ফনেটিক ইউনিজয়
ফ্যাশনের একাল-সেকাল

নতুন ফ্যাশন মানেই নতুন নয়। কখনো কখনো পুরনো ফ্যাশনও নতুন রূপে হাজির হয়। আবার বর্তমানের ফ্যাশনও কিন্তু একদিনে আধুনিক হয়নি। ধীরে ধীরে নানা বাঁক-বদলের ভেতর দিয়েই জন্ম নিয়েছে আধুনিক ফ্যাশন। চলুন জেনে নেয়া যাক ফ্যাশনের একাল আর সেকালের গল্প। লিখেছেন সুদীপ্ত সাইদ খান

নবাবদের মনে পড়ে? নবাব সিরাজ উদ্দৌলা, আলিবর্দি খাঁ, কত কত নবাবদের নাম। তাদের ছিল বাহারি আর জমকালো ফ্যাশন। সেসব এখন আর নেই। সে সময়ের তেমন ছবিও পাওয়া যায় না যে চাইলেই দেখে নেবেন এক ঝলকে। তাদের ছবি খুব একটা না পাওয়া গেলেও নানা চিত্রকররা ধরে রেখেছেন কিছু নিদর্শন। সেসব নিদর্শনে দেখা যায় পাগড়ি, আলখেল্লা আর বাঙালি কুর্তা পরিহিত নবাবদের। জুতাও ছিল দেখার মতো। লোকে তো বলে, জুতা খুঁজতে গিয়েই নাকি ইংরেজদের হাতে ধরা পড়েছিলেন বাংলার শেষ নবাব। যে যাই বলুক না কেন, নবাবি আমলের ফ্যাশন কিন্তু সেই নবাবদের মধ্যেই গ-িবদ্ধ ছিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সে ফ্যাশন ছড়িয়ে পড়ার কোনো কারণও ছিল না। কারণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছিল লুঙ্গি পরিহিত খালি গায়ের বাঙালি। তাদের আবার ফ্যাশন কিসের!
নবাবি আমলের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সে সময়ের জমকালো ফ্যাশনের অনেক কিছুই। তারপরও থেকে গেছে কিছু কিছু। এই যেমন পাঞ্জাবি-পাজামা, কুর্তা।
আর ঢিলে-ঢালা পাজামা পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও পরতেন। নবাবি আমল বা তার পরবর্তী সময়ে শুধু গৃহস্থ বাঙালি মহিলাই নয়, অনেক অবাঙালি বা মুসলিম মহিলারাও ঢিলে পাজামা পরতেন। এছাড়া নবাবি আমলের নর্তকীরাও তাদের জমকালো পোশাকের সঙ্গে ঢিলে-ঢালা পাজামা পরতেন। এই পাজামা দেখতে অনেকটা বর্তমানের ‘palazzo pants’-এর মতোই। ওপর দিকে চাপা নিচের দিকে ঢিলা। এই পাজামা এখন আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তার মানে আবারও ফ্যাশনে জায়গা করে নিয়েছে শত শত বছর আগের পুরনো ফ্যাশন।
আমরা আনারকলি নামের একটি পোশাকের সঙ্গে খুব পরিচিত। মাঝে মাঝেই এই নামটি আমাদের কানে আসে। এটি কিন্তু সাম্প্রতিক কালের কোনো পোশাক নয়। এই পোশাকও বলতে গেলে অনেক প্রাচীন। মুঘল সাম্রাজ্যের এক নারীর নামে এই এই সালোয়ার-কামিজের প্রচলন হয়েছে। এটি দেখতে অনেকটা ফ্রকের মতো।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, আনারকলি ছিলেন মুঘল যুগের একজন নর্তকী। সম্রাট আকবরের রক্ষিতা হলেও যে প্রেমে পড়েছিল শাহজাদা সেলিমের (পরে সম্রাট জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করেন)। আনারকলির প্রেমের করুণ পরিণতির গল্প এখানে নয়। তবে মুঘল হেরেমের এই নর্তকী আজও টিকে আছেন গল্প-উপন্যাস, সিনেমায়। আছেন ফ্যাশনেও। কারণ আনারকলির পরিহিত সালোয়ার কামিজের মতো জামা পরে পরবর্তীতে মুঘল ও নবাবি আমলের নর্তকীরাও নেচেছেন। এরপর কয়েক শতাব্দী গত হলেও