিতেও জমকালো, স্টাইলিশ লুক টিকে থাকে এবং ফ্যাশনেবল দেখায়।
-মেকআপের ভার পার্লারের ভালো কোনো বিউটি এক্সপার্টের ওপর ছেড়ে  দেওয়াই ভালো।
-গয়না হতে হবে বডিফ্রেন্ডলি। যাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তা বহন করতে পারে কনে। কোনো কষ্ট যেন না হয়।
আর হ্যাঁ, শেষ পরামর্শ, যা-ই কিনুন না কেন? নকলের চোরাবালিতে যেন না হারিয়ে যান।

আরো খবর

Disconnect