ফনেটিক ইউনিজয়
সম্পর্ক যখন বন্ধুত্বের
শারমিন সেতু

শিল্পী তপুর গাওয়া গানটা মনে পড়ে? ‘পুরো পৃথিবী এক দিকে, আর আমি অন্য দিক/ সবাই বলে করছ ভুল, আর তোরা বলিস ঠিক/ তোরা ছিলি, তোরা আছিস/ জানি তোরাই থাকবি/ বন্ধু বোঝে আমাকে, বন্ধু আছে আর কী লাগে?’ বন্ধুত্ব যেন ঠিক এমনই।
আসলে মানুষের জীবন অনেক সংক্ষিপ্ত সময়ের। তাই লোকমুখে বলতে শোনা যায়, জীবন বড় নয়; সুন্দর হতে হবে। আর সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের জীবন কখনও একা অবস্থায় পরিপূর্ণতা পায় না। নিজেদেরকে ভালো রাখতে আমরা জড়িয়ে পড়ি নানা সম্পর্কে। এর কিছু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে বা জন্মগতভাবেই আমরা লাভ করি। আর কিছু সম্পর্ক আমরা নিজেরাই তৈরি করে নিই। আমাদের যাপিত জীবনে যে সম্পর্কগুলোর মধ্যে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাই, তার মধ্যে একটি অন্যরকম সম্পর্ক হলো বন্ধুত্ব। প্রতিটি মানুষের জীবনেই একজন ভালো বন্ধুর প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত বন্ধু হতে পারে আত্মার আত্মীয়। যার সঙ্গে অনায়াসেই শেয়ার করতে পারি আমাদের সুখ, দুঃখ, ভালো লাগা, খারাপ লাগা সব কিছু। আর প্রতিবছর আগস্টের প্রথম রোববার সারা বিশে^ তা যেন আনুষ্ঠানিকতাও পায়। বন্ধুত্ব নিয়ে আমাদের আরও ভাবতে শেখায়-

মনীষীদের দৃষ্টিতে
বন্ধুর সঙ্গে মিলে, বন্ধুর কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত রেখেই তো দুনিয়া দেখতে হবে। এজন্যই বোধ হয় ইংরেজ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়; কেউ কবিতার কাছে; আমি যাই বন্ধুর কাছে।’ আর আইরিশ কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক সি জি লিউইস বলছেন, ‘বন্ধুত্ব হলো দর্শন কিংবা শিল্পকলার মতোই একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়... এর অস্তিত্বগত কোনো মূল্য নেই; এটা বরং এমন বিষয়গুলোর একটা যা অস্তিত্বকে মূল্যবান করে তোলে।’
দুনিয়ার অনেক মনীষীই এভাবে বন্ধুত্বকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘বন্ধু হতে চাওয়া একটা ক্ষণিকের কাজ, কিন্তু এটা এমন ফল, যা খুবই ধীরে পাকে।’ তবে এ নিয়ে তার এ উক্তিটিই বোধ হয় দুনিয়াজোড়া জনপ্রিয়, ‘বন্ধুত্ব হচ্ছে দুই শরীরে বাস করা এক আত্মা।’

বন্ধুদের নিয়ে আমাদের জীবন
বন্ধুত্বের ধরন হয় নানারকম। অভিজ্ঞতা অথবা আগ্রহের মিল নেই; কিন্তু কোথায় এক আত্মিক টান আছে। সে কারণেও গভীর বন্ধুত্ব হতে পারে। আবার বন্ধুত্বের ভিত্তি একজন আরেকজনের সঙ্গে অমিলের জায়গাগুলো খুঁজে বের করে সেটা নিয়ে একজন আরেকজনকে খোঁচানো এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভয়ংকর ধরনের তর্ক-ঝগড়ার মধ্য দিয়েও গড়ে উঠতে পারে। বরং এতে বন্ধুত্ব আরও শক্ত হয়ে ওঠে কখনও কখনও। একজন আরেকজনের প্রতি স্নেহ-মমতা বাড়ে। আবার বাবা-মা-বোনের সঙ্গেও হতে পারে বন্ধুত্ব, যা আমাদের জীবনকে অনেক সুন্দর করে তোলে। পরিবারের অন্য সদস্য, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে গড়ে উঠতে পারে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক, যা আমাদের জীবনকে মধুর করে। তাই বন্ধুত্বের ব্যাপারে নিয়মেরও প্রয়োজন কম। যদি একজন আরেকজনকে নির্মল আনন্দ দিতে পারে, যদি সম্পর্কের কারণে জীবনের প্রতি ভালো লাগা বাড়ে, তাহলেই তারা বন্ধু। সেই বন্ধুত্ব যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে সম্পর্ক গভীর হতে বাধ্য।
তবে মাথায় রাখতে হবে, বন্ধুদের কাছে বেশি প্রত্যাশা করাও উচিত না। নিজের বিপদ হবে জেনেও যে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, সে-ই হচ্ছে ব্যতিক্রম ধরনের বন্ধু। এমন বন্ধু জীবনে কমই পাওয়া যায়। আর পেলে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে আজীবন। যেন বন্ধুত্বের সেই সম্পর্ক উদাহরণ হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা নতুন বন্ধু বানাব ঠিকই, তবে পুরনো বন্ধুদের কাছে রেখে।

Disconnect