আনারকলি হারিয়ে যায়নি। উৎসব কিংবা পার্টি অথবা ক্লাবের আড্ডায় এখন অহরহ পরা হচ্ছে আনারকলি। বরং দিন দিন আনারকলির ডিজাইনে এসেছে নতুনত্ব। আনারকলির মতো আরও অসংখ্য পুরনো ফ্যাশনের উদাহরণ টানা যায়, যেসব ফ্যাশন আজও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো দুনিয়ায়। তবে পুরনো গল্প ছেড়ে সাম্প্রতিক গল্পের দিকে ফিরতে চাই বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশের ফ্যাশনের বাঁক-বদলের ইতিহাসটা অন্তত জানা প্রয়োজন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানের মানুষ ট্রিপিক্যাল সালোয়ার কামিজ পরত। কলকাতার বাঙালিরা শাড়ি পরত, শাড়ির সঙ্গে স্লিভলেস ব্লাউজ পরত বা অনেক সময় সিনথেটিক শাড়ি পরত। তবে আমাদের দেশে সেসময় এ ফ্যাশনগুলো ছিল না। সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা যে ধরনের পোশাক পরত সেটাকেই ফ্যাশন হিসেবে ধরে নিয়ে অন্যরাও তা পরত। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা ঢোলা টাইপের পাজামা এবং তার ওপরে হাফ শার্ট পরত। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের দিকে কলকাতার উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পোশাকের সঙ্গে ম্যাচ করে ছেলেরা কাপড় পরত। অন্যদিকে বেশিরভাগ তরুণীই সুচিত্রা সেনকে অনুসরণ করত। তবে একদম কলকাতার মেয়েদের মতো শাড়ির সঙ্গে স্লিভলেস ব্লাউজ পরত না। তারা ব্লাউজে থ্রি কোয়ার্টার বা নরমাল স্লিভ পরত। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া মেয়েরা সুতিশাড়ি পরত। তবে বিয়ের পর শাড়িতেও পরিবর্তন আনত বাংলাদেশের মেয়েরা। তখন সুতির জায়গায় কাতান, সিল্ক জায়গা করে নিত। তবে এখনকার মতো পাতলা শাড়ি বা সিনথেটিকের শাড়ি তারা পরত না। আর কম বয়সি মেয়েরা প্রথমে ফ্রক পরত, তারপর সালোয়ার-কামিজ। আর কলেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শাড়ি পরা শুরু করত।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের ফ্যাশনেও একটা বড় পরিবর্তন ঘটে। পাকিস্তান আমলে যে ধরনের পোশাক পরা হতো তার বেশিরভাগই পরবর্তীতে প্রচলিত থাকলেও একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন সবার অজান্তেই ঘটে গেছে। সে সময় একদিকে যেমন পাকিস্তান ফেরত সৈনিকদের পরিবাররা পাকিস্তানি ফ্যাশনকে অনুসরণ করত আবার অন্যদিকে ভারতের শরণার্থী শিবিরে থাকা মানুষেরা ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে সেখানকার ফ্যাশনও অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে ফ্যাশনে একটা মিশ্র চল শুরু হয়ে যায়। ফলে একদিকে কিছু ছেলেকে পাকিস্তানের মতো কাবলি পোশাকের এবং মেয়েরা সালোয়ার-কামিজ, শর্ট কামিজ এবং বেলবটম সালোয়ার, এখন যেটাকে পালাজ্জো বলা হচ্ছে, তা পরার প্রচলন শুরু হলো। তবে পাকিস্তানি পোশাকের চল বেশিদিন থাকেনি। কারণ বাঙালিদের ঝোঁকটা সবসময় ভারতের দিকেই বেশি ছিল। আবার কেউ কেউ ভারতীয়দের অনুসরন করা শুরু করল। মেয়েদের শাড়ি পরার ধরন একই থাকলেও শাড়ির নকশায় আসে নানা পরিবর্তন। সেসময় ভারত থেকে শাড়িসহ নানা পোশাক আমদানি শুরু হয়। বাংলার ফ্যাশনে ঢুকে পড়ে ভারতীয় পোশাক। যে চল আজও বহমান।
