ফনেটিক ইউনিজয়
স্তন ক্যান্সার : প্রতিকারে প্রয়োজন সচেতনতার
শারমিন সেতু

স্তন ক্যান্সারকে নারী শরীরের নীরব ঘাতক বলা হয়। প্রতিবছর হাজার হাজার নারী প্রাণ হারান এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। আমাদের দেশে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হলেও, সমগ্র বিশ্বে অক্টোবর মাসজুড়েই স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ১৫ লক্ষাধিক নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং প্রতি লাখে ১৫ জন নারী মারা যান।
ক্যান্সার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার বা আইএআরসি’র হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে ১৫ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে ৭ হাজারই মৃত্যুবরণ করেন। উন্নত বিশ্বে অধিকাংশ নারী যেখানে ৫০ বছরের কাছাকাছি বয়সে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, বাংলাদেশে সেখানে ৪০ শতাংশেরও বেশি নারী ৫০ বছর বয়সে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
স্তন ক্যান্সার আসলে এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, যা স্তনের কোষগুলো থেকে শুরু হয়। তবে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারগুলো কেন ক্যান্সারে রূপ নেয় তার সঠিক কারণ আজও জানা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশের নারীরা আজ প্রজনন স্বাস্থ্যের অমানিশা কাটিয়ে উঠলেও, অ-প্রজনন স্বাস্থ্যের, বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এই ঝুঁকি থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা।
স্তন ক্যান্সার কেনো হয় তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনও জানা যায়নি। তাই একাধিক কারণকে স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে, যেমন:
-    স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে অর্থাৎ মা-খালাদের থাকলে সন্তানদের হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
-    যেসব নারীর বয়স ৪০ বছরের বেশি তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
-    অবিবাহিতা বা সন্তানহীনা নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
-    যেসব মায়েরা সন্তানকে কখনও স্তন্যপান করাননি তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
-    ৩০ বছরের পরে যারা প্রথম মা হয়েছেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
-    যাদের তুলনামূলক কম বয়সে পিরিয়ড শুরু হয় ও দেরিতে বন্ধ হয় তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
-    একাধারে অনেকদিন (১০ বছর বা বেশি) জন্ম নিরোধক বড়ি খেলেও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ
-    স্তনে বা বগলের নিচে দলা, চাকা, ঘা বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
-    স্তনের আকার-আকৃতিতে যে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
-    নিপল থেকে রক্ত- পুঁজ বা অন্য কোনো রস নিঃসরণ বা নিপল ভিতরের দিকে ঢুকে যাওয়া।
-    ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া বা সব সময়ই জ¦র থাকা ইত্যাদি।
তবে মেডিকেল অনকোলজিস্ট ও অধ্যাপক পারভীন শাহিদা আখতার জানান, স্তনে চাকা অনুভব হলেও স্তনের চাকার শতকরা ৮০ ভাগেরই বেশি ক্যানসার নয়। স্তনে বিভিন্ন কারণে চাকা হয়। যেমন ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা, ফাইব্রোসিস্টিক চাকা, ইন্ট্রাডাক্টাল পেপিলোমা, চর্বি জমে যাওয়া, ফোঁড়া ও ক্যানসার। কিন্তু স্তনে চাকা হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।  
স্তন ক্যান্সার সাধারণত দু’ভাবে শনাক্ত করা যায়: ১) স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ২) রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে। স্ক্রিনিং আবার দু’ভাবে করা যায়: ১) নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করা। ২) ডাক্তার বা নার্সের সাহায্যে পরীক্ষা করা। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও দু’টি পদ্ধতি রয়েছে: ১) মেমোগ্রাম বা স্তনের বিশেষ ধরনের এক্সরে। ২) স্তনের আলট্রাসনোগ্রাম। তাছাড়া এমআরআই এবং বায়োপসি এর মাধমেও স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়ে থাকে।
শনাক্তকরণের পরবর্তী পর্যায় হল এর সঠিক চিকিৎসা করা। স্তন ক্যান্সারের যে চিকিৎসাগুলো প্রধানত রয়েছে তা হলো: সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি। তবে বিভিন্ন ধরনের সার্জারির মধ্যে কোন ধরনের চিকিৎসা রোগীর জন্য উপযুক্ত, তা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে সচেতনতার অংশ হিসেবে স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আমাদের যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখা জরুরি তা হলো- ৩০ বছর বয়সের মধ্যে প্রথম সন্তান জন্ম দেয়ার চেষ্টা করা, সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো,  কোনো ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম/পরিশ্রম করা।

Disconnect