এসব পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই নায়করাজ রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতারা ফ্যাশনে নতুন দিগন্ত যোগ করলেন। বিশেষ করে নায়করাজের রংবাজ ছবি মুক্তি পাওয়ার পর ছেলেরা নায়করাজের ফ্যাশন অনুসরণ করা শুরু করে। ছেলেরা নায়করাজের মতো করে প্রিন্টেড শার্ট পরা শুরু করল। বেলবটম প্যান্ট পরতে লাগল। প্যান্ট একটু উঁচু করে পরা শুরু করল। শার্টের কলার বড় হয়ে গেল। অন্যদিকে কবরী-ববিতারাও সিনেমায় স্লিভলেস পরে হাজির হলেন। তাদের দেখাদেখি মেয়েরাও স্লিভলেস পরা শুরু করল। সিনথেটিক শাড়ি পরা শুরু করল।
এদিকে ১৯৭৬ সালের দিকে আবারও পোশাকে পরিবর্তন আসল। বিশেষ করে কামিজের ঝুল লম্বা হওয়া শুরু হলো।
১৯৮৫ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশিদের নিজস্ব কোনো ফ্যাশন স্টাইল ছিল না। হয় ভারতীয় না হয় পাকিস্তানি বা ওয়েস্টার্ন ফ্যাশনের ওপর নির্ভর ছিল সবাই। তবে এই সময়ে এসে ফ্যাশন ডিজাইনাররা ভাবলেন যে নিজস্ব কিছু সৃষ্টি করতে হবে। ফলে সে সময় গরমে সুতি শাড়ির সঙ্গে চলে এলো এমব্রয়ডারির কাজ। এলো অ্যাপলিক শাড়ি। বর্ষাকালে সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হলো সিল্ক বা সিনথেটিকের শাড়ি। সিনথেটিকে অ্যাপলিক, কাঁথা ফোঁড়ের পাড় অথবা লেইস বসিয়ে নতুন ডিজাইন তৈরি করা হলো। এর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শাড়ি- কাতান, জামদানি, মসলিন, বেনারসির চল ছিল। মাঝখানে জর্জেটের মধ্যে এমব্রয়ডারি করা শাড়ি এলেও পরে তা হারিয়ে যায়। আশি নব্বইয়ের দশকে এসে ওয়েস্টার্ন ফ্যাশনও আমাদের দেশে প্রবল প্রভাব ফেলা শুরু করে। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া ছেলেমেয়েরা ওয়েস্টার্ন ড্রেসের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে। সেই সঙ্গে স্যাটেলাইটের যুগে এসে বিভিন্ন চ্যানেলে বা ইন্টারনেটে পোশাক দেখে সেই ফ্যাশনগুলো নিজেদের মধ্যে মানিয়ে নেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এ সময় বলিউড তারকারা বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের ফ্যাশন ট্রেন্ড বদলে দিয়েছিল যেমন, তেমনি ছেলেদের ফ্যাশনে নায়ক সালমান শাহ বিরাট প্রভাব ফেলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এসে নারী ও পুরুষের পোশাকে ওয়েস্টার্ন আর বাঙালি ঘরানার একটা মেলবন্ধন ঘটে। ছেলেরা টিশার্ট, রিপড জিন্সের দিকে যেমন ঝুঁকে পড়ে তেমনি পাঞ্জাবি-পায়জামাতেও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করে। অন্যদিকে মেয়েরা এ সময়ে এসে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। চিরাচরিত বাঙালিয়ানা ছেড়ে জিন্স-টিশার্টের মতো ওয়েস্টার্ন পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে তুলে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের দিকেও তাদের সমান ঝোঁক লক্ষ করা গেছে।
মাঝখানে ওয়েস্টার্ন আর বলিউডের প্রভাব থাকলেও সময়ের পালাবদলে শার্ট, শাড়ি, কামিজ, পাজামা, ব্লাউজ সব কিছুতেই প্রাচীন রূপ আবারও নতুনরূপে ফিরে এসেছে। ছেলেদের টি-শার্ট, পাঞ্জাবিতেও চলে এসেছে ঐতিহ্যের ছাপ। কয়েক বছর আগেও শাড়িতে চুমকি, পুঁতি, জরি, পাথরের কাজ করা ফ্যাশন ছিল না। কিন্তু সত্তর-আশির দশকের এই ট্রেন্ডটা আবারও ফিরে এসেছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো ঈদ ও পূজাকে সামনে রেখে বাংলার অতি প্রাচীন আমলের ডিজাইন ব্যবহার করছেন। কাপড়ে উঠে আসছে পানাম সিটি। কাপড়ে উঠে আসছে সুন্দরবন। ব্লাউজে এসেছে পরিবর্তন যেমন ডাবানো গোল গলা, আবার থ্রি-কোয়ার্টার হাতা দিয়ে তাতে লেইস বসানো ব্লাউজ খুব চলছে এখন। ঘটিহাতা, পিস্তলহাতা, চুড়িহাতার ব্লাউজ যা সত্তর ও আশির দশকে বেশ জনপ্রিয় ছিল, তা এখন আবার ফিরে এসেছে। এখন ব্লাউজের সামনে গোল ও পেছনে ভি গলার ওপর কুঁচি ব্যবহার করে পুরনো দিনের আমেজ আবারও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। সালোয়ারের ক্ষেত্রে রয়েছে ষাট-সত্তরের দশকের চুড়িদার, ধুতি, পেশোয়ারি, পাটিয়ালি এবং চাপাশেপের সালোয়ার ও নিচে মুহুরি। এ ছাড়া চুড়িদার সালোয়ারের সঙ্গে চুড়িদার হাতার কামিজও ভালো চলছে। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে সুতি, মসলিন, শিফন ওড়নাই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। ওড়নাকে আকর্ষণীয় করতে ব্লক, স্ক্রিনের পাশাপাশি লেইস, পুঁতি, চুমকি, টারসেল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে যার ব্যবহার অনেক আগে দেখা গিয়েছিল। আশির দশকের যে পোশাকের নাম ছিল কাপ্তান এখন তার নাম পরিবর্তন হয়ে হয়েছে টপস এবং তা ফিরে এসেছে নতুনরূপে। এক সময়ে খুব চলত হাতে কাজ করা কটি আর এখন এ ধরনের টপসগুলোতেই ওড়নার বদলে ব্যবহার করা হয়েছে সেই কটি, কোনোটি টপসের সঙ্গে ফিটিং করা, আবার কোনোটি ফিটিং ছাড়া। টপসের গলায় ও হাতে রয়েছে হালকা হাতের কাজ, কাঠ, কাচের পুঁতি, স্টোন, বিভিন্ন ধরনের পাতি ও মেটালের কারুকাজ। একরঙা টপসে স্ক্রিনপ্রিন্ট, বাটিক, এমব্রয়ডারি, ব্লক, হ্যান্ড পেইন্ট ও অ্যাপলিকের কাজও দেখা যায়। ফিরে এসেছে পালাজ্জোও, যাকে আনারকলি পাজামা বললে ভুল বলা হবে না। বর্তমানে লম্বা কামিজের সঙ্গে পালাজ্জো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকে আবার বিভিন্ন টপসের সঙ্গেও পালাজ্জো পরতে পছন্দ করছে। তবে ২০১৮ সালে পোশাকে ফিউশনের ব্যাপক দাপট দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শার্ট বা শাড়িতে ডিজিটাল প্রিন্টের প্রাধান্য লক্ষ করা যাচ্ছে। গাঢ় রঙের পোশাকের সঙ্গে ছিমছাম গয়নায় মেয়েরা বেশ সাজিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে।

Disconnect